Advertisement
E-Paper

যদি পাব হত বাঙালি, তবে কেমন হত খানাপিনা? সাহেবপাড়ায় কি ফিরছে বাঙালি সরাইখানার মেজাজ

এখন হলে নয় অনেক ‘অপশন’! কিন্তু তখন তো তন্দুরি চিকেন, ড্রাই চিলি চিকেনের ‘জন্ম’ হয়নি। পোট্যাটো ওয়েজেস বা ফ্রেঞ্চ ফ্রাইজ়ের সঙ্গে পরিচয় ঘটেনি বাঙালির, চাইলেই পাওয়া যেত না মুচমুচে ফিশ ফিঙ্গার কিংবা ফিশ ফ্রাই।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০১ জুলাই ২০২৬ ১১:৫২
সাহেবপাড়ায় ‘বাঙালি পাব’?

সাহেবপাড়ায় ‘বাঙালি পাব’? — নিজস্ব চিত্র। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

পাব মানে কি বিদেশি সংস্কৃতি? কেমন হত যদি পাব বাঙালি হত? বিদেশি পানপাত্রকে সঙ্গ দিতে ঠিক কী ধরনের খাবার পরিবেশন করা হত সেখানে?

দিনের শেষে একটু খোলামনে গলা ভেজানো, খাওয়াদাওয়া, আড্ডা, চেনা-অচেনা মানুষের সঙ্গে ভাব বিনিময়ের জায়গা হল পাব। সে সবের সূচনা তো বিদেশে নয়। এ দেশেও এক কালে রমরমিয়ে চলত সরাইখানা। সেখানে ভিন্‌রাজ্যের রাজার দূত থেকে শুরু করে নর্তকী, বণিক, গুপ্তচর, সৈনিক এবং এলাকার সাধারণ মানুষ একসঙ্গে বসে পান-ভোজন করতেন। পরে যখন ইউরোপীয়রা এল, জাহাজে করে কলকাতার বন্দরে এসে পৌঁছালো বিলিতি সুরার বোতল, তখন কলকাতার বহু অভিজাত বংশীয়ের বৈঠকখানা বা বাগানবাড়িতেও বসেছে ‘খানা’ এবং ‘পিনা’-র আসর। পানপাত্র হাতে ধুতি-পাঞ্জাবি পরিহিত সেইসব রসিক বা বিদগ্ধ বাঙালির নিশ্চয়ই ‘চাখনা’র প্রয়োজন হত!

বিলিতি পানীয়ের সঙ্গে সে সময়েও ‘চাট’ হিসাবে বাদামভাজা দেওয়া হত কি?

বিলিতি পানীয়ের সঙ্গে সে সময়েও ‘চাট’ হিসাবে বাদামভাজা দেওয়া হত কি? — নিজস্ব চিত্র।

এখন হলে নয় আলাদা কথা ছিল। হাজার রকমের ‘অপশন’! কিন্তু তখন তো তন্দুরি চিকেন, ড্রাই চিলি চিকেনের ‘জন্ম’ হয়নি। পোট্যাটো ওয়েজেস বা ফ্রেঞ্চ ফ্রাইজ়ের সঙ্গে পরিচয় ঘটেনি বাঙালির, চাইলেই পাওয়া যেত না মুচমুচে ফিশ ফিঙ্গার কিংবা ফিশ ফ্রাই। বিলিতি পানীয়ের সঙ্গে সে সময়েও ‘চাট’ হিসাবে বাদামভাজা দেওয়া হত কি? না কি থাকত অন্য কিছু?

কড়কড়ে মৌরলা মাছ কাঁসার রেকাবিতে সাজিয়ে হাজির।

কড়কড়ে মৌরলা মাছ কাঁসার রেকাবিতে সাজিয়ে হাজির। — নিজস্ব চিত্র।

ধরা যাক সময়টা অষ্টাদশ শতকের শুরুর দিক। পাব-এর মতোই পান ভোজনের জমাটি আসর বসেছে কলকাতার কোনও অভিজাত বংশীয়ের বাড়িতে। সেখানে কড়কড়ে করে ভাজা বাড়ির পুকুরের মৌরলা মাছ কাঁসার রেকাবিতে সাজিয়ে হাজির হলেন খানসামা। অথবা অন্দরমহল থেকে ভেজে পাঠানো হলো বাগান থেকে তুলে আনা কুমড়োর ফুলের মুচমুচে বড়া। হয়তো কর্তার জন্য গৃহিণী মুচমুচে বড়িভাজার সঙ্গে পেঁয়াজকুচি আর আমআদার টুকরো দিয়ে বানিয়ে দিলেন খাঁটি বাঙালি চাট! আসরে কি জৌলুস কম হত তবে? না কি ব্যাপারখানা জমত একটু বেশিই! ঠিক এমনই ভাবনা থেকে কলকাতার সাহেবপাড়ায় তৈরি হয়েছে এক বাঙালি পান-ভোজনের জায়গা।

