Advertisement
৩০ জানুয়ারি ২০২৩

এক চা-ওয়ালার গল্প

এক চা-ওয়ালার গল্প। না, আমাদের প্রধানমন্ত্রীজির গল্প নয়। রাজনীতির অলিগলিতেও তাঁর আনাগোনা নেই। তিনি শুধু চা-ওয়ালা, দিল্লির ব্যস্ততম রাস্তার ধারে ছোট্ট এক চায়ের দোকান। ইঁট পেতে কাঠের তক্তা দিয়ে বানানো ছোট্ট বসার জায়গা আর তারই সঙ্গে দুটি স্টোভ। পাশেই ছড়ানো অনেক বই। যেগুলির লেখক ছোটখাটো চেহারার ওই চা-ওয়ালা। এই অবধি এক সাধারণ গল্প।

নিজের চায়ের দোকানে লক্ষ্মণ রাও।

নিজের চায়ের দোকানে লক্ষ্মণ রাও।

বর্ণালী চন্দ
নয়াদিল্লি শেষ আপডেট: ১৯ অগস্ট ২০১৫ ১৯:২২
Share: Save:

এক চা-ওয়ালার গল্প। না, আমাদের প্রধানমন্ত্রীজির গল্প নয়। রাজনীতির অলিগলিতেও তাঁর আনাগোনা নেই। তিনি শুধু চা-ওয়ালা, দিল্লির ব্যস্ততম রাস্তার ধারে ছোট্ট এক চায়ের দোকান। ইঁট পেতে কাঠের তক্তা দিয়ে বানানো ছোট্ট বসার জায়গা আর তারই সঙ্গে দুটি স্টোভ। পাশেই ছড়ানো অনেক বই। যেগুলির লেখক ছোটখাটো চেহারার ওই চা-ওয়ালা। এই অবধি এক সাধারণ গল্প। কিন্তু যদি বলা হয়, এই চা-ওয়ালা লেখকের বই আমাজনের বেস্ট সেলার, ফ্লিপকার্টের মতো অনলাইন শপিংসাইটে তাঁর বইয়ের চাহিদা তুঙ্গে, তা হলে স্বভাবতই কৌতূহল হয়।
লক্ষ্মণ রাও, মহারাষ্ট্রের এক প্রত্যন্ত গ্রাম তরেগাঁও থেকে ১৯৭৫-এর ৩০ জুলাই দিল্লি আসেন সাহিত্যিক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে। হিল্দি সাহিত্যিক গুলশন নন্দা ছিলেন তাঁর প্রেরণা। গুলশন নন্দার রচনা তাঁর কন্ঠস্থ। সেই সময়ে গুলশন নন্দার উপন্যাসকে ভিত্তি করে তৈরি হওয়া হিন্দি সিনেমা ‘কাটিপতঙ্গ’, ‘খিলোনা’, ‘দাগ’, ‘ঝিলকে উস পার’ সুপার ডুপার হিট। দু’চোখে সাহিত্যিক হওয়ার স্বপ্ন থাকলেও জীবন সম্পর্কে যথেষ্ট অনভিজ্ঞ ছিলেন। অফিসের দরজায় দরজায় ঘোরার পরও কোনও ভদ্রস্থ চাকরি জোটেনি। বেঁচে থাকার তাগিদে দিল্লির এক ধাবায় বাসনমাজার কাজ নেন। তার পরের দু’বছর কখনও ধাবায় বাসনমাজা, কখনও বা দিনমজুরি করে চলে বেঁচে থাকার লড়াই। এর ফাঁকেই চলে সাহিত্যচর্চাও। পড়ে ফেলেন শরৎচন্দ্র, প্রেমচন্দ, এমনকী শেক্সপিয়র ও গ্রিক নাট্যকার সোফোক্লিসের রচনাও। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও ভাটা পড়েনি তাঁর পড়াশোনার আগ্রহ। এরই মধ্যে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিন্দিতে স্নাতক হন লক্ষ্মণ রাও। এ বারেই বাষট্টি বছর বয়সে ইন্দিরা গাঁধী মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পরীক্ষা দিয়েছেন। এর পর গবেষণার ইচ্ছা আছে বলে জানালেন তিনি।

