Advertisement
E-Paper

জওয়ানে জঙ্গি ভ্রম, গুলিতে নিহত শিক্ষক

জঙ্গি গতিবিধির খবর পেয়ে রাস্তায় চলছিল সেনা-নজরদারি। রাতের অন্ধকারে সশস্ত্র জওয়ানদের জঙ্গি ভেবে বসেন এক শিক্ষক ও তাঁর বন্ধু। ভয় পেয়ে পালানোর চেষ্টা করেন তাঁরা। জঙ্গিরা পালাচ্ছে মনে করে স্বয়ংক্রিয় রাইফেল থেকে গুলিবর্ষণ শুরু করেন নিরাপত্তাকর্মীরা।

রাজীবাক্ষ রক্ষিত

শেষ আপডেট: ২৭ নভেম্বর ২০১৫ ০৩:২৯

জঙ্গি গতিবিধির খবর পেয়ে রাস্তায় চলছিল সেনা-নজরদারি। রাতের অন্ধকারে সশস্ত্র জওয়ানদের জঙ্গি ভেবে বসেন এক শিক্ষক ও তাঁর বন্ধু। ভয় পেয়ে পালানোর চেষ্টা করেন তাঁরা। জঙ্গিরা পালাচ্ছে মনে করে স্বয়ংক্রিয় রাইফেল থেকে গুলিবর্ষণ শুরু করেন নিরাপত্তাকর্মীরা। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় দুই নিরীহ গ্রামবাসীর। গত রাতে অসম-লাগোয়া মেঘালয়ের উত্তর গারো পাহাড়ে ওই ঘটনাকে ঘিরে তুমুল বিক্ষোভ দানা বেঁধেছে।

এসপি রমেশ সিংহ জানান, গত রাতে রাজাসিমলার বাসিন্দা সুইটবার্থ মারাক ও আলফিয়াস মোমিন খারকুট্টা এলাকা থেকে খিলরের দিকে যাচ্ছিলেন। মাঝরাস্তায় জওয়ানরা তাঁদের থামতে বলেন। ভয় পেয়ে মোটরসাইকেলের গতি বাড়িয়ে পালানোর চেষ্টা করেন দু’জন। তখনই তাঁদের দিকে গুলি চালানো হয়। রাতে পুলিশ মনে করেছিল, জিএনএলএ জঙ্গিরা দু’জনকে খুন করেছে। আজ সকালে সেনাবাহিনী পুলিশকে জানায়, জওয়ানদের গুলিতে ওই দু’জনের মৃত্যু হয়েছে। খবর ছড়াতেই এলাকায় বিক্ষোভ শুরু হয়। কয়েক দিন আগেই গারো পাহাড়ের পাঁচটি জেলায় আফস্পা লাগু করতে কেন্দ্রকে নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। তার জেরে সেখানে তীব্র অসন্তোষ ছড়িয়েছে। আফস্পা চালু হলে নিরপরাধ মানুষদের হরয়ানি বাড়বে বলে অভিযোগ জানিয়ে বিভিন্ন সংগঠন বিক্ষোভ দেখাচ্ছে। তার মধ্যেই সেনাবাহিনীর গুলিতে দু’জন নিরীহ মানুষের মৃত্যুতে পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হয়ে উঠেছে।

সেনা মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল সুনীত নিউটন অবশ্য ঘটনার দায় নিহতদের উপরেই চাপিয়েছেন। তিনি জানান, অসমে আফস্পা লাগু রয়েছে। নিয়মমতো অসমের সীমানা লাগোয়া পড়শি রাজ্যের ২০ কিলোমিটার অংশও আফস্পার আওতায় পড়ে। গারো পাহাড়ে জিএনএলএ-সহ কয়েকটি জঙ্গি সংগঠন সক্রিয়। তাদের ধরতে প্রায়ই সেনা অভিযান চলে। তাই অসম সীমানা লাগোয়া গারো পাহাড়ে রাতে যাতায়াত করার ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট নিয়মাবলী মানুষকে জানানো হয়েছে। সেই নিয়ম না মানার জন্যই দু’জনকে প্রাণ দিতে হল।

Advertisement

কী হয়েছিল গত রাতে? সেনাবাহিনীর দাবি, জিএনএলএ জঙ্গিদের গতিবিধি রুখতে খারকুট্টা এলাকায় টহল দিচ্ছিলেন নিরাপত্তাকর্মীরা। রাত সাড়ে ৮টা নাগাদ জওয়ানরা খারকুট্টা এলাকায় নজরদারি শুরু করেন। নিউটন জানান, প্রথমে দু’টি মোটরসাইকেল জওয়ানদের নির্দেশ মেনে দাঁড়ায়। তাদের তল্লাশি করে ছেড়ে দেওয়া হয়। পৌনে ন’টা নাগাদ একটি মোটরসাইকেলে দু’জনকে আসতে দেখা যায়। তাঁদেরও থামতে বলা হয়েছিল। কিন্তু আচমকা সওয়ারিরা গতি বাড়িয়ে পালানোর চেষ্টা করেন। ‘অ্যাক্সিলারেটরে’ হঠাৎ জোরে চাপ দেওয়ায় ‘সাইলেন্সার’ থেকে গুলি চলার মতো শব্দ হয়। আগুনের ঝলকানিও দেখা যায়। অন্ধকারে ওই শব্দ শুনে জওয়ানরা ভাবেন পালাতে থাকা জঙ্গিরা গুলি চালাচ্ছে। তাঁরাও মোটরসাইকেলের দিকে গুলি চালাতে শুরু করেন। তাতেই দু’জনের মৃত্যু হয়।

নিহতদের পরিবার দাবি করে, জঙ্গি অধ্যূষিত ওই এলাকায় রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে অপহরণ নিয়মিত ঘটনা। জঙ্গিরাও জংলা পোশাক পরে থাকে। তাই ভয় পেয়ে পালাতে গিয়েছিলেন মারাক ও মোমিন। তাঁদের মোটর বাইকের হেডলাইটও খারাপ ছিল। সেনাবাহিনী নিছক সন্দেহের বশে এলোপাথাড়ি গুলি করে তাঁদের মেরেছে। ঘটনার প্রতিবাদে স্থানীয় মানুষ আজ থানা ঘেরাও করেন। গারো ছাত্র সংগঠন ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেছে। অনিচ্ছাকৃত ঘটনার জন্য দুঃখপ্রকাশ করে সেনাবাহিনী জানায়, নিয়মমতো মোটরসাইকেল থামালে কোনও সমস্যাই হতো না। জওয়ানরা আত্মরক্ষায় গুলি চালিয়েছিলেন। গোটা ঘটনার বিশদ তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অন্য দিকে, সরকারের সঙ্গে শান্তি আলোচনা চালানো এএনভিসি-র প্রাক্তন সেনাধ্যক্ষ জেরম মোমিনকে গ্রেফতার করেছে মেঘালয় পুলিশ। আইজি (আইন শৃঙ্খলা) জি এইচ পি রাজু জানান, নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জিএনএলএ-র সেনাধ্যক্ষ সোহন ডি সিরাকে ১৭ লক্ষ টাকার বিনিময়ে তিনটি রাইফেল ও সাব মেশিনগান বিক্রি করেছেন মোমিন। রাজু বলেন, ‘‘এএনভিসির সেনাধ্যক্ষ থাকার সময় মোমিন অনেক টাকা সংগ্রহ করেছিলেন। আত্মসমর্পণের পর সেই টাকায় তিনি ডেকুতে জমি, গুয়াহাটিতে ফ্ল্যাট ও অন্যান্য সম্পত্তি কিনেছিলেন। পুলিশ অনেক দিন থেকেই তার উপরে নজর রাখছিল।’’ তিনি জানান, এএনভিসি দু’দফায় বহু অস্ত্র জমা দিয়েছে। কিন্তু মোমিন আরও অনেক ভাল আগ্নেয়াস্ত্র লুকিয়ে রেখেছিলেন। তেমনই তিনটি অস্ত্র ও গুলি তিনি সোহনকে বিক্রি করেন। অস্ত্রগুলি হস্তান্তরের সঙ্গে জড়িত তিন এএনভিসি জঙ্গি পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। তারাই মোমিনের নাম জানায়।

রাজুর দাবি, মোমিন সামনে শান্তি আলোচনা চালালেও গোপনে সোহনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন। পুলিশ জানতে পেরেছে— জিএনএলএর কারাবন্দি চেয়ারম্যান চ্যাম্পিয়ন সাংমাকে সরিয়ে মোমিনকে চেয়ারম্যান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সোহন। তাই জিএনএলএ চ্যাম্পিয়নকে ছাড়ানোর কোনও চেষ্টা করছিল না। পুলিশ মোমিন ও জিএনএলএর সম্পর্ক নিয়ে তদন্ত চালাচ্ছে। মোমিনের বিরুদ্ধে সোংসাকে ৫ পুলিশকর্মীকে খুন করে সাড়ে ৮৭ লক্ষ টাকা লুঠ করা, ডিএসপি পেচোন এ সাংমাকে হত্যা করা ও আরও কয়েক জন পুলিশকর্মীকে খুনের অভিযোগ আছে। এএনভিসির সঙ্গে রাজ্য ও কেন্দ্রের শান্তি আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছে। শান্তিচুক্তি নিয়ে কথা চলছে। সংগঠনের মতে, এই পরিস্থিতিতে দলনেতা গ্রেফতার হওয়ায় আলোচনা ধাক্কা খাবে।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy