মহিলা সংরক্ষণ এবং লোকসভায় আসনবৃদ্ধি সংক্রান্ত ১৩১তম সংবিধান সংশোধনী বিল লোকসভায় ভোটাভুটির পথে হাঁটল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকার। দু’দিনের বিতর্ক-পর্ব শেষে শুক্রবার বিকেলে বিল নিয়ে ভোটাভুটি শুরু হতে চলেছে। বিরোধীদের ‘মুড’ আঁচ করে ভোটাভুটির আগে সরকার পক্ষের শেষ বক্তা অমিত শাহ সরাসরি বিরোধীদের ‘মহিলা বিরোধী’ বলে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। সেই সঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধির যুক্তি দিয়ে সংসদ সংখ্যা বা়ড়ানোর জোরদার সওয়ালও করেন। শাহ বলেন, ‘‘এমন লোকসভা আসন আছে, যেখানে ভোটারের সংখ্যা ৪৮ লক্ষ। কী ভাবে সেখানকার সাংসদেরা ভোটদাতাদের প্রত্যাশা পূরণ করবেন?’’
বিরোধীদের উদ্দেশে আবেদন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘‘আমাদের উপর ভরসা রাখুন। বিল পাশ করতে দিন।’’ কিন্তু শাহের আবেদন সত্ত্বেও সরকারপক্ষের রাজনৈতিক কৌশল আঁচ করে অবস্থানে অনড় থাকেন বিজেপি বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র সাংসদরা। বিরোধীদের তরফে বাধা পেয়ে কিছুক্ষণ পরেই মেজাজ হারান শাহ। দক্ষিণ ভারতের বঞ্চনার অভিযোগ নস্যাৎ করে বিরোধীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘‘দেশের মধ্যে বিভাজন করতে চাইছেন? চুল সাদা হয়ে যাবে, কিন্তু এখানে (ট্রেজারি বেঞ্চের দিকে ইঙ্গিত করে) পৌঁছতে পারবেন না।’’ সেই সঙ্গে তাঁর হুঁশিয়ারি, ‘‘এর পরে যখন ময়দানে যাবেন, মাতৃশক্তির ক্রোধ টের পাবেন।’’
বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া সংসদের তিন দিনের বিশেষ অধিবেশনে তিনটি বিল পাশ করাতে সক্রিয় কেন্দ্র। কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী অর্জুন রাম মেঘওয়ালের পেশ করা তিনটি বিলের প্রথমটি— লোকসভা এবং বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভায় মহিলাদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ১৩১তম সংবিধান সংশোধনী বিল ( পোশাকি নাম, ‘নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম’। লোকসভার সাংসদ সংখ্যা বাড়িয়ে ৮৫০ করার বিষয়টি এরই অন্তর্গত), দ্বিতীয়টি— লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাস (ডিলিমিটেশন) সংক্রান্ত বিল। তৃতীয়টি— কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল আইন সংশোধনী বিল (কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে আসনবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে)।
বিরোধীদের অভিযোগ ছিল, মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষণ সংক্রান্ত সংশোধনী বিলকে শিখণ্ডী করে আসলে লোকসভার আসন বাড়াতে সক্রিয় হয়েছে বিজেপি। লোকসভায় দু’দিনের বিতর্কে প্রিয়ঙ্কা গান্ধী, অখিলেশ যাদবরা অভিযোগ তুলেছিলেন, জনগণনার আগেই সুবিধামতো আসন পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলির প্রভাব খর্ব করে উত্তর ভারতের আসনের অনুপাত বাড়িয়ে নেওয়াই উদ্দেশ্য, যেখানে বিজেপির প্রভাব অনেক বেশি। অভিযোগ, সেই কারণেই সংবিধান সংশোধনী বিলে লোকসভার আসন বৃদ্ধির সঙ্গে মহিলা সংরক্ষণকে জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার ‘নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম’ বিল লোকসভায় পেশের পর বিরোধীদের বক্তব্য ছিল, লোকসভার আসন বৃদ্ধির মতো ভিন্ন একটি বিষয়কে মহিলা সংরক্ষণ বিলের অধীনে আনা হয়েছে বিজেপির রাজনৈতিক লক্ষ্যসাধনের জন্যই। বিরোধী নেতাদের যুক্তি, ২০২৩ সালে ‘নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম’ বিল পাশ হয়েছিল লোকসভা এবং রাজ্যসভায়। মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণের ওই বিলে বলা হয়েছিল, জনগণনার পরে আসন পুনর্বিন্যাস করা হবে। তার পর ওই আসনের ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণ করা হবে মহিলাদের জন্য। কিন্তু এখন কেন্দ্র আর জনগণনা পর্যন্ত অপেক্ষা না করে দু’টি পৃথক বিষয়কে কেন একসঙ্গে জুড়ে দেওয়া হল, সে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। কেন্দ্রের তরফে কোনও সদুত্তর না মিললেও বিজেপি অবশ্য এই বিলের বিরোধিতা করার মধ্যে বিরোধীদের মহিলা আসন সংরক্ষণের বিরোধিতাই দেখেছে।
বিরোধীদের অভিযোগ ছিল, জনগণনার আগে এই সংরক্ষণ কার্যকর হলে অনগ্রসর গোষ্ঠীর (ওবিসি) মহিলারা বঞ্চিত হবেন। শুক্রবার বক্তৃতাপর্বে লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী হুঁশিয়ারি দেন, সমস্ত বিরোধী দল একজোট হয়ে সরকারের এই প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করবে। তিনি বলেন, ‘‘আপনাদের (বিজেপি) ক্ষমতা কমে আসছে। সেই জন্য দেশের ভোট মানচিত্র বদলের জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন। যেমন অসমে করেছেন। কিন্তু আমরা আপনাদের এই চেষ্টা সফল হতে দেব না। সব বিরোধী দল আপনাদের হারাবেই। আমরা ওবিসিদের অধিকার ছিনিয়ে নিতে দেব না। আপনারা ওবিসি এবং দলিতদের হিন্দু বলেন। কিন্তু দেশে ওঁদের কোনও অধিকার দেন না। সত্যি কথা আপনাদের খুব খারাপ লাগে।’’ অন্য দিকে, ভোটাভুটি শুরুর আগেই সমাজমাধ্যমে একটি পোস্টে লোকসভার সমস্ত সদস্যের উদ্দেশে ভেবেচিন্তে পদক্ষেপ করার জন্য আবেদন করেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। তিনি বলেন, ‘‘দেশের নারীশক্তির সেবা করার ক্ষেত্রে এটি বড় সুযোগ। তাঁদেরকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করবেন না!’’ তাঁর আবেদন ছিল, ‘চার দশক ধরে নারী সংরক্ষণের বিষয়টি নিয়ে প্রচুর রাজনীতি হয়েছে। এখন সময় এসেছে, দেশের অর্ধেক জনসংখ্যাকে অবশ্যই তাদের অধিকার দিতে হবে।’’ কিন্তু প্রধানমন্ত্রী-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আবেদনে বিরোধীদের তরফে সাড়া মিলল না।