E-Paper

এ বোঝা কী যে বোঝা!

পড়াশোনার বোঝা যতটা বাড়ছে, সেই অনুযায়ী আদৌ কি বিকশিত হচ্ছে পড়ুয়ারা?

নবনীতা দত্ত

শেষ আপডেট: ০৯ মে ২০২৬ ০৮:৪২
ছবি: অমিত দাস।

ছবি: অমিত দাস।


শৈশব বাঁধা পড়েছে সিলেবাস আর রুটিনে। সেই অনুযায়ী বইয়ের ভার বইতে বইতে ক্লান্ত স্কুলপড়ুয়ারা। এর পরিণতি কী? মাঝেমাঝেই অভিভাবকদের মুখে শোনা যায়, ‘পড়াশোনার যা চাপ!’ এ দিকে সেই অনুযায়ী সন্তানের কতটা বিকাশ ঘটছে, সে কতটা যুগোপযোগী তৈরি হচ্ছে, তা আমরা ভেবে দেখছি না। এক দিকে স্কুলব্যাগের বোঝা, যা মেরুদণ্ডের গঠন নষ্ট করে দিচ্ছে, অন্য দিকে একের পর এক পড়া-পরীক্ষা ও সিলেবাসের বোঝা টানতে টানতে নাজেহাল স্কুলপড়ুয়ারা। উত্তর কলকাতার এক বেসরকারি স্কুলের অভিভাবক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলছিলেন, “আমার মেয়ে তিন ফুট আর ব্যাগ টানে প্রায় ৬-৭ কেজির। স্কুলের বই, টিফিন বক্স, জলের বোতল মিলিয়ে এত ওজন। যতটা পারি আমি বয়ে দিই। কিন্তু স্কুলে ওই ব্যাগ নিয়ে তো সিঁড়ি ভাঙতে হয়।” দক্ষিণ কলকাতার এক নামজাদা স্কুলের অভিভাবকের প্রশ্ন, “বাচ্চারা হেভিওয়েট ব্যাগ বইছে মানেই কি হেভিওয়েট রেজ়াল্ট হচ্ছে?” এই অতিরিক্ত ওজন থেকে বাচ্চাদের শরীরের গঠনে কি কোনও সমস্যা হতে পারে? দেখা যাক বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন।

মেরুদণ্ডের গঠনে সমস্যা

জেনারেল মেডিসিনের চিকিৎসক ডা. সুবীর কুমার মণ্ডল বলছিলেন, “বাচ্চার শরীর যখন গঠনগত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেই সময়ে যদি গোড়া থেকেই শরীরের মেরুদণ্ড বেঁকে থাকে, পরে তার গঠনে তো সমস্যা হবেই। বাচ্চাদের যেহেতু হাড়ের গঠন সম্পূর্ণ হয় না, তখনও কার্টিলেজ থাকে, ওদের বোন ডিফরমিটি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এত ভার থেকে ভার্টিব্রার গঠনে চাপ পড়ে।”

অনেক ক্ষেত্রেই মাস্কুলোস্কেলেটাল সমস্যা দেখা দেয়। ডা. মণ্ডলের সঙ্গে সহমত শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. দিব্যেন্দু রায়চৌধুরীও। তিনি বলছেন, “যখনই বাচ্চারা অতিরিক্ত ওজন বহন করছে, তখন তার পেশিগুলোকে বেশি কাজ করতে হচ্ছে, হাড় ও অস্থিসন্ধির উপরে চাপ পড়ছে। তা থেকেই মাস্কুলোস্কেলেটাল সমস্যা দেখা দেয়। মাসলে ক্র্যাম্প হয়, পিঠে ব্যথা হয়। অনেক সময়ে স্কোলিয়োসিস বা কাইফোসিসের মতো সমস্যার আশঙ্কাও থাকে। স্কোলিয়োসিসের ক্ষেত্রে শিরদাঁড়া ‘এস’ অক্ষরের মতো বেঁকে যায়। কাইফোসিসের ক্ষেত্রে শিরদাঁড়া সামনের দিকে বেঁকে যায়, যেটাকে আমরা সোজা কথায় কুঁজো বলি। সার্ভাইকাল স্পাইনে যে জয়েন্টগুলো আছে, ইন্টারভার্টিব্রাল জয়েন্টগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে স্পাইনাল কর্ডে তার প্রভাব পড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে স্পাইনাল কর্ডের নার্ভগুলোয় চাপ পড়ে। এতে বাচ্চার হাত-পা ঝিনঝিন করতে পারে, অবশ হয়ে যায়।”

