ইরাকে অপহৃত ভারতীয়দের উদ্ধারে ‘সদর, খিড়কি, এমনকী গুপ্ত দরজা’তেও কড়া নাড়ছে নরেন্দ্র মোদী সরকার। আজ এ কথা জানিয়েছেন বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র সৈয়দ আকবরুদ্দিন। অপহৃতদের মধ্যে এক জন আজ পালিয়ে আসতে পেরেছেন। আইএসআইএস জঙ্গিদের কবলে এখন রয়েছেন ৩৯ জন। পশ্চিমবঙ্গের নদিয়ার বাসিন্দা খোকন শিকদার কী অবস্থায় রয়েছেন তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
ইরাকে নুরি অল-মালিকি সরকারের সঙ্গে লড়াইয়ের সময়ে মসুল শহর দখল করে নেয় আইএসআইএস। তার পরেই ওই এলাকা থেকে ৪০ জন ভারতীয়কে অপহরণ করা হয়। নানা মিত্র রাষ্ট্রের সাহায্যে তাঁদের উদ্ধার করার মরিয়া চেষ্টা করছে নয়াদিল্লি। অপহৃতদের মধ্যে এক জন পালিয়ে আসতে পেরেছেন। তিনি বাগদাদের ভারতীয় দূতাবাসে পৌঁছে গিয়েছেন। তবে তাঁর পরিচয় এখনও জানা যায়নি।
নদিয়ার বাসিন্দা খোকনবাবুর স্ত্রী নমিতাদেবী জানিয়েছেন, রবিবার তাঁর স্বামীর সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল। তখনই তিনি বলেন, “অশান্তি ক্রমশই বাড়ছে। যারা আমাদের ধরে রেখেছে তারা আমাদের কোম্পানির সঙ্গে কথা বলতে চাইছে। জানি না কী হবে।” এতেই খোকনবাবুর জঙ্গিদের কব্জাতেও থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আজ স্বামীদের ফিরিয়ে আনার আর্জি নিয়ে নদিয়ার জেলাশাসক পি বি সালিমের সঙ্গে দেখা করেন নমিতাদেবী ও ইরাকে আটকে পড়া নদিয়ার আর এক বাসিন্দা সমর টিকাদারের স্ত্রী দীপালি। তাঁদের সব রকম সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন জেলাশাসক।
নদিয়ারই আর এক বাসিন্দা ক্ষিতীশ বিশ্বাসের পরিবারের সদস্যেরা জানিয়েছেন, আজ রাতে ফোনে ক্ষিতীশবাবুর সঙ্গে কথা বলতে পেরেছেন তাঁরা। ক্ষিতীশবাবু জানিয়েছেন, তিনি সুরক্ষিত। দ্রুত দেশে ফেরার চেষ্টা করছেন। বিহারের গোপালগঞ্জের কয়েক জন শ্রমিক ইরাকে রয়েছেন বলে জানতে পেরেছে বিহার প্রশাসন। তারা এই বিষয়ে কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। অপহৃতদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দারা আছেন কি না জানতে চাওয়া হলে বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র বলেন, “রাজ্যওয়াড়ি তালিকা আমরা এখনও পাইনি।”
আজ সকাল থেকেই যুদ্ধকালীন তৎপরতা দেখা দেয় সাউথ ব্লকে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ডাকা জরুরি বৈঠকে যোগ দেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহ, বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল, ইনটেলিজেন্স ব্যুরো, গুপ্তচর সংস্থা র, বিদেশ মন্ত্রকের উচ্চপদস্থ অফিসাররা। বিভিন্ন সূত্রে থেকে যে খবর আসছে সেগুলির ভিত্তিতে সম্ভাব্য কৌশল তৈরি হয়। এর পর বিদেশমন্ত্রী তাঁর অফিসারদের নিয়ে আরও একটি বৈঠক করেন। হটলাইনে ঘনঘন ফোন যেতে থাকে সংশ্লিষ্ট কিছু দেশের ভারতীয় দূতাবাসে।