Advertisement

১৯৭৭-এ দিল্লির আইটিও-র কাছে হিন্দি ভবনের সামনে একটি পান-বিড়ির দোকান শুরু করেন। বহু বার পুলিশ, পুরসভা এসে তাঁর দোকান ভেঙে দিয়ে গিয়েছে। তা সত্ত্বেও হার মানেননি তিনি। পরে অবশ্য পুরসভা ওই জায়গায় দোকান চালানোর ছাড়পত্রও দিয়েছে। পূর্ব দিল্লির লক্ষ্মীনগরে তাঁর বসবাস হলেও, এই চায়ের দোকানই তাঁর স্থায়ী ঠিকানা। এর মধ্যেও কিন্তু তিনি সাহিত্যচর্চা ছাড়েননি। লক্ষ্মণ রাওয়ের প্রথম রচনা ‘নই দুনিয়া কি নয়ি কহানি’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৯-এ। প্রথম উপন্যাস নিয়ে তিনি প্রকাশকের দরজায় দরজায় ঘোরেন, কেউ তাঁর উপন্যাস ছাপতে রাজি হয়নি। এক প্রকাশক তাঁকে কার্যত বের করে দেওয়ার পরই অপমানিত লক্ষ্মণ রাও নিজেই নিজের উপন্যাস ছাপায় উদ্যোগী হন। তারপর থেকে তিনি নিজেই লেখক–প্রকাশক। প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হতেই রাতারাতি আলোচনার কেন্দ্রে আসেন তিনি। এক জন পানবিক্রেতা এত ভাল উপন্যাস লিখতে পারেন তা বিশ্বাস করতে এলিট সাহিত্যিক সমাজের বেশ কষ্ট হয়েছিল। কিন্তু ১৯৮১-র ফেব্রুয়ারিতে একটি সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিকে লক্ষ্মণ রাওয়ের সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হওয়ার পর পায়ের তলায় শক্ত মাটি খুঁজে পান তিনি।

লক্ষ্মণ রাওয়ের লেখা বই।

দেশবিদেশের পত্রপত্রিকা, রেডিও, দূরদর্শনে সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাঁর পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে। পরিচিত হন প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকদের সঙ্গে। বহু পুরস্কার ও সম্মান পেয়েছেন তিনি। তাঁর লেখা উপন্যাসকে ভিত্তি করে নাটকও মঞ্চস্থ হয়েছে। ’৮৪-র ২৭ মে ইন্দিরা গাঁধীর সঙ্গে দেখা হওয়াই তাঁর জীবনের সবথেকে বড় প্রাপ্তি বলে জানালেন লক্ষ্মণ রাও। ইন্দিরা তাঁকে তাঁর কার্যকাল সর্ম্পকে লেখার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এর পরই তিনি ‘প্রধানমন্ত্রী’ নাটকটি লেখেন। তাঁর লেখা উপন্যাস ‘রামদাস’ আজ অনলাইন শপিং সাইটে হইচই ফেলে দিয়েছে। আমাজনের বেস্টসলার। অন্য উপন্যাস ‘নর্মদা’র চাহিদাও ফ্লিপকার্ট ও আমাজনে তূঙ্গে। ‘নর্মদা’ ইংরেজিতেও অনুবাদ করা হয়েছে। সে জন্য এই উপন্যাসের চাহিদা দেশের বাইরেও। এত পরিচিতি, এত পুরস্কার, ২৪টি উপন্যাস— তার পরেও যে সাহায্য সরকার বা প্রকাশকদের কাছ থেকে তাঁর পাওয়া উচিত ছিল, তা তিনি পাননি। তাই একবুক অভিমান রয়েছে লক্ষ্মণের। বিপণনের অর্থ না থাকায়, সাইকেলে চেপে দিল্লির প্রায় ৫০০ স্কুলে নিজের বই বিক্রি করেন। চায়ের দোকানের সামনেই চটের বস্তার উপর নিজের রচনা ছড়িয়ে বসেন। এখান থেকেই মাসে হাজার দশেক টাকার বই বিক্রি হয় বলে জানালেন লক্ষ্মণ রাও। অনলাইন বিক্রির দিকটা অবশ্য তাঁর এমবিএ পড়া ছেলে সামলায়। পরিবার চালানোর জন্য এখনও চা-বিক্রি করতে হয় তাঁকে। এখনও বই বিক্রি করে সংসার চালানোর মতো রোজগার হয় না। সরকারি সাহায্য না পাওয়ার জন্য ক্ষোভ থাকলেও হেরে যাননি তিনি। লক্ষ্মণ রাওয়ের মতে, একজন লেখকের জন্ম হয় ৫০ বছরের পর, আর পরিচিতি হয় মৃত্যুর পর।

Advertisement

লক্ষ্ণণের লেখার ভক্তরা বলেন, লক্ষ্মণের এলাচ দেওয়া চায়ের গন্ধ আর তাঁর মিষ্টি ব্যবহারের মতোই সাবলীল তাঁর উপন্যাসের ভাষা।

গুলশন নন্দা হতেই একদিন দিল্লি এসেছিলেন। এখনও গুলশন নন্দা হয়ে ওঠারই স্বপ্ন দেখেন লক্ষ্মণ।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE
Popup Close
Something isn't right! Please refresh.