E-Paper

‘নাম বাদ দেবই’ কার্যক্রম

হাজার হাজার নাম কাটার মিছিল যে শুধুমাত্র অসমের আদি-অকৃত্রিম বাসিন্দাদের রক্ষা করার পবিত্র দায়িত্ব— সে কথা সফল ভাবে প্রচার করতে পেরেই রাজনীতির দাবাখেলায় বিরোধীদের মন্ত্রী খেয়ে নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা।

রাজীবাক্ষ রক্ষিত

শেষ আপডেট: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:৩০

অসমের শ্রীভূমি জেলায় শ্রীমন্ত কানিশাইল গ্রামের বাসিন্দা সেলিম আহমেদ অবাক বিএলও-র ফোন পেয়ে! জানতে পারলেন, তিনি একাই ১৩৩ জন ভোটারের বিরুদ্ধে নাম কাটার অভিযোগ দাখিল করেছেন। এমনকি সেলিম নিজের ও তাঁর পরিবারের সকলের নামও ভোটার তালিকা থেকে ছেঁটে ফেলার দাবিতে জমা দিয়েছেন ৭ নম্বর ফর্ম! সব ফর্মের তলায় জ্বলজ্বল করছে তাঁর সই! নগাঁওয়ের বটদ্রবা কেন্দ্র। অন্যের পরিচয় যাচাইয়ের দায়িত্ব যাঁর, সেই বুথ লেভেল অফিসার নুরুদ্দিন আহমেদ নোটিস হাতে পেয়ে জানতে পারলেন, তিনি ‘মৃত’। তাঁর স্ত্রীও তাই! গোসাঁইগাঁও মন্দারপাড়া গ্রামে ঘরে ঘরে নোটিস হাজির! জানা গেল, ১৪২ জন গ্রামবাসীর কেউ নাকি ‘বেঁচে নেই’। তাই ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটা গিয়েছে!

হাজার হাজার নাম কাটার মিছিল যে শুধুমাত্র অসমের আদি-অকৃত্রিম বাসিন্দাদের রক্ষা করার পবিত্র দায়িত্ব— সে কথা সফল ভাবে প্রচার করতে পেরেই রাজনীতির দাবাখেলায় বিরোধীদের মন্ত্রী খেয়ে নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা। পরিস্থিতি এমনই, সংখ্যালঘুদের নির্বিচারে বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে দেওয়া, এমনকি সীমান্তপার করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার মতো চরম মানবাধিকার ভঙ্গের ঘটনা নিয়েও অসমে কোনও আন্দোলন নেই। ভোটের বাজারে সকলের ভয়, সংখ্যালঘুদের মানবাধিকার, ঘোষিত বিদেশিদের আইনি সুরক্ষার অধিকার নিয়ে সরব হলেই অসমিয়া-বিরোধী, ভূমিপুত্র-বিরোধীর ছাপ পড়ে যাবে গায়ে। সেই সুযোগেই অসমে চলতে থাকা ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধনে ত্রিশ লক্ষাধিক ভোটারের নামে অভিযোগ জমা পড়েছে। সিংহভাগই সংখ্যালঘু।

অসমে এ পর্যন্ত ৪,৭৮,৯৯২ জন মৃত ভোটার, ৫,২৩,৬৮০ জন স্থানান্তরিত ভোটার এবং ৫৩,৬১৯টি ডুপ্লিকেট নাম চিহ্নিত হয়েছে। বর্তমানে দাবি ও আপত্তি পর্যায় চলছে। সেখানে সংশ্লিষ্ট বিধানসভা কেন্দ্রের যে কোনও ভোটার নিজের নাম, এপিক নম্বর ও মোবাইল নম্বর উল্লেখ করে কোনও ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার আবেদন জানিয়ে ৭ নম্বর ফর্ম অনলাইন বা অফলাইনে জমা দিতে পারেন। এ ভাবেই ত্রিশ লক্ষ ভোটারের বিরুদ্ধে জমা পড়েছে অভিযোগ। বিশেষ সংশোধনী প্রক্রিয়া নিয়ে এই অভিযোগে নির্বাচন আধিকারিকের কাছে স্মারকলিপি জমা দিয়েছে অসম তৃণমূল। সাংসদ সুস্মিতা দেবের অভিযোগ, অভিযোগকারীদের বড় অংশই শুনানিতে হাজির হচ্ছেন না। এতেই স্পষ্ট বিরোধী দলের ভোটারদের হেনস্থা করার উদ্দেশ্যেই গুচ্ছ গুচ্ছ ভুয়ো অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে। গোয়ালপাড়ায় ১৪২ জনের নামে নোটিস আসার পরে গ্রামবাসীরা সভা ডাকেন এবং সংশ্লিষ্ট বিজেপি বিএলএ-দের কাছে জবাব চান। লিখিত বিবৃতিতে দুই এজেন্ট স্বীকার করেন, ১৪২ জন ভোটারের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলি মিথ্যা ছিল। জানা যায়, বিজেপির মণ্ডল সভাপতি আগেই ফাঁকা ফর্ম ৭-গুলিতে এজেন্টদের স্বাক্ষর করিয়ে রেখেছিলেন।

অল আসাম মাইনরিটি স্টুডেন্টস ইউনিয়ন-এর বক্তব্য, “বোঝা যাচ্ছে গোটা প্রক্রিয়ায় ত্রুটি ও কারচুপি রয়েছে। আমরা রাজ্যের সব জেলাতেই স্মারকলিপি দিচ্ছি।” আসু সভাপতি উৎপল শর্মা জানান, বাংলাদেশি অনুপ্রবেশের সমস্যায় দীর্ঘ দিন ধরেই অসম জর্জরিত। বহু অবৈধ বাংলাদেশির নাম রাজ্যের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলে অভিযোগ। কিন্তু, বিভিন্ন জায়গায় ভূমিপুত্র মুসলিমদের কাছেও নোটিস পৌঁছেছে। ফলে প্রকৃত বাসিন্দাদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনে স্মারকপত্র দিয়েছে আসু।

অসমে ফর্ম ৭-এর ব্যাপক অপব্যবহারের বিরুদ্ধে হাই কোর্টে জনস্বার্থ মামলা করেছেন আইনজীবী ফজলুজ্জামান মজুমদার। প্রাথমিক শুনানির পর হাই কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ সরকারকে জবাব দাখিলের নির্দেশ দিয়েছে। আবেদনপত্রে বলা হয়েছে, ফর্ম ৭-এ আপত্তিকারীর পরিচয় সঠিক ভাবে প্রকাশ ও যাচাই করা বাধ্যতামূলক। শুনানির সময় আপত্তিকারীর উপস্থিতিও প্রয়োজন। পাশাপাশি, জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫০-এর ধারা ৩১ অনুযায়ী ভোটার তালিকা সংক্রান্ত ভুয়ো ঘোষণা বা অভিযোগের জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু তার কোনও কিছুই অসমে প্রয়োগ করা হচ্ছে না।

কারচুপি ফাঁস হয়ে যাওয়ার পরেও অনমনীয় মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা বলেন, “সংখ্যালঘু মিঁয়া ভোটারদের কষ্ট দেওয়াই আমার কাজ। যা করেছি বেশ করেছি!” তিনি মেনে নেন, শুধু বিজেপি কর্মীরাই পাঁচ লক্ষাধিক অভিযোগ জমা দিয়েছেন। এই সরকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন পর্বে সংখ্যালঘুদের ভোট নিয়ে কী করতে চলেছে— তা নিয়েও আগাম হুঁশিয়ারি দিয়ে দেন তিনি। বলেন, “এখন সবে এসআর চলছে। পরে যখন এআইআর হবে, আমরা অন্তত চার-পাঁচ লক্ষ মিঁয়ার নাম বাদ দেবই।” এই মন্তব্য এক সুচিন্তিত রণকৌশল। কংগ্রেসের এক নেতা বলেন, “আমরা চুরির অভিযোগে গলা ফাটাচ্ছিলাম, কিন্তু হিমন্ত সদর্পে ডাকাতি করার কথাই ঘোষণা করে দিলেন!”

মুসলমানদের নাম কাটার বন্দোবস্ত সেরে এখন অসমের ইতিহাস থেকে বাঘ হাজরিকা ওরফে ইসমাইল সিদ্দিকি ও ধর্মগুরু আজান পিরের নাম মোছার কাজে ব্যস্ত হিমন্ত। বৈষ্ণব ধর্মগুরু শ্রীমন্ত শঙ্করদেব ও আজান পিরের সর্বধর্ম সমন্বয়ের আদর্শকে সামনে রেখে এত দিন অসমকে ‘শঙ্কর-আজানের দেশ’ বলা হত। কিন্তু হিমন্ত ঘোষণা করে দিয়েছেন, অসম শুধুই শঙ্করদেবের রাজ্য। আরও বলেছেন, “শরাইঘাটের যুদ্ধে লাচিত বরফুকনের সঙ্গে বাঘ হাজরিকা বলে কেউ ছিলেনই না। আমরা স্কুলের ইতিহাস বই নতুন করে লিখব।”

এই দেশে, যেখানে আজান পিরের মতো ধর্মগুরু, বাঘ হাজরিকার মতো বীর নিজেদের জায়গা টিকিয়ে রাখতে পারছেন না, সেখানে সেলিম, নুরুদ্দিনরা যে বেঁচে থেকেও মরে যাবেন— সে আর কী এমন বড় কথা!

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Himanta Biswa Sarma Election Commission

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy