এক হাত সামনে বাড়িয়ে এগিয়ে আসছেন তিনি। করমর্দনের জন্য। তাঁর ঘাড় ছোঁয়া অ্যাম্বার রঙা চুলে শেষ বিকেলের আলো বিভা তৈরি করছে। দু’ঠোঁটের ফাঁকে ঝিলিক দিচ্ছে মুক্তোর মতো নিখুঁত দু’সারি দাঁত। সে হাসির ছদ্মবেশ ছড়িয়েছে চোখের তারাতেও। মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই তাঁর মন কী বলছে, তবে পোশাক বলে দিচ্ছে অনেকটাই।
তারিখ ১৯৯৪ সালের ২৯ জুন। তার ঠিক দু’দিন পরে ১ জুলাই ৩৩তম জন্মদিন তাঁর। কালো রঙের ওই পোশাক পরে যিনি পড়ন্ত বিকেলের আলোয় লন্ডনের সারপেন্টিন গ্যালারিতে ঢুকছেন তিনি যুবরানি ডায়না। কয়েক ঘণ্টা আগেই দেশের একটি টিভি চ্যানেলে তাঁর স্বামী ব্রিটেনের তৎকালীন যুবরাজ চার্লস (বর্তমান রাজা) খোলাখুলি স্বীকার করেছেন নিজের অবৈধ সম্পর্কের কথা। দেশ জুড়ে যে গুঞ্জন বছর কয়েক ধরই চলছিল, তাতে শিলমোহর পড়েছে। তার পরেও তাঁর নির্ধারিত কর্মসূচি বদলাননি ডায়না। শুধু পোশাক বদলেছেন। আর কী অদ্ভুত! সেই পোশাককেই তাঁর জবাব বুঝে নিল তাঁর দেশ।
কালো পোশাকে ঢাকা না পরা কাঁধ-পিঠ এবং বিপজ্জনক সীমায় থমকে যাওয়া নেকলাইন। হাঁটুর উপরে থেমে যাওয়া হেম। আর পা ঢাকা শিয়ার স্টকিংয়ে। কালো রঙের স্টিলেটোয় নিখুঁত পদক্ষেপে তিনি এগিয়ে আসছেন। তাঁর পোশাকের পিঠ থেকে পালকের মতো ঝুলছে শিফনের ডিটেলিং। আর সেই ছবি থেকেই জনতা বুঝে নিল তিনি পরোয়া করেন না। পরোয়া করেন না লোকে তাঁকে নিয়ে কী ভাবল। পরোয়া করেন না যদি তাঁর ভাবমূর্তির কথা না ভেবে স্বামী অবৈধ সম্পর্কের ঘোষণা করেন। তিনি নীরবে প্রতিশোধ নেবেন নিজের আলোর বিচ্ছুরণে সমালোচকদের চোখ ধাঁধিয়ে দিয়ে।
ডায়নার পোশাকের সেই ভাষা মানুষ এমনই বুঝল যে ব্যক্তিকে ছাপিয়ে বিখ্যাত হয়ে গেল একটি পোশাক। জনগণ তার নাম দিল ‘রিভেঞ্জ ড্রেস’ অর্থাৎ প্রতিশোধের পোশাক।
অথচ ডায়না নিজে খুব বেশি ভেবে পোশাক চয়ন করেননি। যে পোশাক ১৯৯৪ সালের শেষ জুনের সন্ধ্যায় হঠাৎই বিখ্যাত হয়েছিল, তা বছর তিনেক আগে থেকেই পড়ে ছিল তাঁর ওয়ার্ড্রোবে। তখনও সেপারেশন পর্ব শুরু হয়নি চার্লস এবং ডায়ানার। পোশাকটি ১৯৯১ সালে ডায়ানার জন্য বিশেষ ভাবে বানিয়ে দিয়েছিলেন পোশাকশিল্পী ক্রিশ্চিনা স্ট্যাম্বোলিয়ান। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘‘ডায়ানা হঠাৎ এক দিন বললেন, তাঁকে এক বিশেষ ‘অকেশন’-এর জন্য একটি বিশেষ পোশাক বানিয়ে দিতে হবে। সেই পোশাক বানানো হল। অথচ বছরের পর বছর কেটে গেল, ডায়ানা সেটি গায়েই তুললেন না। প্রথমে খুবই খারাপ লেগেছিল। কিন্তু পরে বুঝেছিলাম সঠিক ‘অকেশন’ অর্থাৎ সঠিক সময়ের অপেক্ষা করছিলেন।’’
আরও পড়ুন:
জুনের সেই সন্ধ্যায় ডায়ানার পোশাক চয়নের গল্প বলেছেন তাঁর বাটলার পল বারেলও। পল তাঁর স্মৃতিকথায় জানিয়েছেন, সে দিন সবে আইটিভিতে যুবরাজ চার্লসের তথ্যচিত্রটি দেখেছেন ডায়ানা। তিনি আগেই জানতেন যে, ওই তথ্যচিত্র সে দিন সম্প্রচার হতে চলেছে। বাইরে শান্ত ছিলেন। কিন্তু বোঝা যাচ্ছিল, টিভিতে বলা চার্লসের শব্দগুলো বারবার ধাক্কা খাচ্ছে তাঁর মনের ভিতরে। তার মধ্যেই পোশাক বাছতে বসেছিলেন। পল লিখেছেন, ‘‘অর্ধেক মনোযোগ তখনও তাঁর (ডায়ানার) তথ্যচিত্রে। বাকি অর্ধেক মন ভাবছে, এর পরে যে পোশাকটি পরে বাইরে বেরোবেন, সেটি উপযুক্ত কি না। পোশাকটি সামনে ধরে আমার দিকে তাকিয়ে উনি বললেন, ‘তোমার কি মনে হচ্ছে, এটা একটু বেশি হয়ে গেল?’ তার পরে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। বললেন, ‘তা হলে এটাই সই, পল’।’’
ইউরোপে কালো শোকের রং। সে জন্যই কি ওই দিন ওই পোশাক বেছে নিয়েছিলেন ডায়ানা? কেউ জানে না। তবে, একটি সূত্রে শোনা যায়, সে দিন আদতে তাঁর ভ্যালেন্টিনোর একটি গাউন পরার কথা ছিল। শেষ মুহূর্তে সেই তথ্যটি ফাঁস হয়ে গেলে ডায়ানা পোশাক বদলানোর সিদ্ধান্ত নেন। বেছে নেন সেই পোশাক যা তিন বছর আগে তিনি বানিয়েছিলেন বিশেষ সময়ের জন্য। কারণ যা-ই হোক, শোকও যদি হয়ে থাকে তবে সেই শোককে এক ভাবে উদ্যাপনই করেছিলেন ডায়ানা। আর সেই একটি মুহূর্ত যা ফ্যাশনদুনিয়াকে দিয়েছিল এক বিশেষ ধরনের পোশাক, যা প্রতিবাদের আর প্রতিশোধের ভাষা হতে পারে।