সমাজবাদী আন্দোলনে তাঁরা এক কালের সতীর্থ। রাজনৈতিক পথ এবং দল আলাদা হয়ে গিয়েছে পরে। তার পরেও হিন্দি বলয়ের রাজনীতি প্রাক্তনকে ‘বড়ে ভাই’ এবং বর্তমানকে ‘ছোটে ভাই’ হিসেবেই চিনে এসেছে। বিহারে দশম বার মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নেওয়ার পরে ‘ছোটে ভাই’ নীতীশ কুমারের সরকারের এক নোটিসে এ বার ‘দূরত্ব’ আরও বেড়ে যাচ্ছে লালুপ্রসাদ যাদবের সঙ্গে!
এই ‘দূরত্ব’ ভৌগোলিক। কখনও একই জোটের শরিক, কখনও প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে রাজনীতির ময়দানে নামলেও নীতীশ ও লালু ছিলেন দীর্ঘ কালের পড়শি। পটনা শহরের অ্যানে মার্গে মুখ্যমন্ত্রীর আবাস। দু’দশক ধরে সেই বাড়ির বাসিন্দা নীতীশ। উল্টো দিকের রাস্তা সার্কুলার রোডে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী রাবড়ী দেবীর নামে বরাদ্দ বাংলোয় থাকেন আর এক প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী লালুপ্রসাদ। এ বার নতুন মন্ত্রিসভা তৈরি হওয়ার পরে বিহারের ভবন নির্মাণ দফতর রাবড়ীর জন্য শহরের হার্ডিং রোডে নতুন বাংলো বরাদ্দ করেছে। রাবড়ী এখন বিহারের বিধান পরিষদের বিরোধী দলনেতা, যার মর্যাদা পূর্ণমন্ত্রীর সমতুল। সেই পদের নিরিখেই তাঁর জন্য নতুন ঠিকানার ব্যবস্থা হয়েছে। যার অর্থ, নীতীশের পাড়া থেকে এ বার কিছু দূরে সরে যেতে হবে লালু-রাবড়ীর পরিবারকে! এই সিদ্ধান্তকে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ই আখ্যা দিচ্ছে আরজেডি।
বিহারের নতুন মন্ত্রিসভায় ভবন নির্মাণ দফতর গিয়েছে জেডিইউ-এর বিজয় কুমার চৌধরির হাতে। আধিকারিকদের সঙ্গে মন্ত্রীর বৈঠকের পরে দফতরের তরফে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে মন্ত্রিসভার সদস্যদের বাড়ি বণ্টনের। নীতীশের মন্ত্রিসভায় ২৬ জনের মধ্যে ১৩ জন এ বার নতুন, তাঁদের জন্য শহরে বাসস্থান বরাদ্দ করেছে সরকার। সেই তালিকাতেই রয়েছে রাবড়ীর নাম। সরকারি ব্যবস্থা অনুযায়ী, বিধান পরিষদের বিরোধী দলনেতা হিসেবে মা রাবড়ী হার্ডিং রোডে একটি বাংলো পাবেন আর বিধানসভার বিরোধী নেতা হিসেবে ছেলে তেজস্বীর ঠিকানা থাকবে পোলো রোডের সরকারি বাংলো! নতুন বাড়ি বণ্টন করতে গিয়ে লালু-রাবড়ীর বড় ছেলে তেজপ্রতাপ যাদবের (আগে মন্ত্রী, পরে বিধায়ক ছিলেন, এ বার পরাস্ত) নামে থাকা বাংলোও বরাদ্দ করে দেওয়া হয়েছে বিজেপির মন্ত্রী লখেন্দ্র কুমার রোশনকে। পটনার ১০ নম্বর সার্কুলার রোডে রাবড়ী-লালুর আবাসনের সঙ্গে আরজেডি এবং সারা দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার নানা স্মৃতি জড়িয়ে। বিধানসভা ভোটে সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের পরে লালুর পরিবারে ভাই-বোন তেজস্বী, রোহিণী আচার্যদের কুখ্যাত ঝগড়াও ওই বাড়িতে। সেই ঠিকানা রাবড়ীকে ছেড়ে দিতে হবে শুনে পরিবার থেকেও নানা প্রতিক্রিয়া আসতে শুরু করেছে।
পটনার ১০ নম্বর সার্কুলার রোডে রাবড়ী দেবীর সেই বাংলো। —নিজস্ব চিত্র।
ভবন নির্মাণ দফতরের মন্ত্রী বিজয় অবশ্য মনে করিয়ে দিচ্ছেন, রাজ্যের উপ-মুখ্যমন্ত্রী থেকে বিরোধী দলনেতা হওয়ার পরে তেজস্বীর করা মামলাতেই পটনা হাই কোর্টের বিচারপতি এ পি শাহি ও অঞ্জনা মিশ্রের বেঞ্চ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীদের জন্য আজীবন থাকা, সুরক্ষা ও তাঁদের সহায়তায় কর্মী দেওয়ার সরকারি ব্যবস্থা বাতিল করার নির্দেশ দিয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রী নীতীশই এক সময়ে আইন বদল করে সব প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর জন্য ওই বন্দোবস্ত করেছিলেন। কিন্তু তেজস্বীরই মামলায় আদালত সেই ব্যবস্থা তুলে নিতে বলেছিল। বিজয়ের মতে, ‘‘বিধান পরিষদের বিরোধী দলনেতার জন্য মন্ত্রীদের সমান ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্য কিছু নেই।’’ সরকারি সূত্রের বক্তব্য, হার্ডিং রোডে তিন একরের বাংলো রাবড়ীদের আগের বাড়ির চেয়ে আয়তনে বড়।
আরজেডি-র যুব নেতা প্রিয়াংশু কুশওয়াহা অবশ্য বলছেন, ‘‘আদালতের সেই নির্দেশ অনুযায়ীই যদি কাজ চলে, তা হলে আগেই এই ব্যবস্থা হল না কেন? নতুন মন্ত্রিসভা তৈরির পাঁচ দিনের মধ্যেই অসুস্থ লালুপ্রসাদকে বাড়ি ছেড়ে দিতে বলা হচ্ছে কেন? আসলে বিজেপির চাপের কাছে মাথা নোয়াতে হচ্ছে নীতীশজি’কে। ‘বড়ে ভাই’কে অসম্মান করতে গিয়ে ওঁরা রাজ্যের মানুষের চোখেই নিচু হয়ে যাচ্ছেন!’’
লালুদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ আপাতত প্রশ্নের মুখে। সেই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, ভবিষ্যতে রাবড়ী বিধান পরিষদের বিরোধী নেতা না-থাকলে তাঁদের ঠিকানা কী হবে?
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)