Advertisement
E-Paper

আম নাম তুলনাহীন

সুপ্রিয় পাঠক, আলফানসো মনে হাপুস-এর দেশের মানুষ আপনি। আপনাকে আমি আর বেশি কী বলব? সব কথাই আপনি জানেন। আপনি জানেন কী ভাবে হিমবাহ গলে, গলার পর কী ভাবে সে পরিণত হয় পাহাড়ি ঝরনায়। আর ঝরনা কখন নদী হয়ে নেমে আসে সমতলে। সমতল থেকে বইতে বইতে সে কখন মিশে যায় মোহনায়। এসবই আমার মতন একজন অভাগা কলমচি না লিখলেও আপনি সবই জানেন। আসলে আমার এই কথাগুলো সন্ধের প্রদীপ জ্বালানোর জন্য দুপুরে বসে সলতে পাকানোর মতো। আর ওই যা হয় আর কী! কী নিয়ে লিখতে বসেছি, আর কোথায় চলে এলাম। বলছিলাম যে আলফানসোর দেশের লোক আপনি, আর আপনাকে আম নিয়ে এই ভরা জ্যৈষ্ঠে সাতকথা শোনাব, এমন হয় নাকি! তবু বলি।

রূপক চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ০৬ জুন ২০১৪ ২৩:০৫

সুপ্রিয় পাঠক, আলফানসো মনে হাপুস-এর দেশের মানুষ আপনি। আপনাকে আমি আর বেশি কী বলব? সব কথাই আপনি জানেন। আপনি জানেন কী ভাবে হিমবাহ গলে, গলার পর কী ভাবে সে পরিণত হয় পাহাড়ি ঝরনায়। আর ঝরনা কখন নদী হয়ে নেমে আসে সমতলে। সমতল থেকে বইতে বইতে সে কখন মিশে যায় মোহনায়। এসবই আমার মতন একজন অভাগা কলমচি না লিখলেও আপনি সবই জানেন। আসলে আমার এই কথাগুলো সন্ধের প্রদীপ জ্বালানোর জন্য দুপুরে বসে সলতে পাকানোর মতো। আর ওই যা হয় আর কী! কী নিয়ে লিখতে বসেছি, আর কোথায় চলে এলাম। বলছিলাম যে আলফানসোর দেশের লোক আপনি, আর আপনাকে আম নিয়ে এই ভরা জ্যৈষ্ঠে সাতকথা শোনাব, এমন হয় নাকি! তবু বলি।

আমার কেন যেন মনে হয়েছে বাসনার সেরা বাসা রসনায়, আর রসনার সেরা আম। এ কথাটা একদম ঠিক বুঝেছেন অরবিন্দ কেজরিবাল। ঘোর দিল্লিবাসী। কিন্তু দেখিয়ে তো দিল। গোটা দলটারই নাম দিলআম আদমি পার্টি। একটা ফলের নাম দিয়ে একটা রাজনৈতিক দলের নাম। এর উদাহরণ গোটা ভূভারতে আর নেই। কেননা অরবিন্দ কেজরিবাল বুঝেছিলেন মানুষের মূল ইচ্ছার মধ্যে যেতে হবে। মানুষের মূল ইচ্ছেটা কী?

অনেক ভেবে দেখলাম, হে পাঠক মার্জনা করবেন, (কবীর সুমন যে ভাবে টিভি চ্যানেলে মার্জনা চান ঠিক সে ভাবেই এই মার্জনা চাওয়া।) আমি ভেবে দেখেছি, মানুষের মূল ইচ্ছে এই মরসুমে মূলত দুটি। এক কামসূত্র, দুই আমসূত্র। কোনওটাই অগ্রাহ্য করবার উপায় মানুষের হাতে নেই। বাঙালি জীবনে বিয়ের পর সন্তান জন্মে গেলে বৌ অবধারিত বাচ্চা নিয়ে শোবে আর স্বামী এসএমএস করতে করতে রাত্রি ভোর করে দেবে। মাসে কী দু’মাসে কখনও হয়তো আচমকা কিছু ঘটে যাওয়া। এহেন বাঙালির কামসূত্র হৃদয়ে চর্চা করা ছাড়া আর কোনও কাজ নেই। উল্টো দিকে রয়েছে আমসূত্র। হ্যাঁ, এ চর্চায় কোনও বাধানিষেধ নেই। পাশের বাড়ির গাছ থেকে পেড়ে খাও অথবা পকেটের মালকড়ি খসিয়ে খাও। আম-হি-আম। এ প্রসঙ্গে একটা গানের কথা মনে পড়ে গেল। ‘এমন মাটিতে চাঁদের উদয় কে দেখবি আয়’। এ গান লেখা হয়েছিল যুগাবতার চৈতন্যদেবকে নিয়ে।