সমাধান কোন পথে

  • এই ধরনের সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে কিছু বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। ব্যাগের স্ট্র্যাপ যেন সরু না হয়। মোটা, প্যাডেড স্ট্র্যাপ হলে ওজন অনেকটা ছড়িয়ে যায়। ফলে এক জায়গায় বেশি চাপ তৈরি হয় না।
  • মনে রাখতে হবে, বাচ্চা ব্যাগ যেন এক কাঁধে না নেয়, সে ক্ষেত্রে এক দিকের কাঁধে বেশি চাপ পড়ে, যা থেকে বোন ডিফর্মিটি দেখা যায়। তার চেয়ে দু’কাঁধে ব্যাগ নিলে ওজন সমান ভাবে ভাগ হয়ে যায়। তবে খেয়াল রাখতে হবে ব্যাগ দু’কাঁধে নিলেও কোমরের নীচে যেন ঝুলে না আসে, তার মানেই ওজন প্রয়োজনের তুলনায় বেশি।
  • বাচ্চাদের ব্যাগের ওজন তার নিজের শরীরের ওজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়াও খুব জরুরি। এই প্রসঙ্গে বারাসত গভর্নমেন্ট মেডিক্যাল কলেজের অর্থোপেডিক সার্জন অনিন্দ্য বসু বললেন, “নিয়ম অনুযায়ী, একটি বাচ্চার বডি ওয়েটের ১০-১৫ শতাংশ হওয়া উচিত ব্যাগের ওজন। অর্থাৎ বাচ্চাটির ওজন ৩০ কেজি হলে ব্যাগের ওজন হবে ৩-৩.৫ কেজি। এই নিয়মটা মেনে চলা উচিত। দীর্ঘ দিন স্কুলব্যাগ বইলে, বিশেষত যারা বাসে, স্কুটিতে পিঠে ব্যাগ নিয়ে বসছে, ঝাঁকুনিতে তাদের পিঠের উপরে আরও চাপ পড়ে। এতে ক্রমাগত ব্যাক পেন, মাসল পেন দেখা দিতে পারে। স্কুল কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবক উভয় পক্ষকেই সচেতন হতে হবে এ ব্যাপারে।”
  • এখন অনেক স্কুলেই লকারের ব্যবস্থা থাকে। সে ক্ষেত্রে কিছুটা সুবিধে হয়।
  • খাতার বদলে ওয়ার্কশিটের ব্যবহারও শুরু করেছে অনেক স্কুল। এতেও ব্যাগের ওজন কিছুটা কমে।
  • স্কুলের পড়াশোনা যদি ডিজিটাইজ়ড করা যায়, তা হলে উপকৃত হতে পারে বাচ্চারা, মত ডা. দিব্যেন্দু রায়চৌধুরীর। তবে আমাদের দেশে তা করা সময়সাপেক্ষ। তাই বাকি দিকগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে হবে।
  • রোজ কাঁধ ও হাতের ব্যায়াম করা খুব জরুরি। এতে শরীরে রক্ত সঞ্চালন ভাল থাকবে।

তবে শুধু ব্যাগের বোঝা কমালেই কি নিস্তার পাবে শিশুরা। তাদের উপরে ক্রমশ বাড়ছে স্কুলের পড়াশোনার চাপ, নিয়মিত পরীক্ষার উদ্বেগ। তার সঙ্গেও যুঝতে হচ্ছে কচিকাঁচাদের।

সুনির্দিষ্ট পূর্বপরিকল্পিত পড়াশোনা দরকার

এখন অনেক স্কুলেই সারা বছর ধরে পরীক্ষা চলে। তার সঙ্গে একাধিক প্রজেক্টওয়ার্ক। ফলে সব সময়েই পরীক্ষার পড়াশোনার চাপ, না হলে প্রজেক্ট শেষ করার তাড়া। পেরেন্টিং কনসালট্যান্ট পায়েল ঘোষ বললেন, “সারা বছর এই ব্লক টেস্ট বা সারপ্রাইজ় টেস্টের জন্য বাচ্চারা সবসময় সিলেবাস নিয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত থাকে। অনেক স্কুলেই এই ধরনের পরীক্ষার মার্কস যোগ হয় ফাইনালে। ফলে সব সময়ে তটস্থ থাকে অভিভাবক ও পড়ুয়ারা। এর চেয়ে সেশন শুরুর সময়ে যদি পরীক্ষার একটা নির্দিষ্ট রুটিন দিয়ে দেওয়া হয়, সেই অনুযায়ী বাচ্চারা তৈরি থাকতে পারে।” এর পরে রয়েছে প্রজেক্টওয়ার্ক। সেই প্রসঙ্গে পায়েল প্রশ্ন তুললেন, “স্কুলের প্রজেক্টের কাজ বাড়িতে কেন? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিভাবকরা করে দেন বা অনেক সংস্থা আছে, যারা এই ধরনের প্রজেক্টের কাজ করে দেয়। তা হলে বাচ্চারা কি শিখছে?” তার চেয়ে স্কুলে বসেই প্রজেক্টওয়ার্ক করার পরামর্শ দিলেন পায়েল। তাঁর মতে, স্কুলেই যদি একটা ক্লাস রাখা হয় প্রজেক্টওয়ার্কের জন্য, তা হলে সেখানে বাচ্চারা নিজেদের চিন্তাভাবনা, সৃজনশীলতা কাজে লাগিয়ে প্রজেক্টটা করতে পারবে, শিখবে। দরকারে গ্রুপ প্রজেক্ট করানো যায়। ৪-৫টি বাচ্চা একসঙ্গে করলে টিমওয়ার্কও শিখবে।

আর একটা প্রশ্ন তুললেন ডা. সুবীর মণ্ডল, এখনকার বাচ্চারা পড়ছে ঠিকই, কিন্তু আদৌ কি তা মনে রাখছে? নতুন ক্লাসে উঠেই পুরনো ক্লাসের পড়া তারা ভুলে যাচ্ছে। পায়েলও এ বিষয়ে সহমত, “আগে অর্ধবার্ষিক আর বার্ষিক পরীক্ষা হত। ফলে অনেকটা সিলেবাসের পড়া একসঙ্গে মনে রাখতে হত। সেটা আয়ত্তও করেছি সময় নিয়ে। এখন দুটো করে চ্যাপ্টার পড়ছে, পরীক্ষা হয়ে যাচ্ছে, জাম্প টু নেক্সট। এ ভাবে তো ওরা পড়াটা আয়ত্তই করতে পারছে না। ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ হলে তো কখনওই পড়া মনে থাকবে না।”

শিশুমনের খেয়াল রাখবে কে?

পড়ার মাঝে বাচ্চাদের বিরতিও দরকার। খেলোধুলো, সৃজনশীল কাজ মাথাকে বিশ্রাম দেয়। সেই বিশ্রাম এখন প্রায় পায়ই না পড়ুয়ারা। পড়ার মাঝে ব্রেক বলতেও স্ক্রিনটাইম, সেখানেও একগাদা বিষয় জমা হতে থাকে মাথায়। আর একটি জরুরি দিক তুলে ধরলেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রুদ্র আচার্য, “এখন বেশির ভাগ স্কুল সাড়ে সাতটা-আটটায় শুরু হয়ে যায়। ফলে বাচ্চারা ঘুম থেকে ওঠে ৬টায়। তার পর দুপুরে বাড়ি ফিরে একটু খেয়েদেয়ে-বিশ্রাম নিয়েই কোচিং, সেখান থেকে ফিরে স্কুলের হোমওয়ার্ক শেষ করে ঘুমোতে-ঘুমোতে সেই রাত বারোটা। মেমরি রেস্টোর করার জন্য ভাল ঘুম দরকার। সেই ঘুমের সময়টাই তো পায় না। ফলে পরদিন ক্লান্তি নিয়ে সে ক্লাসে যাচ্ছে। স্কুলেই যদি পড়াটা তৈরি হয়ে যায়। বাড়ি ফিরে পড়া তৈরি করার চাপ থাকে না।” আর এখন বেশির ভাগ স্কুলেই পড়াটা শর্ট টার্ম, পরীক্ষানির্ভর। ফলে একটা অধ্যায় আত্মস্থ হচ্ছে কি না, তা বোঝার আগেই পরবর্তী অধ্যায়ে চলে যাচ্ছে। তাই সেটা ভুলতেও সময় লাগছে না। “প্রতি সপ্তাহে বা মাসে ব্লক টেস্ট বা ক্লাস টেস্ট হলে, সে ক্ষেত্রে একটা পারফরম্যান্স প্রেশার তৈরি হয় বাচ্চাদের উপরে। তা থেকে অ্যাংজ়াইটি, নার্ভাসনেস তৈরি হয়। সেই পরীক্ষায় একটু খারাপ ফল করলেই অনেক অভিভাবকই বকুনি দেন, বাকিদের সঙ্গে তুলনা করেন। এতে বাচ্চাটির মনোবল ভেঙে যায়।” পরের পরীক্ষার আগে সেই প্রেশার আরও বাড়তে থাকে। ক্রমাগত এই চক্রব্যূহে পড়ে বাচ্চাটির আত্মবিশ্বাস ক্রমশ ভেঙে যায়। অতিরিক্ত পড়ার বোঝা, মনের খোরাক না পাওয়া, সব সময়ে প্রতিযোগী মনোভাব তৈরি করায়, শিশুটির উপরে যে মানসিক চাপ তৈরি হয়, তা থেকে তার সার্বিক বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হয়।

একটা শিশু একটা ফুলের মতো। উপযুক্ত জলহাওয়া পেলে সে প্রকৃতির নিয়মে এমনিই বেড়ে উঠবে। তাকে রোজ তাড়া দিলেই সে দ্রুত বাড়বে না বা এগিয়ে যাবে না, এটা মনে রাখতে হবে মা-বাবাকে। সন্তানের বিকাশের জন্য উপযুক্ত পারিপার্শ্বিক পরিবেশটুকু শুধু তৈরি করে দিতে হবে।


মডেল: সুস্মেলি দত্ত, রাইমা গুপ্ত, যশোজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়


(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

School students

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy