E-Paper

টাকা-জমিই বড় বালাই! ভোট এলে নিজের দর বোঝে বাগান

অসমের যোরহাটে কাছোজান চা বাগানে রাহুল গান্ধীর সভা শেষ। ধামসা-মাদল বাজিয়ে নাচগান প্রচুর হল।

রাজীবাক্ষ রক্ষিত

শেষ আপডেট: ০৮ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৩৮
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

ট্রাম্প যেন কে? এপস্টিন ফাইল যেন কী? আদানির নামে ট্রাম্প কেন মামলা করেছে? কারা যেন আমেরিকার কাছে কী কী বেচে দিল? তেলের দাম আসলে বাড়াচ্ছে কে! বলি, আমাদের মজুরিটা তা হলে কে বেশি বাড়াবেন? রাহুল না মোদী?

ওই শেষের কথাটুকুই মোদ্দা প্রশ্ন! বাকি সব বুঝুন গিয়ে নেতারা! ভালয় ভালয় হাতখরচটুকু দিয়ে দিলেই হল।

অসমের যোরহাটে কাছোজান চা বাগানে রাহুল গান্ধীর সভা শেষ। ধামসা-মাদল বাজিয়ে নাচগান প্রচুর হল। নেতাদর্শনও হল। রাহুলের ভাষণ জুড়ে থাকল ডোনাল্ড ট্রাম্প, এপস্টিন ফাইলস, আন্তর্জাতিক সঙ্কট, আদানির বিরুদ্ধে ট্রাম্পের মামলা ইত্যাদি। নেচেকুঁদে ফিরতে থাকা শ্রমিকরা জানালেন, সারাংশ যা বুঝেছেন, তা হল ট্রাম্প লোকটা সুবিধের নন। চা বেচে প্রধানমন্ত্রী হওয়া নরেন্দ্র মোদীকে চাপে রেখেছেন। রাহুল বলেছেন, মোদীকে নাকি গোপন ফাইল খোলার ভয় দেখিয়ে ভারতের শিল্প, জমি, নাগরিকদের তথ্য— সব হাতিয়ে নিচ্ছে আমেরিকা। আমেরিকার অনুমতি ছাড়া ভারত কারও থেকে তেল কিনতে পারছে না! ফলে তেলের দামও বেড়েছে।অবশ্য শ্রমিকদের বাগান তো বাড়ির কাছেই। গাড়ি চড়তে হয় না। মূল্যবৃদ্ধির সমস্যা বোঝার তুলনায় দিনমজুরি বাড়ার সমাধানসূত্রই শ্রমিকদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য। আফশোস করছিলেন রাজ্য পর্যায়ের কংগ্রেস নেতা— “বাগানের মানুষের মন জয় বরং অনেক সোজা, আর সেখানেই সঠিক চিত্রনাট্যে বাজিমাত করছেন ‘চায়েওয়ালা মোদী’। রাহুল যা যুক্তি-তথ্য দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করছেন, মোদী তা সহজাত অভিনয়ে ম্লান করে দিচ্ছেন।”

যোরহাট চা বাগানের জেলা। রাজ্যের ৩৫ থেকে ৪০টি বিধানসভা কেন্দ্রে চা বাগানের ভোট নির্ণায়ক ভূমিকা নেয়। এই গুরুত্বপূর্ণ ভোটব্যাঙ্কের স্বার্থেই প্রিয়ঙ্কা গান্ধী বঢরা চা শ্রমিকদের সঙ্গে পাত পেড়ে খেতে বসেন। পাতা তোলার পরে চা শ্রমিককে করজোড়ে প্রণাম করে হাততালি কুড়োন মোদী।

বাগানের ভোট মানেই টানাপড়েনের গল্প। চা বাগান ছিল এক সময়ে কংগ্রেসের দুর্গ। গত ১০ বছরের বিজেপি শাসনে সেখানে পালাবদল হলেও এখনও অনেক বাগানে কংগ্রেসের ভিত মজবুত। কিন্তু অসমে চা চাষের ইতিহাসে প্রথম বার শ্রমিকদের হাতে জমির পাট্টা তুলে দিয়ে বাজিমাতে অনেকটাই সফল বিজেপি। ভিতরে পাকা হয়েছে রাস্তা। পাকা বাড়িও অনেক। দিনমজুরিও সদ্য ৩০ টাকা বাড়িয়েছে সরকার। তাই যত বাগান ঘুরেছি, সবাই অন্তত মুখে বলেছেন, বিজেপির দিকেই পাল্লা ভারী। তবে খবর ভাসে যে, কেউ যাতে লেবার লাইনে বিরোধীদের হয়ে দল পাকাতে না পারে, সেই দিকে নজর রাখতে শুধু সর্দার কুলিরাই নয়, বিজেপির নজরদারি বাহিনীও বাগানে সক্রিয়।

দেশের প্রথম ভারতীয় চা বাগানের প্রতিষ্ঠাতা মণিরাম দেওয়ানের হাতে গড়া ১৮৪০-এর দশকের সিনামারা চা বাগান এখন সরকার অধিগ্রহণ করেছে। সেখানকার আড়াই হাজার শ্রমিকের মধ্যে দেড় হাজারের বেশি শ্রমিক পাট্টার কাগজ হাতে পেয়েছেন। কিন্তু অনেকে পাকা বাড়ি পাননি। কারও ‘অরুণোদয়’ প্রকল্পের টাকা ৯ মাস ঢোকেনি। বাগানে জলাভাব প্রবল। ১০ বছর ধরে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরেও বিজেপি চা শ্রমিকদের তফসিলি জনজাতির মর্যাদা দিতে পারেনি। তা নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে। শ্রমিকদের অনেকে জানালেন, তাঁরা বিজেপির সভাতেও যাচ্ছেন, কংগ্রেসের সভাতেও যাচ্ছেন। কিন্তু কংগ্রেসের দিকে ঝুঁকলেই সরকারি সুবিধা বন্ধ হওয়ার ভয় রয়েছে।

চা-বাগানে অপুষ্টি, রক্তাল্পতা এবং স্বাস্থ্যসঙ্কট এখনও বড় সমস্যা। চা শিল্পও এখন ধুঁকছে। বেসরকারি বাগানের মালিকেরা তাই বাগানের জমি শ্রমিকদের দেওয়ার বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করেছেন। চামোং কোম্পানির ডাফলাটিং বাগানে এখনও পর্যন্ত জমি জরিপও হয়নি। তাই কর্মীরা এখনও পুরো আস্থা রাখতে পারছেন না প্রতিশ্রুতিতে। সেখানে দেড় টাকা মজুরিতে কাজে ঢোকা শ্রমিকও পেলাম। আজ ২৮০ টাকা বেতন তাঁদের কাছে মন্দের ভাল।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Tea Garden Wokers

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy