ভোটদান কেন্দ্রে ইন্দিরা গাঁধীর ছবি খুঁজছিলেন কালীতারা মণ্ডল। কিন্তু তাঁর বদলে নাতি আর ছেলের বৌ-এর ছবি দেখে যথেষ্টই হতাশ চিত্তরঞ্জন পার্ক-এর বর্তমান এই বাসিন্দা।
ভোট দিতে এসে মাঝেমধ্যেই অতীতে ফিরে যাচ্ছিলেন তিনি। খুব একটা দোষ তাঁকে বোধহয় দেওয়া যায় না। বয়সটাও তো দেখতে হবে। নয় নয় করে এই মাসের ২২শে কালীতারা পা দিচ্ছেন ১০৭-এ! স্মৃতি একটু আধটু প্রতারণা তাই করতেই পারে!
ভোট দিয়ে বেরিয়ে যে ভাবে কথা বললেন, তাতে কিন্তু মনে হল স্মৃতির এই বেচালপনা নেহাতই সাময়িক। বরিশালের আদি বাসিন্দা এই কালীতারা (যিনি সম্ভবত দিল্লির প্রবীণতম ভোটারও বটে) মুক্তিযুদ্ধের সময়ে এ পারে চলে এসে ত্রাণ শিবিরে কাটিয়েছিলেন দীর্ঘদিন। তবে পশ্চিমবঙ্গে নয়, অন্ধ্রপ্রদেশে। জানাচ্ছেন, “সেই সময় ইন্দিরা গাঁধী আমাদের জন্য যা করেছেন, তা আজও ভুলতে পারি না। চাল, ডাল, জামাকাপড়, অর্থ সবই পাঠিয়ে দিতেন আমাদের ত্রাণ শিবিরগুলোয়। ওই শিবিরেই যখন আমার মেজো ছেলের বিয়ে হল, সরকার থেকে নতুন শাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল উপহার হিসেবে। শুধু আমরা নয়, সবার জন্যই ছিল এই ব্যবস্থা।”
এই বয়েসও এত টনটনে তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা যে দ্রুত ৪টি দশক হেঁটে আসতে পারেন কালীতারা। বলেন, “আমি আজ ভোট দিতে গিয়ে এক বার ভাবলাম ইন্দিরা যেন এখনও রয়েছে। পরে সবাই বলায় ভুল ভাঙল। ওর ছেলের বৌ কিন্তু ওর মতো হয়নি। কিছুই করছে না মানুষের জন্য, শুধু জিনিসের দাম বাড়ছে! তাই পদ্মেই এ বার ছাপ দিয়ে দেখি, যদি জিনিসের দাম কমে!”
বাইরে যেতে হলে হুইল চেয়ার লাগে ঠিকই। কিন্তু খুব শরীর খারাপ না হলে ঘরের মধ্যে নিজেই হাঁটাচলা করেন এই শতাব্দীপ্রাচীন মানুষটি। কানে একটু কম শোনেন। কিন্তু কণ্ঠস্বর স্পষ্ট। চিত্তরঞ্জন পার্কের এক নম্বর বাজারের কাছে ছোট ছেলে সুখরঞ্জন মণ্ডলের সঙ্গে থাকেন। সুখরঞ্জনবাবু বললেন, “খাওয়াদাওয়ায় বাছবিচার নেই মায়ের। আইসক্রিম থেকে স্যুপ, মাছ-মাংস সবই খান। তবে কোনও কারণে শরীর খারাপ হলে গোটা দিন উপোস। চোখে এখনও এতটাই তেজ যে ব্লেড দিয়ে নখ কাটতে পারেন।”
তবে দীর্ঘ আয়ুর যা অভিশাপ, তা বইতে হচ্ছে ওঁকেও। সাত সন্তানের মধ্যে বেঁচে রয়েছেন মাত্র তিন জন। স্বামী গত হয়েছেন তিরিশ বছর হতে চলল। ছেলেরা জীবিকার সন্ধানে নানা জায়গায় ঘুরে গত দু’দশক ধরে দিল্লিতেই থিতু। তাই এর আগেও দিল্লিতে ভোট দিয়েছেন কালীতারা। ‘নিজের দেশ’ ঘুরে আসার ভীষণ ইচ্ছে ছিল একবার। পাঁচ বছর আগে সেই বাংলাদেশেও তাঁকে ঘুরিয়ে এনেছেন ছেলে-বৌ। তখনই তৈরি করা হয় পাসপোর্ট। যেখানে তাঁর জন্মতারিখটি উজ্জ্বল।
২২.৪.১৯০৮!