মহিলাদের জরায়ুমুখ কর্কট রোগের টিকা (এইচপিভি ভ্যাকসিন) কেন্দ্রের কাছ থেকে পাওয়ার পরেও রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর টিকাকরণ কর্মসূচি শুরু করেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। অথচ দেশের একাধিক রাজ্য ইতিমধ্যে লক্ষাধিক কিশোরীকে নিখরচায় এই টিকা দিয়ে ফেলেছে বলে খবর।
টিকা পাওয়া সত্ত্বেও কেন তা দেওয়া হয়নি, তা নিয়ে রাজ্যের স্বাস্থ্যকর্তারা বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। তাঁরা জানান, টিকাকরণ শুরু করার সবুজসঙ্কেত মেলেনি। ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী দেশব্যাপী এই কর্মসূচির সূচনা করেন। অনেকেই বলছেন, রাজ্যে ভোট ঘোষণা হয়েছে। তাই নতুন সরকার গঠনের আগে এই কর্মসূচি শুরুর সম্ভাবনা নেই।
স্বাস্থ্য মন্ত্রকের অভিযোগ, নিখরচায় জরায়ুমুখ কর্কট রোগের টিকাকরণের জন্য পশ্চিমবঙ্গে গত ডিসেম্বরে প্রায় ৩ লক্ষ টিকা পাঠানো হয়েছিল। এই কর্মসূচিতে একটি ‘কোয়াড্রিভ্যালেন্ট’ (যে টিকা একবারই দেওয়া হয়) এইচপিভি ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ভাঁড়ারে টিকা পড়ে থাকা সত্ত্বেও রাজ্য কর্মসূচি শুরু করেনি।
পশ্চিমবঙ্গে টিকাকরণের দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য দফতরের আধিকারিক পাপড়ি নায়েকের কথায়, ‘‘ডিসেম্বরে পাওয়ার পর টিকাগুলি যথাযথ ভাবে সংরক্ষিত রয়েছে। টিকাকরণ শুরুর নির্দেশ পাইনি। এর বেশি জানাতে পারব না।’’ স্বাস্থ্যসচিব নারায়ণস্বরূপ নিগমও কোনও মন্তব্য করতে চাননি। বিষয়টি নিয়ে রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্য, ‘‘এমন বহু কেন্দ্রীয় প্রকল্প আছে যাতে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে গরিব মানুষ সুবিধা পেতেন। কিন্তু এ রাজ্যে বিজেপি এবং নরেন্দ্র মোদীর জনপ্রিয়তা বেড়ে যাবে, এই ভয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তা হতে দেননি।’’ উল্লেখ্য, কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য কর্মসূচি কার্যকর করা নিয়ে গড়িমসির অভিযোগ রাজ্যের বিরুদ্ধে আগেও উঠেছে।
সূত্রের খবর, ২০২৭ সালের মধ্যে দেশের প্রায় ২ কোটি ৭০ লক্ষ কিশোরীকে জরায়ুমুখ কর্কট রোগের টিকা দেওয়ার কথা। কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর ১৭ মার্চের মধ্যে বিভিন্ন রাজ্য মিলিয়ে ১৪ বছর বয়সী প্রায় তিন লক্ষ কিশোরীকে টিকা দেওয়া হয়েছে। মধ্যপ্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, গুজরাত, ওড়িশা এবং মিজোরাম টিকাকরণের সামনের সারিতে। প্রসঙ্গত, ভারতে প্রতি বছর ৮০ হাজারের বেশি মহিলা জরায়ুমুখের কর্কট রোগে আক্রান্ত হন, যা বিশ্বের মধ্যে সব থেকে বেশি। বছরে প্রায় ৪২ হাজার ভারতীয় মহিলা এই রোগে মারা যান। সরকার বিনামূল্যে যে টিকা দিচ্ছে তার একটি ডোজ় ভারতে জরায়ুমুখ কর্কট রোগের একাধিক প্রজাতির (টাইপ ১৬, ১৮, ৬ ও ১১)থেকে সুরক্ষা দিতে পারবে বলে দাবি করা হয়।
স্বাস্থ্য মহলের খবর, বেসরকারি ভাবে দোকান বা হাসপাতাল থেকে এই টিকা নিতে গেলে প্রায় ১৮০০-৮৮০০ টাকার মতো খরচ পড়ে। দরিদ্র মহিলাদের পক্ষে তা নেওয়া সম্ভব নয়। অথচ তাঁদের মধ্যেই এই কর্কট রোগের প্রকোপ বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) অন্তর্গত ‘ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসার’-এর ‘আর্লি ডিটেকশন, প্রিভেনশন অ্যান্ড ইনফেকশন’ শাখা-র প্রধান চিকিৎসক পার্থ বসুর কথায়, ‘‘গত ১৬ বছর ধরে এই সিঙ্গল ডোজ় এইচপিভি টিকার উপর গবেষণা করছি। এটি অত্যন্ত কার্যকর। পশ্চিমবঙ্গ টিকা হাতে পেয়েও টিকাকরণে দেরি করছে। এর ফলে কয়েক হাজার কিশোরীর বয়স ১৪ পেরিয়ে যাবে। তারা সরকারি কর্মসূচিতে নিখরচায় টিকাকরণ থেকে বঞ্চিত হবে।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)