কিছুদিন আগে হুগলি জেলার সিঙ্গুরের এক ছাত্রের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছিল। সেই মৃত্যু নাড়িয়ে দিয়েছিল পড়ুয়া এবং অভিভাবক মহলকে। কারণ মেধাবী ছাত্র হৃষীক কোলের মৃত্যুর কারণ। হৃষীক কলকাতায় নামী কলেজে মানিয়ে নিতে পারছিলেন না। কোনও রকম হেনস্থার শিকার না হয়েও তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন।

খবরের কাগজে চোখ রাখলে প্রায় প্রতিদিনই আত্মহত্যার খবর চোখে পড়ে। আর নিজেকে শেষ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তের পিছনে অনেক সময়েই থাকে অতি তুচ্ছ কোনও কারণ। কখনও শুধু মা-বাবার বকুনি খেয়ে সন্তান চরম সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। আবার কখনও মোবাইল বা কোনও ইলেকট্রনিক গ্যাজেট না পাওয়ার অভিমানে হারিয়ে যায় সবরকমের স্নেহ-ভালবাসার বন্ধন থেকে। 

বিশ্ব জুড়েই আত্মহত্যা একটি বড় সমস্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, প্রতি ৪০ সেকেন্ডে বিশ্বে একজন করে আত্মহত্যা করেন। আর বিশ্বে তরুণদের যে যে কারণে মৃত্যু হয় তার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে আত্মহত্যা। ১৫-২৯ বছরের বয়সিদের মধ্যেই আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। এই বয়সিদের মৃত্যু সবথেকে বেশি হয় পথ দুর্ঘটনায়। আবার ১৫-১৯ বছর বয়সি মেয়েদের মৃত্যুর কারণ হিসেবে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে আত্মহত্যা। এই বয়সি ছেলেদের মৃত্যুর কারণগুলির মধ্যে তৃতীয় স্থানে রয়েছে আত্মহত্যা। ধনী দেশগুলিতে পুরুষের মৃত্যুর হার মহিলাদের মৃত্যুর হারের তিনগুণ। কিন্তু নিম্ন এবং মধ্য আয়ের দেশগুলিতে পুরুষ এবং মহিলাদের মৃত্যুর হার প্রায় সমান সমান। প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় আট লক্ষ মানুষ আত্মহত্যা করেন। আরেকটি হিসেব বলছে, প্রতি আত্মহত্যার তুলনায় ২০ জনের বেশি আত্মহত্যার চেষ্টা করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্টে আত্মহত্যার কারণের সঙ্গে কোন কোন পদ্ধতিতে আত্মহত্যার বেছে নেওয়া হয় তারও একটি পরিসংখ্যান মিলেছে। দেখা গিয়েছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে গলায় দড়ি দিয়েই আত্মহত্যা করা হয়। এ ছাড়াও কীটনাশক খেয়ে আত্মহত্যা করা হয়। আর রয়েছে আগ্নেয়াস্ত্রের সাহায্যে আত্মহত্যা। গত ১০ সেপ্টেম্বর ছিল ‘বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস’ ছিল। পাঁচ বছর আগে প্রথম আত্মহত্যার রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তাতে দেশগুলোকে আত্মহত্যা প্রতিরোধের জন্য নীতি নির্ধারণের কথা বলা হয়েছিল। গত পাঁচ বছরে বেশ কিছু দেশ আত্মহত্যা প্রতিরোধের জন্য নীতি গ্রহণ করেছে। কিন্তু সেই দেশের সংখ্যা এখনও মাত্র ৩৮। এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার শীর্ষ আধিকারিক জানাচ্ছেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহণের উন্নতি হয়েছে। কিন্তু এখনও প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন করে আত্মহত্যা করেন বিশ্বে। আত্মহত্যা শুধু একজনের প্রাণহানি নয়। তা পরিবারের সদস্যদের পক্ষে বিরাট মানসিক আঘাত। সেই সঙ্গে বন্ধু এবং সহকর্মীদেরও দীর্ঘ সময়ে মানসিক আঘাত সহ্য করতে হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সব দেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছে। অনুরোধ করা হয়েছে আত্মহত্যা প্রতিরোধে সহায়তা করার জন্য। কী ভাবে সহায়তা করা যেতে পারে তার রূপরেখাও তৈরি করে দিয়েছে সংস্থা। জানানো হয়েছে জাতীয় স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে এই বিষয়ে নীতি তৈরি করা হোক। সেই সঙ্গে শিক্ষা কর্মসূচিতেও সচেতনতামূলক পদক্ষেপ করা হোক। 

