এক মহিলার ফোনে আড়িপাতা নিয়ে নরেন্দ্র মোদী ও তাঁর ঘনিষ্ঠ নেতা অমিত শাহের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিশন গড়তে কেন্দ্রীয় সরকার উঠেপড়ে লাগলেও আপত্তি উঠল ইউপিএ-র অন্দরেই। প্রকাশ্যেই এ নিয়ে আপত্তি জানালেন এনসিপি নেতা শরদ পওয়ার ও জম্মু-কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী তথা ন্যাশনাল কনফারেন্স নেতা ওমর আবদুল্লা। তাঁদের বক্তব্য, সরকারের মেয়াদ শেষ হতে মাত্র ক’দিন বাকি। তার আগে এ ভাবে কমিশন গড়ার জন্য তত্পর হয়ে সরকার ভুল করছে।
কংগ্রেসের নেতারাও মানছেন এর অন্যতম লক্ষ্য হল শেষ দু’দফা ভোটের আগে এই প্রচারকে আরও তীব্র করে তোলা যে মহিলাদের পক্ষে মোদী মোটেই নির্ভরযোগ্য নন। সেই সঙ্গে ভবিষ্যতের জন্য মোদীর পথে তদন্তের কাঁটা বিছিয়ে রাখা। কিন্তু ইউপিএ-রই দুই শরিক নেতার বিরোধিতা মোদীর বিরুদ্ধে কংগ্রেসের প্রচারকে শুধু ভোঁতা করে দিল না, শাসক দলকে অস্বস্তিতেও ফেলে দিল ভোট মেটার আগেই। এই বিরোধিতা ভোটের পর রাজনৈতিক সমীকরণের পুনবির্ন্যাস নিয়ে জল্পনায় আরও অক্সিজেন জোগাল।
তবে প্রকৃত কারণ যা-ই হোক, সরকারের বিরুদ্ধে শরিকরা মুখ খোলায় বল পেয়েছে বিজেপি। অরুণ জেটলির সঙ্গে এক সুরে অমিত শাহ বলেন, “বিষয়টি নিয়ে রাজ্যস্তরে ইতিমধ্যেই কমিশন গড়া হয়েছে। তা সত্ত্বেও রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে কেন্দ্রীয় স্তরে কমিশন গঠন করতে তত্পর হয়েছে কংগ্রেস।”
জোটে-বাইরে বিরোধের মুখে পড়েও কংগ্রেস অনড়। দলের সদর দফতরে আজও সাংবাদিক বৈঠক করে হাইকম্যান্ডের তরফে ফের প্রশ্ন তোলা হয়েছে, কেন কমিশন নিয়োগ করা যাবে না? তা ছাড়া মহিলার ওপর গোয়েন্দাগিরি নিয়ে মোদীর বিরুদ্ধে দশ দফা প্রশ্নও তুলেছে কংগ্রেস।
এক মহিলা স্থপতির ওপর গোয়েন্দাগিরি চালানোর অভিযোগ এনে গত অক্টোবরে একটি সিডি ফাঁস করে দিয়েছিল কোবরাপোস্ট নামে একটি সংস্থা। তাতে সবিস্তার কল রেকর্ড এবং ফোনে কথোপকথনের অডিও টেপ তুলে ধরে বলা হয়েছিল, বেঙ্গালুরুর ওই মহিলার ওপর মোদীর নির্দেশে গোয়েন্দাগিরি করেছিল গুজরাত পুলিশের অপরাধ দমন শাখা এবং সন্ত্রাস দমন শাখা। মোদীর নির্দেশে অমিত শাহ তাতে নেতৃত্ব দেন বলেই অভিযোগ।
তখন থেকেই এই অভিযোগ নিয়ে মোদীর পিছনে পড়ে কংগ্রেস। যেহেতু গুজরাত পুলিশ রাজ্যের বাইরে গিয়ে মুম্বই ও বেঙ্গালুরুতে পর্যন্ত মহিলার ওপর নজর রেখেছিল এবং ফোনে আড়ি পেতেছিল, তাই এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় স্তরে তদন্ত কমিশন গড়ার ব্যাপারে গত ডিসেম্বর মাসে মন্ত্রিসভার বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ওই বৈঠকে শরদ পওয়ার এবং ফারুক আবদুল্লাহও উপস্থিত ছিলেন। ঠিক হয়েছিল, সুপ্রিম কোর্ট বা হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত কোনও বিচারপতিকে কমিশন-প্রধান করা হবে। কিন্তু কোনও প্রাক্তন বিচারপতিই সেই দায়িত্ব নিতে আগ্রহ না দেখানোয় অস্বস্তিতে পড়ে সরকার। ফলে কমিশন এখনও গঠন করা সম্ভব হয়নি। এই অবস্থায় চার মাস শীতঘুমে থাকার পর এখন ফের কমিশন গঠন করতে সক্রিয় হয়েছে কংগ্রেস। পওয়ার-ওমরের আপত্তি মূলত এতেই।
পওয়ার এ ব্যাপারে ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহকে ফোনও করেছিলেন। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা এনসিপি নেতা প্রফুল্ল পটেল এ দিন জানান, “প্রধানমন্ত্রীকে পওয়ার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এখন কমিশন গড়া ঠিক হচ্ছে না। কারণ, আর ক’দিনেই সরকারের মেয়াদ শেষ হবে। তার আগে এ ভাবে কমিশন গঠন করা নীতিসঙ্গত হবে না।” অন্য দিকে জম্মু কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আজ টুইট করেন, “কাল রাতে বাবার সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলছিলাম। একেবারে অন্তিম প্রহরে এসে কমিশন গড়াটা ভুল হচ্ছে বলে বাবাও মনে করেন।”
তা হলে কি পওয়ার ভোটের পর বিজেপি-র সঙ্গে সমঝোতার পথ খুলে রাখতে চাইছেন? সন্দেহ নেই, এই জল্পনাটা আজ আরও গাঢ় হয়েছে। যদিও প্রফুল্ল পটেল তাদের অবস্থান ব্যখ্যায় বলেছেন, “কমিশনের গঠনের ব্যাপারে আমরা আগে সম্মতি দিয়েছিলাম। কিন্তু এখন বারণ করছি, কারণ কমিশন গঠন করতে দেরি হয়ে গিয়েছে। তার মানে এই নয় যে অন্য কোনও দলকে আমরা সমর্থন করছি। সেই প্রশ্নই ওঠে না।”
দুই শরিক কমিশন নিয়ে আপত্তি তুললেও কপিল সিব্বল আজ বলেন, “বিজেপি বলছে কংগ্রেস প্রতিহিংসার রাজনীতি করছে। কিন্তু একবারও জবাব দিচ্ছে না যে কেন ওই মহিলার ওপর গোয়েন্দাগিরি করা হয়েছিল। তা ছাড়া ওই মহিলার পরিবারকে রাতারাতি ‘স্মার্ট গ্রিড’ তৈরি করার বরাতই বা কেন দেওয়া হয়েছিল তা-ও স্পষ্ট নয়। মোদী যদি নিরপরাধ হন, তাহলে অকারণে ভয় পাচ্ছেন কেন?”
এটা স্পষ্ট যে, সরকার শেষ পর্যন্ত কমিশন গড়ুক বা না-গড়ুক কংগ্রেস এটাকে মোদীর বিরুদ্ধে শেষ লগ্নের ভোট প্রচারে জিইয়ে রাখতে মরিয়া। তবে কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত যেহেতু মন্ত্রিসভার বৈঠকে নেওয়া হয়েছিল, তাই এ ব্যাপারে ভবিষ্যতেও জটিলতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থেকে গেল।