জা-এর চিবুকে তর্জনী ঠেকিয়ে সীতা লক্ষ্মণের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, ইনি কে? রাম হয়তো নেই, কিন্তু রাজত্ব তো রয়ে গিয়েছে। বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের এইটুকুই সান্ত্বনা, নেত্রী জিজ্ঞাসা করেননি, মুকুল, ইনি কে?
নয়াদিল্লি আসন থেকে ৯০৯টি ভোটের সঙ্গে সঙ্গেই মৃত্যু হল তৃণমূলের সাম্রাজ্য বিস্তারের স্বপ্নের। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছিলেন, তিনি গুজরাত ও মহারাষ্ট্রে জনসমাবেশ করবেন। অণ্ণা-কাণ্ডের পরে তা অবশ্য ভুলে যান। শুধু এই রাজধানীর ভোট হিসেবেই দেখা যাচ্ছে, জামানত সশব্দে জব্দ হয়ে গিয়েছে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের। এখানকার সাতটি আসনে সাকুল্যে দশ হাজার ভোটও জোটেনি দলের। কিন্তু দক্ষিণ দিল্লির প্রার্থী শ্রীরূপা মিত্রচৌধুরী অথবা পূর্ব দিল্লির মহম্মদ শাহিদ সিদ্দিকীদের তুলনায় সাদা-কালো জমানার এই নায়কের হতাশা অনেকটাই গভীর। কেননা টানাপড়েনের পারিবারিক জীবনে এই লড়াইটা তাঁর কাছে কিছুটা ফিরে আসার লড়াইও ছিল বটে।
তাঁকে পিছনে ফেলে ৩৪টি আসনের মধ্যে জিতে যাঁরা আগামী পাঁচ বছর সংসদে দাপাবেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রী। যেমন মুনমুন সেন, অর্পিতা ঘোষ, শতাব্দী রায়, তাপস পালের মতো অতীত-বর্তমানের তারকারা। থাকছেন দেবও। বয়সে প্রায় ২৫ বছরের ছোট হলেও যিনি বিশ্বজিৎ-পুত্র প্রসেনজিতের রুপোলি পর্দার প্রতিযোগীও বটে। ভোটপ্রচারে পুত্রকে পাশে পাননি বিশ্বজিৎ। যদিও প্রচারের আগে তিনি দাবি করেছিলেন, “বুম্বা আর অর্পিতা আসবে বলেছে। শু্যটিংয়ের থেকে সময় বের করে।” সেই সময় আর বের করে উঠতে পারেননি প্রসেনজিৎ। তবে বিশ্বজিৎ যদি জিতে আসতে পারতেন, তা হলে পুত্রবৎ দেবের সঙ্গে অন্তত পাঁচ বছর ওঠাবসা তো করতে পারতেন। হয়তো সেই রাজনৈতিক সংসর্গ কিছুটা বদলেও দিতে পারত তাঁদের পারিবারিক শীতলতাকে।
কিন্তু সেই সুযোগটিও হারালেন বিশ্বজিৎ। আসলে গোড়া থেকেই তাঁর অবস্থা ছিল ভোট ময়দানের ঢাল-তলোয়ারহীন এক যোদ্ধার মতো। সামনে-পিছনে কেউ নেই। রামলীলার মঞ্চে যিনি বিশ্বজিতের এনার্জির প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছিলেন, সেই নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নাম ঘোষণাটুকু করে ফিরে যান নিজের রাজ্যে। আর ফিরে তাকাননি। মমতা তো নয়ই, কলকাতা থেকে বিশ্বজিতের প্রচারে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়নি তৃণমূলের এক জনও বড় বা মাঝারি মাপের নেতাকে। অথচ এমনটা যে হবে, গোড়ায় ভাবেননি বিশ্বজিৎ। বরং তাঁর আশা ছিল খুবই। এই প্রতিবেদককে তিনি একাধিকবার জানিয়েছেন, “শাহরুখ খান বা মিঠুন চক্রবর্তী এক দিন করে নিশ্চয়ই আসবেন প্রচারে। সেটা শুধু আমার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক আছে বলে নয়। মমতা ওঁদের এক বার অনুরোধ করবেন, তা হলেই কাজ হয়ে যাবে।”
কেউ অনুরোধ করেননি। ফলে শাহরুখ বা মিঠুন দূরস্থান, বিশ্বজিতের গোটা প্রচারই রয়ে গেল তারকাহীন। শুধু মান রক্ষার মতো শেষ দিনে দেখা গিয়েছে বিগতযৌবনা পদ্মিনী কোলাপুরীকে!
দৃশ্যতই হতাশ বিশ্বজিৎ। মুখে অবশ্য বলছেন, “বিজেপি ঝড়ে দিল্লিতে কংগ্রেসের বড় বড় রাজনৈতিক নেতা হেরে গিয়েছেন। সেখানে আমি তো নবাগত।” এ-ও বলছেন, “আমি দিল্লির প্রার্থী ছিলাম ঠিকই, কিন্তু পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গে দলের প্রচারকও তো ছিলাম। তাই রাজ্যে তৃণমূলের বিরাট জয়ে আমারও অবদান রয়ে গিয়েছে বলে মনে করি।” কিন্তু এই কথাগুলো শোনাচ্ছে সান্ত্বনা-বাক্যের মতোই। কেননা নয়াদিল্লির প্রার্থী হয়ে যাওয়ার পরে এক দিনের জন্যও দলনেত্রীর সঙ্গে কোনও কথা হয়নি বিশ্বজিতের। যিনি রাজনীতির অ-আ-ক-খ জানেন না, তাঁর জন্য কোনও উপদেশ বা পরামর্শও ছিল না নেত্রীর। কলকাতার দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ এতটাই দুর্বল ছিল যে মনোনয়ন জমা দিতে গিয়ে ব্যাপক হয়রানির মধ্যে পড়তে হয় তাঁকে। তিন-তিন বার ডিএম-এর অফিসে গিয়ে শেষমেশ কাগজ জমা দেন বিশ্বজিৎ। প্রথমে সমস্ত প্রয়োজনীয় কাগজ সঙ্গে ছিল না, নির্বাচনী ক্ষেত্রে প্রার্থীর যে একটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থাকা অপরিহার্য সেই তথ্যটুকুও জানানো হয়নি বিশ্বজিৎকে। কেননা তাঁর সঙ্গে ভোটের ক’দিন যাঁরা ছিলেন, তাঁদের বেশির ভাগই রাজনৈতিক অলিন্দে অপরিচিত মুখ, ভোটের পর দিন থেকে যাঁদের আর দেখা যায়নি।
সব মিলিয়ে তাই উপেক্ষার ঝুলি নিয়ে মুম্বইয়ে ফিরতে হল বিশ্বজিৎকে।