আত্মহত্যা ঠেকাতে দেশগুলিকে আরও কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। সেগুলোর একটি হল কীটনাশক নিয়ন্ত্রণ। কারণ কীটনাশক খেয়ে আত্মহত্যার প্রবণতা প্রবল। বহু কীটনাশকই অত্যন্ত বিষাক্ত। আর যত বেশি বিষাক্ত তত বেশি প্রাণঘাতী। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের দিকে। কারণ ওই সব এলাকায় অনেক সময়েই কোনওরকম প্রতিষেধক পাওয়া যায় না। কাছাকাছি কোনও স্বাস্থ্য পরিষেবাও মেলে না। ফলে মৃত্যুর সম্ভাবনা বাড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সদ্য প্রকাশিত রিপোর্টে জানিয়েছে, কীটনাশক নিয়ন্ত্রিত করলে মৃত্যুর হার কমানো যেতে পারে। রিপোর্টে এ বিষয়ে উদাহরণও দেওয়া হয়েছে। যেমন শ্রীলঙ্কা। এই দেশে বেশ কিছু উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন কীটনাশক নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর ফলে আত্মহত্যা ৭০ শতাংশ কমানো গিয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৯৫ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ৯৩ হাজার জনের জীবন বাঁচানো গিয়েছে কীটনাশকে নিয়ন্ত্রণ আনার ফলে। দ্বিতীয় উদাহরণ দক্ষিণ কোরিয়া। সেখানে আগাছা দমনের জন্য ব্যবহার করা প্যারাকুয়াত নামে একটি ওষুধ খেয়ে প্রাণহানি হত সবথেকে বেশি। ২০১১-১২ সালে এই আগাছানাশক ব্যবহার বন্ধ করা হয়। হাতেনাতে ফল মেলে। দেখা যায়, ২০১১-১৩ সালের মধ্যে আত্মহত্যার সংখ্যা কমেছে। 

তথ্য সবসময়েই কাজে লাগে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, আত্মহত্যা প্রতিরোধে কার্যকরী নীতি এবং কৌশল গ্রহণ করতে হলে এই তথ্য সংগ্রহ করা জরুরি। কিন্তু বাস্তবে তা করা হয় না। ২০১৬ সালের রিপোর্ট প্রকাশের সময়ে সংস্থার সদস্য দেশগুলোর মধ্যে মাত্র ৮০টি দেশ তথ্য দিয়েছিল। কিন্তু সদস্য দেশ রয়েছে ১৮৩টি। নিম্ন এবং মধ্য আয়ের দেশগুলোতে এই ধরনের কোনও তথ্য সংগ্রহ করাই হয়নি। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্পষ্ট জানিয়েছে, আত্মহত্যা প্রতিরোধ করা যায়। এর জন্য ব্যক্তিগত স্তর থেকে শুরু করে জাতীয় স্তর পর্যন্ত উদ্যোগী হতে হবে। পাশে দাঁড়াতে হবে মানসিক ভাবে ভেঙে পড়া মানুষগুলোর। হঠাৎ কোনও বিপর্যয়ে আঘাত পাওয়া মানুষগুলোকে জোগাতে হবে মানসিক শক্তি।