Advertisement
E-Paper

আক্রমণের লক্ষ্য আমরা সবাই, বলছে জেএনইউ

মাইক বলে যাচ্ছে, অবিরাম—‘‘না। আজও জামিন হয়নি ছাত্র সংগঠনের সভাপতি কানহাইয়া কুমারের। আরও দু’দিন পুলিশি হেফাজতে থাকার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।’’ ক্ষীণ আশা যেটুকু ছিল, সেটুকুও সাঙ্গ হয়ে গেল।

অনমিত্র সেনগুপ্ত ও প্রেমাংশু চৌধুরী

শেষ আপডেট: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০৪:৩৭

খবরটুকু আসার অপেক্ষা। মুহূর্তে অশান্ত হয়ে উঠল শান্ত ভিড়টা।

মাইক বলে যাচ্ছে, অবিরাম—‘‘না। আজও জামিন হয়নি ছাত্র সংগঠনের সভাপতি কানহাইয়া কুমারের। আরও দু’দিন পুলিশি হেফাজতে থাকার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।’’ ক্ষীণ আশা যেটুকু ছিল, সেটুকুও সাঙ্গ হয়ে গেল।

খবরটুকু প্রচার হওয়ার অপেক্ষা। মুহূর্তে তা ছড়িয়ে গেল জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস জুড়ে। অলিতে-গলিতে, গোদাবরী হোস্টেল থেকে নর্মদা হোস্টেলে। শীতের শেষ বিকেলে যাঁরা হোস্টেলে চলে গিয়েছিলেন বা যাচ্ছিলেন, মুহূর্তে ফের এসে জড়ো হলেন অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ব্লকের সামনে। গঙ্গা ধাবার সামনে যাঁরা ভিড় করেছিলেন, তাঁরাও মুহূর্তে হাজির হলেন এই প্রশাসনিক ভবনের সামনে। সমবেত সিদ্ধান্ত হল, আজকের মতো আগামী কালও চলবে ক্লাস বয়কট। আর বুধবার প্রতিবাদ মিছিল হবে মান্ডি হাউস থেকে শাস্ত্রী ভবন পর্যন্ত। প্রতিবাদ পৌঁছে দেওয়া হবে একেবারে কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রী স্মৃতি ইরানির মন্ত্রকের দোরগোড়ায়।

অথচ, সকাল থেকে আশায় বুক বাঁধছিল ছাত্র-ছাত্রীদের ভিড়টা। ছাত্র ধমর্ঘট, তাই পড়াশোনা বন্ধ। উপাচার্যের অনুরোধে কান না দিয়ে এ দিন কার্যত ফাঁকা গিয়েছে অধিকাংশ ক্লাসই। বেশির ভাগ পড়ুয়ারই আশা ছিল, প্রথম ধাক্কায় দিল্লি পুলিশ ভুল করে গ্রেফতার করেছে কানহাইয়াকে। এখন সত্যিটা যখন সামনে এসেছে, তখন আজ হয়তো ছাড়া পেয়ে যাবেন ছাত্র সংসদের এই নেতা। আশায় বুক বাঁধছিলেন জেএনইউ কর্তৃপক্ষও। সদ্য কাজে যোগ দিয়েছেন উপাচার্য জগদেশ কুমার। সঙ্ঘ-ঘনিষ্ঠ ওই উপাচার্যের নিয়োগ নিয়ে এমনিতেই বিতর্কের শেষ নেই। তার মধ্যে যে ভাবে ছাত্র বিক্ষোভ ঠেকাতে পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছেন তিনি, তা মোটেই ভাল ভাবে নেয়নি জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন (জেএনইউটিএ)। গোটা শিক্ষক সংগঠন এখন পাশে এসে দাঁড়িয়েছে কানহাইয়ার। ফলে বেজায় অস্বস্তিতে পড়ে গিয়েছেন উপাচার্য। তিনি অবশ্য দাবি করেছেন, প্রথমে আগ বাড়িয়ে পুলিশ ডাকলেও পরে তাদের ফিরে যেতে বলেন তিনি। যদিও শিক্ষক সংগঠনের অভিযোগ, এ ক্ষেত্রেও মিথ্যা কথা বলছেন তিনি। ছাত্র ও শিক্ষক, দু’পক্ষের আস্থা হারিয়ে কার্যত একঘরে উপাচার্যের অবস্থা এবিভিপি নেতাদের মতোই। তবে গতকালের মতো আজও পুলিশ-পাহারা ছিল মূল গেটের বাইরে। ভিতরে বহিরাগতের প্রবেশে ছিল ব্যাপক কড়াকড়ি।

এ দিন দুপুরে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পৌঁছলাম, তখন মিনিট কুড়ি হল্লা করে ফেরার জন্য ব্যস্ত বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেত্রী সাধ্বী প্রাচী। এসেছেন নির্দিষ্ট সময়ের প্রায় ঘণ্টা দেড়েক পরে। তাই অপেক্ষা করে ফিরে গিয়েছেন এবিভিপি সমর্থকেরা। কুড়িয়ে-বাড়িয়ে জনা কুড়ি সমর্থক নিয়ে ভিতরে আর প্রবেশ করতে চাননি প্রাচী। জেএনইউ-এর নর্থ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে রণং দেহি ভঙ্গিমায় দেশদ্রোহীদের দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়েই গাড়িতে সেঁধিয়ে যান তিনি।

দফায় দফায় ছাত্রদের জমায়েত, আলোচনা পার হয়ে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ব্লিন্ডিংয়ের সামনে মূল জমায়েতে যখন পৌঁছলাম, তখন গোটা ভিড়টি মোদীর নামে প্যারডি করতে ব্যস্ত। শেষ হতেই শুরু হল আলোচনা— কী ভাবে ১৪ বছর পরে এবিভিপি একটি পদে জেতার পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ অশান্ত করে তোলা হচ্ছে। পরিকল্পিত ভাবে উত্তেজনা ছড়ানো হচ্ছে। যার খেসারত দিতে হয়েছে কানহাইয়া কুমারকে। সাহিত্যের ছাত্র রাহুল বললেন, ‘‘ছাত্র রাজনীতিতে বাম দুর্গ হিসেবে পরিচিতি রয়েছে এই জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের। তাই এখানকার রাজনৈতিক ঘাঁটি ভাঙতে কানহাইয়া ছাড়াও আরও জনা কুড়ি বামপন্থী নেতা-নেত্রীর নামেও অভিযোগ দায়ের করেছে এবিভিপি।’’

কথা বলতে বলতে চোখ চলে গেল মধ্যবয়স্কার দিকে। ছাত্র-ছাত্রীরা মাঝে মাঝেই এসে শরীরের খোঁজ নিয়ে যাচ্ছেন তাঁর। খোঁজ নিয়ে জানলাম, তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই প্রাক্তন ছাত্রী। বতর্মানে ‘সেন্টার ফর লিঙ্গুইস্টিক্স’-এর অধ্যাপক আয়েশা কিদওয়াই। কানহাইয়ার সমর্থনে আজ দুপুরে পাতিয়ালা কোর্টে ছিলেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘‘আমরা সাত জন শিক্ষক ও বেশ কিছু ছাত্র আদালত চত্বরে উপস্থিত ছিলাম। হঠাৎ আমাদের দেশদ্রোহী বলে আক্রমণ করে একদল যুবক ও আইনজীবী। যারা আসলে এবিভিপি-র সমথর্ক। আদালতের মূল দরজা বন্ধ করে আমাদের প্রাণে মারার চেষ্টা করা হয়। মহিলাদের হেনস্থা করা হয়। এক সময় মনে হচ্ছিল মরেই যাব!’’ শারীরিক নিগ্রহের চিহ্ন নিয়ে ক্যাম্পাসেই ফিরে আসেন তিনি। নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানান। পাতিয়ালা কোর্টে আরও যে সব ছাত্র-ছাত্রী ছিলেন এবং আজ সেখানে নিগ্রহের শিকার হয়েছেন, তাঁরাও গলা মেলান আয়েশার সঙ্গে।

ভিড়ের মাঝে বেজায় উত্তেজিত গার্গী-চৈতালীরা। যে ভাবে ঘটনার পরে গোটা জেএনইউকে ‘দেশদ্রোহীদের আস্তানা’ বলে প্রচার চালানো হচ্ছে তাতে বিলক্ষণ চটেছেন তাঁরা। এই সব পড়ুয়াদের বক্তব্য, এবিভিপি ও বিজেপি পরিকল্পিত ভাবে এই উস্কানিতে মদত দিচ্ছে। শাসক শিবিরের এই প্রচারে চটেছেন শিক্ষক সংগঠনও। অর্থনীতির অধ্যাপক জয়তী ঘোষের মতে, ‘‘আসলে সরকার জেএনইউকে বন্ধ করে দিতে চাইছে। এটা কোনও ছাত্রের বিরুদ্ধে নয়, আসলে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শাসক দলের আক্রমণ।’’ তিনি জানালেন, অধিকাংশ শিক্ষক এই বিক্ষোভে ছাত্রদের পাশে রয়েছেন। ‘‘কিন্তু পরিস্থিতি যে রকম, তাতে কবে থেকে স্বাভাবিক পঠনপাঠন শুরু হবে তা বলা মুশকিল’’— আশঙ্কা জয়তীদেবীর।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy