Advertisement
E-Paper

প্রতিবন্ধী কোটায় ডাক্তারি পড়তে পা কেটে ফেললেন উত্তরপ্রদেশের তরুণ! তবে বানানো ‘হামলা’ ধোপে টিকল না

সুরজের দাবি মতো শুরুতে খুনের চেষ্টার মামলা দায়ের করা হলেও তদন্তে নেমে খটকা লাগে পুলিশের। কারণ, ঘটনাস্থলে কোনও ধস্তাধস্তির চিহ্ন ছিল না। উল্টে তরুণের ঘর থেকে একটি করাত, অ্যানাস্থেশিয়ার খালি শিশি এবং ব্যবহৃত সিরিঞ্জ উদ্ধার হয়।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ ২০:৫৪
প্রতিবন্ধী কো এমবিবিএস-এ ভর্তি হতে নিজেই নিজের পা কেটে ফেললেন উত্তরপ্রদেশের সুরজ ভাস্কর।

প্রতিবন্ধী কো এমবিবিএস-এ ভর্তি হতে নিজেই নিজের পা কেটে ফেললেন উত্তরপ্রদেশের সুরজ ভাস্কর। ছবি: সংগৃহীত।

স্বপ্ন ছিল, ডাক্তার হবেন। কিন্তু তিন বারের চেষ্টাতেও প্রতিযোগিতার ইঁদুরদৌড়ে সাফল্য পাননি। উপায়ান্তর না-দেখে শেষমেশ চরম সিদ্ধান্ত নিলেন তরুণ। প্রতিবন্ধী কোটায় এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি হতে কেটে ফেললেন নিজেরই পা! সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশের জৌনপুরে ঘটনাটি ঘটেছে। খবর প্রকাশ্যে আসতেই ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে নানা মহলে। উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সমাজতত্ত্ববিদ থেকে মনোবিদ— সকলেই।

নাম সুরজ ভাস্কর। বয়স ২৪। উত্তরপ্রদেশের জৌনপুরের লাইন বাজারের বাসিন্দা সুরজ ফার্মাসি নিয়ে ডিপ্লোমা স্তরের পড়াশোনা শেষ করে এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি হতে চেয়েছিলেন। দু’চোখে ছিল ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন। পর পর তিন বছর ডাক্তারির প্রবেশিকা পরীক্ষায় বসেন। কিন্তু সাফল্য মেলেনি। মরিয়া হয়ে শেষে নিজেই নিজের পা কেটে ফেলার পরিকল্পনা করেন সুরজ, যাতে প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত আসনে ডাক্তারিতে ভর্তি হতে পারেন। এখানেই শেষ নয়, পুলিশের চোখে ধুলো দিতে রোমহর্ষক গল্পও ফাঁদেন সুরজ। তদন্তকারীদের সুরজ জানান, গত ১৮ জানুয়ারি রাতে তিনি তাঁর ঘরে ঘুমোচ্ছিলেন। মাঝরাতে দুই অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি ঘরে ঢুকে তাঁর উপর চড়াও হন। বেধড়ক মারধর করা হয় তরুণকে। তাতেই নাকি সংজ্ঞা হারান সুরজ। পর দিন সকালে উঠে দেখেন, তাঁর বাঁ পায়ের চারটি আঙুল কাটা!

ঘটনা প্রসঙ্গে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্বের অধ্যাপক প্রশান্ত রায় বলেন, ‘‘খুবই দুঃখজনক ঘটনা। এ তো প্রায় আত্মহত্যারই শামিল! এতে তাঁর মৃত্যুও হতে পারত। আজকের দিনে চাকরির নিরাপত্তা নেই। ফলে চাকরি পাওয়ার জন্য অনেকে মরিয়া হয়ে সামাজিক বা শারীরিক ভাবে নিজেকে পিছিয়ে রেখে তার সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেন। যাঁর অসংরক্ষিত আসনে চাকরির আবেদন করার কথা, কখনও কখনও তিনি জাতিগত শংসাপত্র কিংবা প্রতিবন্ধী শংসাপত্র জোগাড় করে চাকরি পাওয়ার সহজ রাস্তা খোঁজেন। আগে এমনও দেখা যেত, কোনও পদের জন্য যা যোগ্যতা প্রয়োজন, তার চেয়ে বেশি যোগ্যতাসম্পন্ন চাকরিপ্রার্থীরাও নিজেদের যোগ্যতা লুকিয়ে আবেদন করছেন। যে চাকরির জন্য মাধ্যমিক স্তরের যোগ্যতা থাকলেই হবে, সেখানে হয়তো আবেদন করছেন বিএ পাস পড়ুয়ারা।’’

অনেকটা একই রকমের এক ঘটনা ঘটেছিল বছর দেড়েক আগে। নিজেকে অনগ্রসর শ্রেণিভুক্ত এবং প্রতিবন্ধী দাবি করে ভুয়ো শংসাপত্র বার করে ভারতের অন্যতম কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ইউপিএসসি-র গণ্ডি টপকে আমলা হয়েছিলেন মহারাষ্ট্রের পূজা খেড়কর। সেই ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই শোরগোল পড়ে যায় সারা দেশে। আবেদন প্রক্রিয়ার নানা স্তরে আবেদনকারীর নথিপত্র খতিয়ে দেখার কড়াকড়ি বাড়িয়ে এ ধরনের ঘটনা খানিক রোখা গিয়েছে। তবে সমাজে এই প্রবণতা কমেনি।

জৌনপুরের পুলিশ সুপার (সিটি) গোল্ডি গুপ্তও বলছেন একই কথা। তাঁর কথায়, ‘‘একে পড়াশোনার প্রচণ্ড চাপ, পাশাপাশি লক্ষ্যপূরণে বার বার ব্যর্থ হওয়া— সব মিলিয়ে মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন সুরজ। শেষমেশ মরিয়া হয়ে আত্মঘাতী এই পন্থা বেছে নেন তিনি।’’ সুরজের কীর্তি প্রকাশ্যে আসার পর প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার এই ইঁদুরদৌ়ড় নিয়ে ফের উদ্বেগ বেড়েছে নানা মহলে।

মনোসমাজকর্মী মোহিত রণদীপের কথায়, ‘‘আজকের দিনে পড়ুয়াদের অনেকেরই ধারণা তৈরি হচ্ছে যে, নির্দিষ্ট একটি পেশায় না-যেতে পারলে তাঁর জীবন অর্থহীন। ডাক্তারই হতে হবে, নইলে জীবন ব্যর্থ— একমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে এমনটা ভেবে নেওয়া এক ধরনের ‘অবসেসিভ প্যাটার্ন’ হতে পারে।’’ মোহিত বলেন, ‘‘শুধু পারিবারিক বা পারিপার্শ্বিকের চাপে নয়, অনেক ক্ষেত্রে পড়ুয়ারা নিজেও এমন একটি নির্দিষ্ট চিন্তার ঘেরাটোপে আটকে পড়েন। সেই নির্দিষ্ট চিন্তার বাইরে তাঁরা আর কিছু ভাবতে পারেন না। এই ভাবনাগুলো থেকে বেরোতে হবে। জীবনে আরও অনেক কিছু করার রয়েছে। ডাক্তার না হলেই কারও জীবন ব্যর্থ হয়ে যায় না। এটা এক ধরনের মানসিক সমস্যা। এর চিকিৎসা দরকার। ওষুধের পাশাপাশি থেরাপির মাধ্যমেও এর চিকিৎসা সম্ভব।’’

সুরজের দাবি মতো শুরুতে খুনের চেষ্টার মামলা দায়ের করা হলেও তদন্তে নেমে খটকা লাগে পুলিশের। কারণ, ঘটনাস্থলে কোনও ধস্তাধস্তির চিহ্ন ছিল না। উল্টে তরুণের ঘর থেকে একটি করাত, অ্যানাস্থেশিয়ার খালি শিশি এবং ব্যবহৃত সিরিঞ্জ উদ্ধার হয়। ঘটনাস্থলের ফরেনসিক পরীক্ষায় আরও জানা যায়, সেই রাতে সুরজের বাড়িতে দ্বিতীয় কোনও ব্যক্তি প্রবেশ করেননি। এর পরেই তরুণকে চেপে ধরেন তদন্তকারীরা। তরুণের প্রেমিকাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। আর তাতেই প্রকাশ্যে আসে আসল সত্য। সুরজের প্রেমিকা পুলিশকে জানিয়েছেন, ২০২৬ সালে যেনতেনপ্রকারেণ ডাক্তারিতে ভর্তি হতে চেয়েছিলেন সুরজ। নিজে ফার্মাসি নিয়ে পড়ার সুবাদে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অআকখ-ও জানা ছিল তাঁর। সেই জ্ঞান কাজে লাগিয়ে নিজেই নিজের পায়ের আঙুল কেটে ফেলেন তিনি। ভেবেছিলেন, এতে তিনি প্রতিবন্ধী শংসাপত্র পাবেন। তার পর সহজেই প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত আসনে এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়ে যাবেন! কিন্তু সব পরিকল্পনামাফিক হলেও শেষমেশ স্বপ্নপূরণ হল না তাঁর।

UP Jaunpur Leg MBBS doctor NEET
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy