দিল্লির একটি খ্যাতনামা বাঙালি রেস্তোরাঁ থেকে আনা লুচি-আলুর দম, চিকেন রোল, ফিশ ফ্রাই, রসগোল্লা ছিল গত কালের মেনুতে! বঙ্গ পদের সুবাসে তখন ম ম করছে মূলত উত্তর ভারতীয়দের ভিড়ে ভিড়াক্কার সবুজ লন।
স্থান: ১৮১ সাউথ অ্যাভিনিউ। তৃণমূলের দিল্লি ক্যাম্প অফিস তথা মুকুল রায়ের বাড়ি। সময়: গত কাল বেলা ১১টা। উপলক্ষ্য: দিল্লি এবং উত্তরপ্রদেশে ১৮ জন তৃণমূল প্রার্থীর নাম ঘোষণা।
ঘোষণা হওয়া মাত্রই দ্রুত পাতলা হতে শুরু করল ভিড়। ঘড়ির কাঁটা ১টা ছুঁতে না ছুঁতেই জলযোগের মেজাজ বদলে গেল সকাল থেকে অপেক্ষারতদের বিক্ষোভ, দোষারোপ এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে স্থানত্যাগে।
গত কয়েক দিন ধরে সালঙ্কারা হয়ে তৃণমূল অফিসের লনে বসেছিলেন রুবি যাদব! এঁর যোগ্যতা, দিল্লির কোনও একটি সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় রানার আপ! কোথা থেকে তিনি টিকিটের নিশ্চয়তা পেয়েছিলেন, জানা যায়নি। কিন্তু প্রার্থী তালিকায় নিজের নাম না দেখে যে ভাবে গজগজ করতে করতে বেরিয়ে গেলেন, তা চোখে পড়েছে উপস্থিত সকলেরই। যাওয়ার আগে সাংবাদিকদেরই প্রার্থী ভেবে রুবি বলে গেলেন, “বকওয়াস পার্টি। আপনাদেরও কিস্যু দেবে না, উল্টে নিংড়ে নেবে!”
এই ছিল গত কাল। আজ দিল্লির বাকি আসনগুলিতে প্রার্থী ঘোষণা হয়ে যাওয়ার পরে আরও যেন ফাঁকা হয়ে গেল তৃণমূলের ক্যাম্প অফিস। আজকের মেজাজটাও মোটামুটি একই। আরও কিছু ব্যর্থ টিকিটপ্রত্যাশীর অসন্তুষ্ট মুখ। তাঁদের সেই গজগজ করা। গত কাল পশ্চিম দিল্লির জনৈক গুরমিত সিংহ তৃণমূলের স্থানীয় নেতৃত্বের কাছে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, এখানে ভোট শেষ না হওয়া পর্যন্ত লঙ্গরখানা চালু করে দেওয়ার! সকালে ব্রেড পকৌড়া দিয়ে শুরু হবে, দুপুরে থাকবে খিচুড়ি-লাবড়া। খাবেন ভোটকর্মীরা। কংগ্রেস, বিজেপি এমনকী সদ্য গজানো আপ-ও ভোটের মুখে বিভিন্ন ক্যাম্প অফিসে এ হেন লঙ্গরখানার আয়োজন করে থাকে। সেই প্রস্তাব নিয়ে এক প্রস্ত চিন্তাভাবনা হয়েওছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তৃণমূল প্রার্থী বিশ্বজিতের প্রচার-ম্যানেজার তথা মমতা ঘনিষ্ঠ রতন মুখোপাধ্যায় বলে দিয়েছেন, এই ধরনের আয়োজনের খরচ সামাল দেওয়া অসম্ভব। এমনিতেই শীর্ষ নেতৃত্ব প্রার্থীদের সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে যার নিজের দায়িত্বে ভোটে লড়ুন। কংগ্রেস বা বিজেপির মতো ‘ধনী’ পার্টি তৃণমূল নয়। টাকা দেওয়া সম্ভব নয়। ফলে সব মিলিয়ে অঙ্কুরেই বিনাশ হয়ে গিয়েছে লঙ্গরখানার ভাবনা!
এমনই অম্ল-মধুর কাণ্ডকারখানায় ভরে রয়েছে তৃণমূলের জাতীয় অভিযান। আগামিকাল মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিন। কথা ছিল, বিশ্বজিৎ আজই মনোনয়ন পেশ করবেন। কিন্তু আজ সারা দিনেও মুম্বই থেকে তাঁর কাগজপত্র এসে পৌঁছয়নি। শেষে ক্যাম্প অফিস থেকে জানা গেল, আগামিকাল সব তৈরি হয়ে যাবে।
কবে বিশ্বজিৎ প্রচার শুরু করবেন, কোথায় কোথায় যাবেন কিছুই স্পষ্ট নয়। তবে কী কী গান তিনি প্রচারে গাইবেন তা মোটামুটি ভেবে ফেলেছেন প্রবীণ নায়ক।
আরও একটি সমস্যায় পড়েছে দিল্লি তৃণমূল। প্রথমে ঠিক হয়েছিল, প্রত্যেক বুথে ১৫ জনের কোর-গ্রুপ থাকবে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, বুথ-প্রতি ১৫ জন তো দূরস্থান, নির্বাচনী-এজেন্টই এখন বাড়ন্ত। কেউ কেউ অবশ্য এই বিপত্তির জন্য অণ্ণা হজারের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তালমিল ভেস্তে যাওয়াকে দায়ী করলেন। এক লোকাভাব, দুই (নেতাদের কথায়) অর্থাভাব। তৃণমূলের জাতীয় অভিযান যে মোটেই মসৃণ পথে এগোচ্ছে না, তা চোখেই দেখা যাচ্ছে।
এর মধ্যেও বুক ঠুকে ঘুরে বেড়াচ্ছেন পশ্চিম দিল্লির তৃণমূল প্রার্থী বংশীধর মিশ্র। এই ভদ্রলোকের দাবি, তাঁর জন্যই নাকি পশ্চিম দিল্লিতে প্রার্থী দিতে ভয় পাচ্ছে কংগ্রেস! বিহারের মধুবনীর বংশীধর জানাচ্ছেন, “পশ্চিম দিল্লিতে বাঙালি-বিহারি মিলিয়ে ৫৪ শতাংশ মানুষ। এই ভোটটা এ বার আমি পাব।” আজীবন সরকারি চাকরি করে এসেছেন, এখন সমাজসেবা করেন। নিজের এবং পরিবারের শুভানুধ্যায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা তুলেই ভোটে লড়বেন ঠিক করেছেন। বললেন, “দিদির দুর্নীতি-বিরোধী জীবনাদর্শই আমার পাথেয়।”
দিল্লি-হরিয়ানা-উত্তরপ্রদেশের ঊষরভূমির প্রতিকূল পথে এই ‘পাথেয়’ কতটা কাজে দেয়, সেটাই প্রশ্ন।