পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর তথা গোটা ভোট প্রক্রিয়া নিয়ে বার বার নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলছে তৃণমূল। জাতীয় স্তরেও বিরোধীদের দাবি, কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপির হয়ে কাজ করছে জাতীয় নির্বাচন কমিশন। এই আবহে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি বি ভি নাগরত্ন বললেন, যদি সাংবিধানিক শাসন বজায় রাখতে হয় তবে নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন ভাবে কাজ করতে দিতে হবে।
পটনায় এক অনুষ্ঠানে সাংবিধানিক সংস্থাগুলির ভূমিকা নিয়ে সরব হন বিচারপতি নাগরত্ন। তাঁর কথায়, ‘‘নির্বাচন কমিশন, কন্ট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল ও অর্থ কমিশনের মতো সংস্থা এমন ক্ষেত্রে কাজ করে যেখানে সাধারণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নিরপেক্ষতা বজায় রাখা কঠিন হতে পারে। সে জন্যই এই সংস্থাগুলিকে বিশেষ ভাবে তৈরি করা হয়েছে। তাই এই সংস্থাগুলির রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রভাবের বাইরে থেকে কাজ করা একান্ত প্রয়োজন।’’
এ দিনের বক্তৃতায় ভারতীয় গণতন্ত্রে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাও ব্যাখ্যা করেছেন বিচারপতি নাগরত্ন। তাঁর কথায়, ‘‘নির্বাচন কেবল নির্দিষ্ট সময়কাল অন্তর হওয়া ঘটনা নয়। তা দেশের রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ গঠনের অস্ত্র। আমাদের সাংবিধানিক গণতন্ত্র বার বার প্রমাণ করেছে, নির্দিষ্ট সময়কাল অন্তর নির্বাচন হলে কোনও বাধা ছাড়াই সরকার বদল হতে পারে। সেই প্রক্রিয়ার উপরে নিয়ন্ত্রণের অর্থ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার শর্তের উপরে নিয়ন্ত্রণ।’’
বিচারপতি নাগরত্ন স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, টি এন শেষন বনাম কেন্দ্রের মামলায় সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সংস্থা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তাদের উপরেই নির্বাচন প্রক্রিয়ার সততা নির্ভর করে। কিন্তু সেই মামলাতেও সুপ্রিম কোর্ট উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। যাঁরা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তাঁদের উপরে যদি যাঁরা নির্বাচন করান তাঁরা নির্ভরশীল হন তবে প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।’’
বিচারপতি নাগরত্নের মতে, ইতিহাসের অমোঘ শিক্ষা হল সংবিধানের কাঠামো অকেজো হয়ে গেলেই সাংবিধানিক প্রক্রিয়া ভেঙে পড়ে। তার পরেই অধিকার লঙ্ঘন শুরু হয়। তাঁর কথায়, ‘‘সাংবিধানিক সংস্থাগুলি যখন একে অপরের কাজে প্রয়োজনমতো বাধা দেওয়া বন্ধ করে দেয় তখনই সাংবিধানিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। তখন নির্বাচন হতে পারে, আদালত কাজ করতে পারে, সংসদ আইন তৈরি করতে পারে। কিন্তু ক্ষমতার উপরে উপযুক্ত নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে না। কারণ, কাঠামোগত শৃঙ্খলাই বজায় থাকবে না।’’
কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক নিয়েও এ দিন তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন বিচারপতি নাগরত্ন। তাঁর কথায়, ‘‘রাজ্যগুলি কোন কোন ক্ষেত্রে কেন্দ্রের আজ্ঞাবহ, তা সংবিধানেই উল্লেখ করা হয়েছে। তার বাইরে রাজ্যগুলি কেন্দ্রের অধীনস্থ নয়।’’ তাঁর কথায়, ‘‘রাজ্যে যে রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন তাদের সঙ্গে একই রকম ব্যবহার করা প্রয়োজন। উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে বাছাই করে পদক্ষেপ করা গ্রহণযোগয নয়। এ ক্ষেত্রে সাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন।’’ তাঁর মতে, রাজ্যে-রাজ্যে ও কেন্দ্র-রাজ্যে ক্রমবর্ধমান সংঘাত দেশের পক্ষে স্বাস্থ্যকর নয়।
বিচারপতি নাগরত্নের কথায়, ‘‘একটি পরিণত যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গ কথায় কথায় একে অপরের বিরুদ্ধে আদালতে যায় না। যখন রাজ্যগুলি একে অপরের ও কেন্দ্রের বিরুদ্ধে মামলা করতে শুরু করে তখন বোঝা যায় সহযোগিতামূলক যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো দুর্বল হয়েছে। সীমানা বিবাদ ও জল বণ্টনের মতো বিবাদ যথেষ্ট জটিল। আদালতে সেই বিবাদ দীর্ঘদিন ধরে চলার সম্ভাবনা থাকে।’’ পশ্চিমবঙ্গ-সহ নানা রাজ্যের বিরোধী দলের সরকারের সঙ্গে কেন্দ্রের নানা বিরোধ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই শীর্ষ আদালতে শুনানি চলছে। তার মধ্যেই শীর্ষ আদালতের বিচারপতির এই মন্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ বলে মত রাজনীতিক ও আইনজীবীদের।
বিচারপতি নাগরত্নের মতে, সংবিধান একটি প্রতিষ্ঠানের উপরে সম্পূর্ণ ভরসা করেনি। বরং এমন একটি ব্যবস্থার উপরে নির্ভর করেছে যেখানে একটি সংস্থা অন্য সংস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করবে। তাঁর কথায়, ‘‘এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হল সময়ে সময়ে ঠোকাঠুকি তৈরি। তার ফলেই তৈরি হয় নিয়ন্ত্রণ। সংখ্যাগুরুর হাতে ক্ষমতা থাকার ফলে বা কেবল আবেগের বশে যাতে সিদ্ধান্ত না নেওয়া হয়, তা-ই এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিশ্চিতকরা হয়েছে।’’
বিচারপতি নাগরত্নের মতে, বিচার বিভাগের কর্তৃত্ব একটি বাস্তব বিষয়। তবে প্রশাসন কতটা সেই নির্দেশ মানছে তার উপরেও সেই কর্তৃত্ব নির্ভর করে। আদালতকে সব সময়েই সংবিধানের শৃঙ্খলা মেনে চলতে হবে। তাঁর কথায়, ‘‘ক্ষমতার উৎস যতই বৈধ হোক, দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতেইহবে।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)