পনেরো বছর আগের সেই লাহৌর বাসযাত্রার রোম্যান্স ফিরিয়ে আনা যেতেই পারে। কিন্তু সে জন্য পাকিস্তানের ভূখণ্ডকে ব্যবহার করে যে ভারত-বিরোধী সন্ত্রাস পাচার চলে, তা বন্ধ করতে হবে বলে আজ সাফ জানিয়ে দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। প্রধানমন্ত্রিত্বের প্রথম দিনেই পাক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সঙ্গে বৈঠকে জঙ্গি দমন নিয়ে ইসলামাবাদের উদ্দেশে কড়া বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি মোদী জানিয়ে দিলেন, শান্তির পথ প্রশস্ত করতে মুম্বই হামলার জঙ্গিদের দ্রুত শাস্তি দিক পাকিস্তান।
নওয়াজের সঙ্গে এই বৈঠকের কিছু আগেই আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইয়ের সঙ্গে আলোচনায় বসেছিলেন মোদী। কূটনৈতিক সূত্রের বক্তব্য, সেখানেই পাক-সন্ত্রাস সংক্রান্ত হাতেগরম তথ্য মোদীর হাতে তুলে দেন কারজাই। যে তথ্য নওয়াজের সঙ্গে বৈঠকে কৌশলে কাজে লাগান মোদী। কারজাই আজ মোদীকে জানিয়েছেন, গত সপ্তাহে হেরাটে ভারতীয় দূতাবাসে হামলার ঘটনায় পাক জঙ্গি যোগের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। ভবিষ্যতে ফের এমন ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করেছেন কারজাই। সূত্রের খবর, মোদী-নওয়াজ বৈঠকে সন্ত্রাসের বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট উদ্বেগ প্রকাশ করেছে নয়াদিল্লি। অবিলম্বে নাশকতা বন্ধ করার জন্য ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে পাক নেতৃত্বকে।
সীমান্তে পাক-হিংসার ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত দু’বছর ধরে থমকে ছিল দ্বিপাক্ষিক সফর। মোদীর নজিরবিহীন উদ্যোগে সাড়া দিয়ে নওয়াজের নয়াদিল্লি সফরের ফলে আজ এক দিকে আলোচনার পথ খুলে গেল। সিদ্ধান্ত হল, অদূর ভবিষ্যতে দু’দেশের বিদেশসচিবরা পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলবেন। নওয়াজ দিল্লি ছাড়ার আগে বিবৃতি দিয়ে জানালেন, পাকিস্তানে মুশারফ ক্ষমতায় আসার পর যা ছিঁড়ে গিয়েছিল, ১৯৯৯ সালের লাহোর-ঘোষণাপত্রের সেই সুতোকে আবার কুড়িয়ে নিয়েই ফের এগোতে চাইছেন তিনি। অন্য দিকে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে আলোচনার এই অপ্রত্যাশিত মঞ্চ তৈরি করে পাক-সন্ত্রাস সম্পর্কে কড়া অবস্থান নিলেন মোদী। আজ হায়দরাবাদ হাউসে দুই নেতার পঞ্চান্ন মিনিট বৈঠকের (সঙ্গে প্রায় টানা ৩০ সেকেন্ড করমর্দন!) পরে বিদেশসচিব সুজাতা সিংহ সাংবাদিক বৈঠক করেন। তার ঠিক পরেই নিজের হোটেলের লবিতে একটি লিখিত বিবৃতি সাংবাদিকদের সামনে পড়ে শোনান নওয়াজ। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে ভারতীয় বিদেশসচিবের বক্তব্যে সন্ত্রাসবাদ নিয়ে ঝাঁঝ থাকলেও নওয়াজ কিন্তু আজ মূলত শান্তির পায়রাই উড়িয়েছেন। কিন্তু এ বার দেশে ফিরে তিনি ভারত সফরকে কী ভাবে ব্যাখ্যা করেন, সে দিকে নজর কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের।
আফগান প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই গত কাল ভারতে এসেই জানিয়েছিলেন, হেরাট-কাণ্ডে সরাসরি যুক্ত লস্কর এবং পাক সমর্থিত কিছু জঙ্গিগোষ্ঠী। আজ মোদীর সঙ্গে বৈঠকেও তিনি সে কথাই জানিয়েছেন বলে সূত্রের খবর। কারজাইয়ের কথায়, “পশ্চিমের গোয়েন্দাসূত্র থেকে আমরা যা তথ্য পেয়েছি, তাতে দেখা যাচ্ছে যে, হেরাট-কাণ্ডের পিছনে লস্কর-সহ কিছু পাক জঙ্গি সংগঠনের হাত রয়েছে।” তাঁর বক্তব্য, বেশ বড় আকারের নাশকতার পরিকল্পনা ছিল জঙ্গিদের। কিন্তু সময় মতো মোকাবিলা করা সম্ভব হয়েছিল বলে কিছু ঘটেনি। কাবুলের আশঙ্কা, কিছু দিনের মধ্যেই এই ধরনের ঘটনা ফের ঘটতে পারে।
স্বাভাবিক ভাবেই সন্ত্রাসের এই আতঙ্ক ছায়া ফেলেছে মোদী-নওয়াজ আলোচনাতেও। দাউদ ইব্রাহিমকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া নিয়ে নওয়াজের সঙ্গে কোনও আলোচনা হয়েছে কিনা, এই প্রশ্নের জবাবে বিদেশসচিব আজ তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে বলেছেন, “সন্ত্রাসের সমস্ত দিক নিয়েই কথা হয়েছে। কিন্তু বৈঠকের আলোচ্যসূচির গোপনীয়তা রক্ষার্থে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সবটা ভাগ করে নেওয়া যাবে না।” অর্থাৎ, দাউদ প্রসঙ্গটি যে ওঠেনি, এমন কথা কিন্তু বলছেন না ভারতীয় কর্তারা। একই সঙ্গে সুজাতা সিংহ বলেন, “নওয়াজ শরিফকে জানানো হয়েছে যে পাকিস্তানের ভূখণ্ডকে ভারত-বিরোধী সন্ত্রাসে ব্যবহার করতে না-দেওয়া প্রসঙ্গে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ইসলামাবাদ, তা অবশ্যই পালন করুক তারা।” এখানেই না থেমে মুম্বই-হামলার জন্য অভিযুক্তদের দ্রুত শাস্তির দাবিও জানিয়েছেন মোদী। সুজাতার কথায়, “এটাও আশা করছি যে, মুম্বইয়ে জঙ্গি হামলায় যারা অভিযুক্ত, তাদের দ্রুত শাস্তি দেওয়া হবে।”
ঘটনা হল, গত কয়েক বছর ধরে একই দাবি করে এসেছিল মনমোহন সিংহের সরকারও। কিন্তু পাকিস্তানের শীর্ষ নেতৃত্বকে এ ভাবে চাপ দেওয়া হয়নি। বন্ধ হয়ে গিয়েছে সামগ্রিক আলোচনাও। সেটি যে আবার শীঘ্রই শুরু হবে, এমন কোনও সিদ্ধান্তে অবশ্য আজ পৌঁছতে চাননি মোদী। রাজনৈতিক সূত্রের বক্তব্য, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এলেও কংগ্রেসের মতোই ঘরোয়া রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার কথা মাথায় রাখতে হচ্ছে বিজেপি নেতৃত্বকেও। তাই সামগ্রিক আলোচনা শুরু করার মতো প্রতিশ্রুতি দেওয়া এখনই সম্ভব নয় মোদীর পক্ষে। তবে ভবিষ্যতে বিদেশসচিবের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখা হবে বলেই প্রাথমিক ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুই দেশ।
ভারত-পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক শীর্ষ বৈঠকে যে ধরনের নাটক, উত্তেজনা, বিবৃতি-বদল এবং অপ্রত্যাশিত চিত্রনাট্য দেখতে পাওয়া যায় আজ অবশ্য তেমন কিছুই দেখা যায়নি। তবে দুপুর একটার সময় সংবাদমাধ্যমের সামনে আসার কথা থাকলেও নওয়াজ প্রায় তিন ঘণ্টা পরে (মাঝে তিনি অন্য বৈঠকগুলি করেছেন) সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছেন। সূত্রের খবর, ভারতীয় বিদেশসচিব কী বলেন, তা দেখে নিয়েই বিবৃতি দিতে চেয়েছেন নওয়াজ। তবে পাক প্রধানমন্ত্রীর আজকের বক্তব্যে, কাশ্মীরের কোনও উল্লেখ ছিল না। ভারতীয় নীতি সম্পর্কে কোনও উষ্মাও সে ভাবে প্রকাশিত হয়নি। বলেছেন, “ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমি এ কথাই বলেছি যে, সংঘর্ষের বদলে সহযোগিতার পথে হাঁটতে হবে। পারস্পরিক দোষারোপে ব্যস্ত থাকলে উল্টো ফল হবে। আমার সরকার তাই দু’দেশের মধ্যে বকেয়া সমস্ত বিষয়গুলি সহযোগিতার মাধ্যমে সমাধান করতে চায়।”