কিন্তু এ গান একটু ঘুরিয়ে বললে আমকে নিয়েও বলা যায়। বলা যায়‘এমন মাটিতে আমের উদয় কে খাবি আয়’। বলতে ভুলে গেছি। পাঠক কিছু মনে করবেন না। বয়সের জন্য স্মৃতি ভাল কাজ করে না। হ্যাঁ, যা বলছিলাম, শুধু অরবিন্দ কেজরিবাল কেন? দিল্লির বাদশারা অব্দি আমের অসম্ভব ভক্ত ছিলেন। তাঁদের আমের প্রতি ভক্তি এতটাই ছিল যে, ‘আম দরবার’ নাম দিয়ে তাঁরা মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন ও বাক্যালাপ করতেন। সম্ভবত এ রকমই এক আম দরবারে বীরবলের চাকরি হয়েছিল বাদশাহ আকবরের কাছে। এ তথ্য জানিয়েছিলেন আশুতোষ গোয়াড়েকর। কেননা তিনি অনেক দিন ধরেই ক্যামেরা ফেলে রেখেছিলেন দিল্লিতে।

যাক সে সব কথা। আমি বলতে চাইছি পাকা আমের গন্ধর সঙ্গে কামের সম্পর্ক অতি নিবিড়। শুধুমাত্র কোনও একটি পানীয় প্রস্তুতকারক কোম্পানি বোধকরি একটু ভুল করেছিল। তারা পাকা আমকে পানীয় হিসেবে বাজারে এনেছিল। আর তাদের মডেল ছিল ক্যাটারিনা কাইফ। পানীয়ের নাম ছিল আমসূত্র। কিন্তু, পাঠক মার্জনা করবেন। আর যাই হোক, ক্যাটারিনা কাইফের আবেদন আমসূত্রে মনে হয়েছে বরফ দেওয়া মাছের মতো। আমসূত্রে দরকার বিপাশা বসু বা সোনাক্ষ্মী সিংহকে। হতে পারে এই দীন লেখক টলিউড ঘরানার। কিন্তু যে কথা বললাম তা ফেলে দেবেন না। কেননা মনে রাখতে হবে বাঙালির অক্ষর পরিচয় আম দিয়ে। মহামতি বিদ্যাসাগর কবেই শিখিয়ে দিয়েছিলেনঅ-য় অজগর আসছে তেড়ে, আমটি আমি খাব পেড়ে। শিশু বাঙালি যখন অক্ষর চেনে তখন থেকে সে আমকে চেনে।

আর কোনও ফলের ভাগ্যে এমন সম্মান জুটেছে কি না সন্দেহ। এমনকী এও মনে হয় আদম আর ইভ বোধহয় জামাকাপড়বিহীন অবস্থায় আম-ই খেয়েছিল। কেননা আপেলের এতটা যৌন আবেদন নেই, যা আমের আছে। কিন্তু কথা অন্য জায়গায়। যে আম নিয়ে এত কথা হচ্ছে, প্রায় আম-দরবার বসে গিয়েছে। আমজনতা আলোচনা করছে, সেই আমের পেকে ওঠার পিছনে গ্রীষ্মের দুই সন্তানের মধ্যে জ্যৈষ্ঠের অবদান সর্বাধিক। যদিও এ বারের জ্যৈষ্ঠ, যাকে বলে প্রাণঘাতী। এ রকম খটখটে জ্যৈষ্ঠ বাঙালি বোধহয় প্রথম দেখছে। ‘পরিবর্তন’ শব্দটা এ বারেই সবচেয়ে ভাল মানাচ্ছে এই বঙ্গে। সে যাক গে, জ্যৈষ্ঠকে কেউ কিন্তু খুব একটা গুরুত্ব দেয় না। বরং ঘাম হওয়া, রোদ, বাইরে বেরনো যায় না। এ সব নিয়েই তাকে দুয়ো দেওয়া চলে কিন্তু ভুললে চলবে না আমের যৌবন এই জ্যৈষ্ঠর হাতেই।

শুধু আম! লিচু কিংবা কাঁঠাল! কাঁঠালের গন্ধও আর এক কামতাড়িত গন্ধ। কেউ সহ্য করতে পারে, কেউ পারে না। যে পারে সে কাঁঠাল দিয়ে ভাত মেখে খায়। আর যে পারে না সে কাঁঠাল থেকে বহু দূর আলোকবর্ষে বাস করে। আর লিচু। লিচুর কোনও গন্ধ নেই কিন্তু তার চেহারা আর স্বাদ সম্পর্কে কোনও উপমাই যথেষ্ট নয়। বহুবার বাংলা উপন্যাসে নায়িকার ঠোঁটকে লিচুর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এমনকী যে সে লিচু নয়, মজফ্ফরপুরের লিচু। পাঠক, কথা শুরু হয়েছিল কী নিয়ে আর কথা চলে গেল কোথায়। আমরা শুরু করেছিলাম আম দিয়ে। কাঁচা আম প্রতি কুইন্টাল বিকোচ্ছে ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকায়। আপনি দিশি বাংলা মদের দোকানে উপস্থিত হন। দেখবেন তরমুজের ফালির চেয়েও কাঁচা আম বা কাঁচামিঠে আম বেশি বিক্রি হচ্ছে। কলকাতা প্রেস ক্লাবের গায়ে এক বিহারি পুঙ্গব সকাল থেকে সন্ধে কাঁচামিঠে আম বিক্রি করে। তার ব্যস্ততা দেখে মনে হবে ক্ষমতাসীন দলের কোনও নেতা। এমনকী স্কুল-কলেজের সামনেও কাঁচা বা কাঁচামিঠে আমের অসম্ভব চাহিদা।

বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমসাগর এক কুইন্টাল ২৫০০ থেকে ৩০০০ টাকায় বিক্রি হবে। আর কিছু দিন বাদে ল্যাংড়া এক কুইন্টাল ৫০০০ টাকা পর্যন্ত উঠে যেতে পারে। সত্যি বলতে স্বাদ যা, তাতে দাম না হওয়ার কারণ নেই। কিন্তু মনে রাখতে হবে শ্বশুরবাড়ির কথা। আমি অনেক শ্বশুরকে দেখেছি যাঁরা জামাইকে আম খাওয়াতে গিয়ে পথে বসেছেন। গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের একটা বিখ্যাত লাইন একটু পাল্টে নিলেই বোঝা যায় আমের মহিমা। ‘মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক আমি আম-এরই লোক’। আর তাঁর জন্ম হতে পারে ২৫ বৈশাখ কিন্তু তা-ও তো জ্যৈষ্ঠেরই অতি কাছাকাছি।

পাঠক, নজিরবিহীন এ বারের বঙ্গের গরম। বর্ষা কবে আসবে ঠিক নেই। কিন্তু আপনি এই যে লেখাটা পড়ছেন আরব সাগরের তীরে বসে, যাকে বলে আলফানসোর দেশ, সে দেশে নিশ্চয়ই এমন পুড়ে ঝামা হয়ে যাওয়া জ্যৈষ্ঠ নেই। সেখানে নিশ্চয়ই বাতাস একটু ভাল। আপনি আমাদের বাংলার জন্য দু’একটা মেঘ পাঠালে চিরকৃতজ্ঞ থাকব। কেন না আপনাকে পড়াব বলে এ লেখা লিখতে বসেছি ভোরবেলায়। কিন্তু তখনও শুষ্ক গরম। আমের বা লিচুর প্রসন্নতা এই ভোরেও কোনও কাজ করছে না। আসলে আমরা দু’চার লাইন বিক্রি করে খাই। তারা তো আম আদমিই। এক ঝুড়িতে থাকা অনেকগুলো আমের মতো, কোনওটা কাঁচা থেকে যায়, কোনওটা পাকে। কেউ মাঝামাঝি থেকে যায় আজীবন। এই নিয়েই আমাদের আম-দরবার। প্রতি বছর গরমের শুরুতেই খবরের কাগজে ফিচার লেখা হয় আম-জগৎ নিয়ে কিন্তু আমেরা সে সব জানতে পারে না। যেমন জানতে পারে না জ্যৈষ্ঠ মাস। সবাই তাকে দুয়ো দেয়। সে দিন গিয়েছে। ওদের দু’জনেরই কাজ জানান দেওয়া। সময় মতো আমরা এসেছিলাম।

rupak chakrobarty mango
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy