সারা দিল্লির প্রায় ২৪ লাখ বাঙালির মধ্যে যদি ১০ লাখ সংস্কৃতি মনস্ক মানুষ থাকেন, তার মধ্যে ৯ লক্ষ বাঙালির কাছে মাস্টারমশাই বলে এক জনই পরিচিত। তিনি সুধীর চন্দ। প্রথাগত কোনও স্কুল-কলেজের শিক্ষক না হয়েও মানুষের ভালবাসা এবং শ্রদ্ধার আসনে তিনি মাস্টারমশাই।
জন্ম ৬ই মার্চ ১৯২৯। বাংলাদেশের চাঁদপুরে বাবা, মা, পাঁচ ভাই আর ছোট বোনকে নিয়ে আনন্দের সংসার ছিল ছোট সুধীরের। কিন্তু, সেই সুখ বেশি দিন স্থায়ী হল না। শুরু হল এক নিদারুণ যুদ্ধ। গ্রামের পর গ্রাম পুড়তে লাগল। সপরিবারে পালানো শুরু। স্মৃতি এখনও কষ্ট দেয়। পোড়া গন্ধ এখনও নাকে এসে লাগে। সেই সময় তিনি ঢাকা ইউনিভার্সিটি প্রথম ব্যাচের ছাত্র। শান্তিনিকেতনে তার মামার বাড়ি। সেখানে গিয়ে উঠলেন সুধীরবাবু। ভর্তি হলেন কবিগুরুর শান্তিনিকেতনের আশ্রমে। রবিঠাকুর তখন মংপুতে। সুধীরবাবুর আক্ষেপ, কোনওদিন রবিঠাকুরকে দেখেননি তিনি। এর পর বহু বছর শান্তিনিকেতনে কাটান সুধীর বাবু। প্রথাগত ভাবে কোনও দিন তিনি সঙ্গীত শেখেননি। কিন্তু, শান্তিনিকেতনের পরিবেশে সঙ্গীত তাঁর রক্তে যেন মিশে যায়। কলকাতায় নিজেদের রিজেন্ট পার্কের বাড়িতে ফিরে আসেন। এক গানের দলের সঙ্গে দিল্লি আসা এবং তার পর ইতিহাস। প্রায় ৫৫ বছর দিল্লিতে।
ছাত্রছাত্রী বদলে যায়। কখনও জয়তী ঘোষ, আভেরী, কখনও মৌলী, রঞ্জিনী। এক মুখ হাসি নিয়ে মাস্টারমশাই শিখিয়ে চলেছেন রবীন্দ্রসঙ্গীত। নিজের কোনও স্কুল নেই। চিত্তরঞ্জন পার্ক বঙ্গীয় সমাজে বিনা পয়সায় শেখান তিনি। বর্তমানে ১৫/১৬ জন ছাত্রছাত্রী। তাঁর বহু সিডি ও বই রয়েছে। তবে, বিশেষ কোনও পুরস্কার তিনি পাননি। তাতে তাঁর কোনও আক্ষেপ নেই। বললেন, “আমি এ সবের যোগ্য নই। আমার পাওনা শুধু ভালবাসা। সেটা আমি অনেক পেয়েছি।’’
নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর আবেদন, রবীন্দ্রসঙ্গীতকে ভালবাসতে হবে। রবীন্দ্র প্রেমে মেতে উঠতে হবে। দিল্লির যে সব বাচ্চা বাংলা ভাষা ঠিক করে পড়তে পারে না তারাও রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখছে। ভালবাসছে। যদিও রবীন্দ্রসঙ্গীতকে আধুনিক ভাবে উপস্থাপন করতে তাঁর ঘোর আপত্তি। তিনি মনে করেন, রবীন্দ্রনাথের স্বরলিপি অনুসরণ করা যুক্তি সম্মত। তাঁর এই মতাদর্শ ঠিক, না ভুল, তা বিচার করবে ভবিষ্যৎ। কিন্তু, রবীন্দ্রসঙ্গীতের এই সাধক যখন তাঁর শেষ ইচ্ছার কথা জানালেন তখন তাঁর বলায় এক বিষণ্ণতার সুর বেজে উঠলো। —“চেষ্টা করছি কলকাতায় ফিরে যাওয়ার। শেষ জীবনটা ওখানেই কাটাব।”