দিনের শেষে একটু খোলামনে গলা ভেজানো, খাওয়াদাওয়া, আড্ডা, চেনা-অচেনা মানুষের সঙ্গে ভাব বিনিময়ের জায়গা হল পাব

দিনের শেষে একটু খোলামনে গলা ভেজানো, খাওয়াদাওয়া, আড্ডা, চেনা-অচেনা মানুষের সঙ্গে ভাব বিনিময়ের জায়গা হল পাব —নিজস্ব চিত্র।

মাটির রঙের দেওয়ালে কাঠের চৌখুপি কাটা জানলা। সেই জানলা কোমর উচ্চতা থকে উঠেছে প্রায় সিলিংয়ের কাছাকাছি। পুরনো দিনের বাড়িতে এমন এক দিক খোলা বাক্সের মতো গরাদ দেওয়া জানলা দেখা যেত। মেঝে থেকে সামান্য উঁচু তেমন জানলার পৈঠায় কুলোয় করে ধান শুকোতে দিতেন বাড়ির কর্ত্রী। বাড়ির মেয়ের বিয়ের পুরনো টোপর-মুকুট, পোড়ামাটির মনসাচালি, মাটির পিদিমও যত্নে রাখা থাকতো কোথাও কোথাও। ঠিক তেমনই দৃশ্য দেখা যাবে সাহেবপাড়ার ওই বাঙালি খাবারের রেস্তোঁরায় এলে। সেই আবহেই খানাপিনার ব্যবস্থা করেছে তারা।

বেসনে সোনালি করে ভাজা ভেটকি, কাঁকড়া, চিংড়ির ছোট ছোট টুকরো।

বেসনে সোনালি করে ভাজা ভেটকি, কাঁকড়া, চিংড়ির ছোট ছোট টুকরো। —নিজস্ব চিত্র।

সাধারণ গ্যাসবাতির মতো ঢাকনা দেওয়া হলুদ আলোর ল্যাম্প ঝুলছে উঁচু সিলিং থেকে। তার নীচে কাঠের চেয়ার টেবিলে বসার ব্যবস্থা। খবরের কাগজের মতো দেখতে টেবলম্যাট। তার উপরেই কাঁসার বাটিতে একে একে পরিবেশন করা হবে পেঁয়াজ-লঙ্কা ছড়ানো মৌরলামাছ ভাজা। বেসনে সোনালি করে ভাজা ভেটকি, কাঁকড়া, চিংড়ির ছোট ছোট টুকরো, পুরভরা কুমড়ো ফুলের বড়া বা ভাজাবড়ি, পেঁয়াজ আর আমআদার চাখনা।

পোট্যাটো ক্রোকেট।

পোট্যাটো ক্রোকেট। — নিজস্ব চিত্র।

উপনিবেশ আমলের অবিভক্ত বাংলার জমিদারি সংস্কৃতিকে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে মেনু কার্ডে। তাই বড়ি, বড়া, পাঁপড়ের সঙ্গে পাওয়া যাবে পোট্যাটো ক্রোকেটও। পর্তুগিজদের হাত ধরে সেই সময়েই বাঙালি রান্নাঘরে আলুর প্রবেশ। সেদ্ধ আলুকে মশলা, চিজ় দিয়ে মেখে কোনও এদেশীয় রাঁধুনিকে হয়তো ক্রোকেট বানাতে শিখিয়েছিলেন কোনও পর্তুগীজ সাহেবের মেমসাহেব গিন্নিই।

জমিদারি সংস্কৃতিকে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে মেনু কার্ডে।

জমিদারি সংস্কৃতিকে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে মেনু কার্ডে। — নিজস্ব চিত্র।

এমনই ছোট ছোট না বলা গল্পকে ছুঁয়ে দেখার এক চেষ্টা চোখে পড়ে পার্ক স্ট্রিটের ‘ইলিশ: ট্রুলি বং বেঙ্গলি ডাইনিং অ্যান্ড বার’-এ। বদলাতে চাওয়ায় জমানায় যাঁরা ফেলে আসা সংস্কৃতিকে পরখ করে দেখতে চান, তাঁদের সেই চাওয়া মেটাতেও পারে পার্ক স্ট্রিটের ওই ঠিকানা।

Bengali Food Pub Park Street

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy