×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১১ মে ২০২১ ই-পেপার

ব্রডগেজ নিয়ে কোহিমা সীমান্তে ভারত

অমিতাভ বন্দ্যোপাধ্যায় ও আশিস বসু
০২ অগস্ট ২০১৬ ০৩:৫৩
ডিমাপুর-কোহিমার ব্রডগেজের উদ্বোধনে রেলমন্ত্রী সুরেশ প্রভু। রয়েছেন নাগাল্যান্ডের রাজ্যপাল পি বি আচার্য, মুখ্যমন্ত্রী টি আর জেলিয়াং। — নিজস্ব চিত্র

ডিমাপুর-কোহিমার ব্রডগেজের উদ্বোধনে রেলমন্ত্রী সুরেশ প্রভু। রয়েছেন নাগাল্যান্ডের রাজ্যপাল পি বি আচার্য, মুখ্যমন্ত্রী টি আর জেলিয়াং। — নিজস্ব চিত্র

ব্রডগেজ ট্রেন নিয়ে এ বার উত্তর-পূর্বের ‘স্পর্শকাতর’ সীমান্তের কাছে পৌঁছল ভারত।

আজ নাগাল্যান্ডের ডিমাপুর থেকে রাজধানী কোহিমা পর্যন্ত ব্রডগেজ প্রকল্পের উদ্বোধন করে সেই পথেই এগোল নয়াদিল্লি। উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলের ডিমাপুর স্টেশনে রেলমন্ত্রী সুরেশ প্রভু ওই প্রকল্পের শিল্যান্যাস করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যপাল পি বি আচার্য, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী টি আর জেলিয়াং। রেলকর্তারা জানিয়েছেন, জম্মু থেকে শ্রীনগর পর্যন্ত ট্রেন লাইন বসানোর কাজকে ‘জাতীয় প্রকল্প’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। ডিমাপুর-কোহিমা ব্রডগেজও হবে তা-ই। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে ২০২০ সালের মধ্যে ওই প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।

ইতিমধ্যেই উত্তর-পূর্বাঞ্চলের তিন রাজ্যের রাজধানীকে ভারতীয় ব্রডগেজ রেল মানচিত্রে যুক্ত করা হয়েছে। গত কাল শুরু হয়েছে আগরতলা-দিল্লি যাত্রিবাহী ট্রেন চলাচল। রেলকর্তারা জানিয়েছেন, সিকিমেও ব্রডগেজ পৌঁছনোর সমীক্ষা দ্রুত শুরু করা হবে। রেলমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নির্দেশে উত্তর-পূর্বে একগুচ্ছ উন্নয়নমূলক প্রকল্প শুরু করেছে রেল মন্ত্রক। তাঁর কথায়, ‘‘রেল যোগাযোগ বাড়লে পিছিয়ে পড়া রাজ্যগুলিতে পর্যটন বাড়বে। বাড়বে বাণিজ্যিক যোগাযোগও।’’

Advertisement

রেল সূত্রে খবর, ডিমাপুরের কাছে ধনসিরি থেকে জুবজা (প্রায় কোহিমা) পর্যন্ত ৮৮ কিলোমিটার ব্রডগেজ লাইন বসানো হবে। ওই রুটে তৈরি হবে ১১.৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি টানেল। সেটি জম্মু-শ্রীনগর রুটের পীরপঞ্জল টানেলের চেয়েও বড় হবে। তা ছাড়া আইরিং নদীর উপরে প্রায় কুতুব মিনারের সমান উচ্চতার একটি সেতুও তৈরি করা হবে। উল্লেখ্য, কোহিমা থেকে চিনের দূরত্ব প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার। মায়ানমার সীমান্ত ৪৯৫ কিলোমিটার দূরে।

এ দিকে ব্রডগেজ মানচিত্রে যুক্ত হওয়ার পর পর্যটন শিল্পের দ্রুত বিকাশের সম্ভাবনা দেখছেন ত্রিপুরাবাসী। ত্রিপুরায় এত দিন পর্যটকরা আসতেন বিমান বা সড়কপথে। কলকাতা বা দেশের অন্য প্রান্ত থেকে সরাসরি বিমানে আগরতলা। না হলে সড়কপথে অসমের গুয়াহাটি বা শিলচর, মেঘালয়ের জয়ন্তিয়া হিল্স হয়ে উত্তর ত্রিপুরার ধর্মনগর বা কুমারঘাট ছুঁয়ে এ রাজ্যে ঢুকে পড়া।

গুয়াহাটি থেকে আগরতলার দীর্ঘ ৬২০ কিলোমিটার ক্লান্তিকর সড়ক অতিক্রম করতে বাসে সময় লাগে ২৪-২৮ ঘণ্টা। রেলে তা কমে দাঁড়াবে ১২-১৩ ঘণ্টায়। প্রায় অর্ধেক সময়। গত কাল যে ‘ত্রিপুরাসুন্দরী এক্সপ্রেস’ আগরতলা ছেড়েছে দুপুর ২টো ৪০ মিনিটে। আজ ভোর পাঁচটায় তা পৌঁছয় গুয়াহাটি। পথে উৎসাহী মানুষের ভিড় সামাল দিয়ে এগিয়ে যেতে নির্দিষ্ট সময়ের থেকে কিছুটা বেশি সময় লাগলেও, আগামী দিনে ওই পথই ১২-১৩ ঘণ্টায় অতিক্রম করা যাবে।

বর্তমানে ভারতীয় রেল নেটওয়ার্কে আগরতলা থেকে কলকাতার দূরত্ব ১ হাজার ৬১৩ কিলোমিটার। সড়কপথে তা ১ হাজার ৬৮০ কিমি। সময় লাগে প্রায় আড়াই দিন। তা-ও অসম, মেঘালয় এবং ত্রিপুরার বেহাল পাহাড়ি পথে দুর্ভোগ বাড়ে। রেল পরিষেবা শুরু হওয়ায় ভ্রমণপিপাসুদের কাছে ত্রিপুরা সফর এখন অনেক আরামদায়ক হবে।

রাজ্যের পর্যটন দফতরের কর্তারা বলছেন, ধর্মনগর স্টেশনে নামলেই উত্তর ত্রিপুরা এবং ঊনকোটি জেলার আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রগুলি সহজেই পর্যটকদের হাতের মুঠোয় চলে আসবে। ত্রিপুরার পর্যটনমন্ত্রী রতন ভৌমিকের আশা, রেলের যাত্রা শুরু হওয়ায় আগামী দিনে এ রাজ্যে ভিড় বাড়বে পর্যটকদের।

ঊনকোটি জেলার ঊনকোটি পার্বত্য স্থাপত্য কয়েক হাজার বছরের পুরনো। সে সব বৌদ্ধ এবং হিন্দু যুগের বলে দাবি করা হয়। সে সবের সংরক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে কেন্দ্রীয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ। পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় শীতে ত্রিপুরার জম্পুই পাহাড়ের কমলা বাগান এবং কমলা উৎসব। পাখিরালয় রয়েছে উত্তর ত্রিপুরার রোয়াতে।

ধর্মনগর থেকে আগরতলা আসার আগে মাঝে ট্রেন থামবে আমবাসায়। সেখানে পর্যটকরা ঘুরতে পারেন লংতরাই ভ্যালি, আঠারোমুড়া এবং বড়মুড়া-দেওতামুড়া পাহাড়। ঘন জঙ্গলে ঘেরা পাহাড়ে এক সময়ে বাঘ ভল্লুকের দেখা পাওয়া গেলেও, এখন রয়েছে মেঘলা চিতাবাঘ। আগরতলায় রয়েছে উজ্জ্বয়ন্ত প্রাসাদ, হেরিটেজ পার্ক, বেনুবিহার বা বুদ্ধ মন্দির, চতুর্দশ দেবতা মন্দির, শিবনগরের গেদু মিঞার মসজিদ।

রেল মন্ত্রকের আশা, কিছু দিনের মধ্যেই ব্রডগেজ রেল পরিষেবা পৌঁছে যাবে দক্ষিণ ত্রিপুরার সাব্রুমেও। সেখান থেকে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম যাওয়া যায় সহজেই। সেখানে রয়েছে ডম্বুর লেক, পিলাক, ত্রিপুরেশ্বরী মন্দির, তৃষ্ণা অভয়ারণ্য।

পর্যটন মন্ত্রী বলেন, ‘‘পর্যটন শিল্পের বিকাশের সম্ভাবনা রেল পরিষেবার জন্য সহজেই বেড়ে গেল। এখন সরকারি যাত্রী নিবাসগুলির আধুনিকীকরণের উপর পর্যটন দফতর আরও নজর দেবে।’’

শুধু পর্যটনই নয়। ব্রডগেজ ট্রেন পরিষেবা চালু হওয়ার পর ত্রিপুরার ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের আশাতেও রয়েছেন রাজ্যবাসী। সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানের সুযোগও বাড়বে বলে মনে করছেন রাজ্যের বিদ্বজ্জনরা।

Advertisement