সর্বোচ্চ পর্যায়ের আলোচনার পর বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্তও আজ নেওয়া হয়েছে। বিকেলে সেই সিদ্ধান্তগুলি ব্যাখ্যা করেন আকবরুদ্দিন। তিনি জানিয়েছেন, ইরাক থেকে দেশে ফিরতে ইচ্ছুক কোনও ভারতীয় নাগরিকের কাছে যদি ফেরার টিকিটের অর্থ না থাকে তা হলে তাঁকে সে ব্যাপারে সাহায্য করা হবে। ইরাকে ‘ইন্ডিয়ান কমিউনিটি ওয়েলফেয়ার অ্যাসিস্ট্যান্স ফান্ড’ থেকে ওই অর্থ দেওয়া হবে। দ্বিতীয়ত, ইরাকের সীমান্তবর্তী দেশগুলির ভারতীয় দূতাবাসগুলিকে সংশ্লিষ্ট সরকারকে গোটা বিষয়টি জানিয়ে রাখতে বলা হয়েছে। তা হলে ইরাক থেকে কোনও ভারতীয় স্থলপথে সীমান্ত পার হতে চাইলে পূর্ণ সাহায্য পাবেন।
ইরাক থেকে ফেরার সময়ে ভিসা এবং অভিবাসন সংক্রান্ত ব্যবস্থা সহজ করার জন্য ইরাককে অনুরোধ করেছে নয়াদিল্লি। এই ব্যাপারে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছে বাগদাদ। ইরাকে যে শহরে বিদেশিরা প্রথম পদার্পণ করেন তাঁদের সেই শহর থেকেই দেশ ছাড়ার নিয়ম রয়েছে। সেই নিয়ম শিথিল করার অনুরোধ জানিয়েছে ভারত। ইরাক-সহ কয়েকটি দেশে যেতে স্বল্পশিক্ষিত ভারতীয় শ্রমিকদের বিশেষ অনুমতি লাগে। এক মাস সেই অনুমতি দেওয়া বন্ধ রাখবে বিদেশ মন্ত্রক।
মন্ত্রক জানাচ্ছে, মোট ১২০ জন ভারতীয় নাগরিক এখনও আটকে রয়েছেন লড়াইয়ের এলাকায়। যাঁদের মধ্যে ৩৯ জন বন্দি রয়েছেন জঙ্গিদের হাতে। এখনও পর্যন্ত ১৬ জন নিরাপদে দেশে ফিরেছেন। চেষ্টা চলছে বাকিদেরও ফেরত আনার।
আকবরুদ্দিনের কথায়, “লড়াইয়ের এলাকা থেকে বাগদাদে আসার স্থলপথ অত্যন্ত খারাপ এবং বিপজ্জনক। কাজটি নিঃসন্দেহে কঠিন।” কূটনৈতিক সূত্রের খবর, তুরস্ক সরকারের সঙ্গে কথা বলছে ভারত। তুরস্কের কাছে প্রয়োজনে সামরিক বিমান পাঠানোর অনুমতি চাওয়া হয়েছে। সে ক্ষেত্রে ভারতীয় কর্মীদের তুর্কি সীমান্তে নিয়ে আসা গেলে সামরিক বিমান তাঁদের উদ্ধার করতে পারবে। বিদেশ মন্ত্রক সূত্রে জানা গিয়েছে, আইএসআইএস জঙ্গি নেতাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলার ক্ষেত্রে কিছুটা ফল পাওয়া গিয়েছে। আকবরুদ্দিন জানিয়েছেন, “কালকের তুলনায় আজ পরিস্থিতি কিছুটা ভাল।”
পশ্চিম এশিয়ায় মুসলিম মৌলবাদে সৌদি আরবের মদত দেওয়ার বিষয়ে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার কাছে রিপোর্ট রয়েছে। এখন আইএসআইএসের সঙ্গে দর কষাকষি করতে তাদেরই সাহায্য নিচ্ছে সাউথ ব্লক। আমেরিকা, ইজরায়েল, কাতারের গুপ্তচর সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে গুপ্তচর সংস্থা র। তবে ঠিক কীসের বিনিময়ে আইএসআইএস ভারতীয়দের মুক্তি দিতে পারে তা এখনও স্পষ্ট নয়।