কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা চালু করার আগে-পরে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কী ভূমিকা নিয়েছিলেন, সেই সংক্রান্ত একটি বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আগামী ১২ অগস্ট কলকাতা আসছেন বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ। দলীয় সূত্র বলছে, সেই অনুষ্ঠানে ৬২ বছর ধরে কাশ্মীরে এই ধারা বলবৎ রাখার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলতে পারেন তিনি। এবং সেই সূত্রেই সুকৌশলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু তোষণের অভিযোগে তুলে আক্রমণ শানাতে পারেন বিজেপি সভাপতি।
বিজেপির রাজনৈতিক লাইনের তিনটি প্রধান বিন্দু হল রামমন্দির নির্মাণ, অভিন্ন দেওয়ানি বিধির প্রচলন এবং কাশ্মীরে ৩৭০ ধারার বিলোপ। কিন্তু উন্নয়নের স্লোগান তুলে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসার পরে এই সব বিষয়গুলি নিয়ে বিশেষ মাতামাতি করার পক্ষপাতী নন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তাঁর মতে, উন্নয়নই বিজেপিকে গোটা দেশ জুড়ে শক্ত ভিতের উপরে দাঁড় করাতে পারে। সঙ্ঘ নেতৃত্বকে মোটের উপর তা বোঝাতে সক্ষমও হয়েছেন তিনি। তবে ঘটনা হল, নীতিগত ভিত্তির মূল স্তম্ভকে পুরোপুরি ভুলে থাকা বিজেপি এবং সঙ্ঘ কারও পক্ষেই সম্ভব নয়। তাই মাঝে মধ্যেই বিষয়গুলি নিয়ে নাড়াচাড়া হয়। যেমন ৩৭০ ধারা নিয়ে কলকাতায় নতুন করে আলোচনা শুরুর তোড়জো়ড় চলছে।
১২ তারিখ যে বইটি প্রকাশিত হবে, তার নাম ‘প্লেজ ফর অ্যান ইন্টিগ্রেটেড ইন্ডিয়া’। ৩৭০ ধারা প্রসঙ্গে ১৯৫১ থেকে ১৯৫৩— এই সময়কালে শ্যামাপ্রসাদ কী ভূমিকা নিয়েছিলেন, তার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে বইটিতে। ওই ধারার প্রয়োগ নিয়ে শ্যামাপ্রসাদের চিঠি, বক্তৃতা, লেখালেখি-সহ নানাবিধ গবেষণালব্ধ তথ্য তুলে ধরেছেন সম্পাদক দেবেশ খান্ডেলওয়াল। বইটির মুখবন্ধ লিখেছেন বিজেপি সভাপতি নিজেই। সেই বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে বিজেপি সভাপতির সঙ্গে সায়েন্স সিটি প্রেক্ষাগৃহে উপস্থিত থাকবেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের সাধারণ সম্পাদক সুরেশ (ভাইয়াজি) জোশী এবং জম্মু-কাশ্মীরের উপ-মুখ্যমন্ত্রী নির্মল সিংহ।
বিজেপি সূত্রের খবর, ৩৭০ ধারার বিলোপ নিয়ে এখনই কোনও আন্দোলনে যেতে চাইছে না সঙ্ঘ। কিন্তু দেশ জুড়ে, প্রয়োজনে সংসদেও আলোচনা চাইছে তারা। জওহরলাল নেহরু কী ভাবে এই ধারা প্রয়োগের মাধ্যমে কাশ্মীরের সঙ্গে দেশের অন্য প্রান্তের ‘বিচ্ছেদ’ তৈরি করেছিলেন, তা নিয়ে সঙ্ঘ ঘনিষ্ঠ বেশ কিছু থিঙ্ক ট্যাঙ্ক কাজ শুরু করেছে। এই বই প্রকাশের পিছনেও ‘জম্মু-কাশ্মীর স্টাডি় সেন্টার’(জেকেএসএস) নামে একটি থিঙ্ক ট্যাঙ্ক রয়েছে।
জেকেএসএস-এর কর্ণধার অরুণ কুমার কাশ্মীর থেকে টেলিফোনে বলেন, ‘‘১৯৫২ সালে শেখ আবদুল্লার সঙ্গে জওহরলাল নেহরু দিল্লি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন। সেই চুক্তিতে শেখ আবদুল্লা যা যা দাবি (কাশ্মীরের জন্য আলাদা সংবিধান, আদালত, পতাকা, আইন ইত্যাদি) করেছিলেন, সবই মেনে নিয়েছিলেন নেহরু। এই চুক্তি সাংবিধানিক ছিল না। কিন্তু সেই চুক্তির যাবতীয় সুবিধা দিতে নেহরু ৩৭০ ধারা জারি করেন।’’ অরুণ কুমারের দাবি, সংবিধান প্রণেতারা যে উদ্দেশ্য নিয়ে ৩৭০ ধারা রেখেছিলেন, কাশ্মীরে তার সঠিক প্রয়োগ হয়নি। বরং, অপব্যবহার হয়েছে। যা দেশের সামনে এনে প্রচার করার কাজ নতুন করে শুরু হচ্ছে।
জেকেএসএসের বক্তব্য, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ৩৭০ ধারা নিয়ে যে লড়াই চালিয়েছিলেন, তা আবার শুরু করা উচিত। তাই কলকাতার পরে বিজেপি সভাপতি দিল্লি এবং জম্মুতেও এই বইয়ের আনুষ্ঠানিক প্রকাশ করবেন। বইয়ের মুখবন্ধে অমিত শাহ লিখেছেন, ‘জম্মু-কাশ্মীরের বিষয়টি তাঁর (শ্যামাপ্রসাদের) অন্তরে ছিল। তিনি বুঝেছিলেন পণ্ডিত নেহরু যে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিতে তা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। গণতান্ত্রিক ভারতের পক্ষেও এই ব্যবস্থা মানানসই ছিল না। এখন বোঝা যাচ্ছে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই সঠিক ছিলেন।’ বিজেপি সভাপতির কথায়, ‘৬২ বছর পর এই সমস্যার সমাধানের জন্য একটা পথ বের করতেই হবে।’
কী সেই পথ? অমিত শাহের মতে, ‘‘এ ক্ষেত্রে সাংবিধানিক বিতর্কের একটি বিশেষ মূল্য রয়েছে। দেশের সাংবিধানিক কাঠামোয় এটিই সবচেয়ে পরিপক্ক অঙ্গ।’’
তবে ৩৭০ ধারা নিয়ে আলোচনার আড়ালে বিহার, পশ্চিমবঙ্গ এবং উত্তরপ্রদেশে ভোটপ্রচারের কৌশলও রয়েছে বলে বিজেপি সূত্রের খবর। নেতারা বলছেন, কলকাতাকে বই প্রকাশ অনুষ্ঠানের মঞ্চ হিসেবে বেছে নেওয়ার কারণই হল এই সুযোগে সরকারের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু তোষণের রাজনীতির অভিযোগ তোলা।
নির্মল সিংহকে হাজির করানোরও সেটাই কারণ।
আরএসএসের দক্ষিণবঙ্গের প্রান্ত প্রচারক বিদ্যুৎ মুখোপাধ্যায়ের কথায়, ‘‘এত কাল সংখ্যালঘু তোষণ করে কাশ্মীর শান্ত হওয়ার বদলে আরও উত্তপ্ত হয়েছে। তৃণমূল সরকার এ রাজ্যকেও সেই পরিণতির দিকে এগিয়ে দিচ্ছে।’’