শীতে উৎসবের মরসুমে ‘লেয়ারিং’ আর রং বাছাইয়ের মধ্যেই সাজের আসল রহস্য
সারা বছর পর ডিসেম্বরের রাতে ও দিনে বাঙালির সাজকাহনে বড়সড় বদল আসে। পাশ্চাত্যের প্রভাবে নানা রকম পোশাক পরতে চান তাঁরা। এটাই তো সময়। কোন রং বেছে নেবেন, কোন কাপড় পরবেন, কী ভাবে পোশাকের কায়দা করবেন? অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকারকে সাজিয়ে তা বোঝালেন পোশাকশিল্পী অভিষেক দত্ত।
আলমারিবন্দি শীতের পোশাক আলো দেখতে শুরু করেছে। বড়দিন থেকে বর্ষপূর্তি, নতুন বছরের শুরু— একটানা নানাবিধ উপলক্ষে একের পর এক পার্টির নিমন্ত্রণ। আপনি পোশাকও কিনবেন, পুরনো পোশাক দিয়ে লেয়ারিংও করবেন। হয়তো রংও স্থির করে ফেলেছেন। কিন্তু নতুন কোনও রাস্তা খোঁজার চেষ্টা করছেন। আনন্দবাজার ডট কম-এর জন্য পোশাকশিল্পী অভিষেক দত্ত নিজের তৈরি নানা জিনিসে সাজালেন অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকারকে। এ বারের শীতে কত রকমের রং সাজে ব্যবহৃত হতে পারে, তারই ঝলক দিতে চাইলেন অভিষেক।
শীত পড়লেই গাঢ় রঙের প্রতিপত্তি বাড়ে। যে দিকেই তাকান, হয় কালো, নয়তো বাদামি বা মেরুন। কিন্তু ফ্যাশনদুনিয়ায় পরীক্ষার শেষ নেই। বিদেশের একাধিক ফ্যাশন উইকে এ বার নিয়ন রং এবং প্রাইমারি রঙের দাপট দেখা গিয়েছে। অর্থাৎ লাল, সবুজ, নীলের কদর বেড়েছে, তা হলে সাদাই বা কেন পিছিয়ে থাকবে? অভিষেক বলছেন, ‘‘বছরের শেষে পার্টির মরসুম। আর সে সময়ে ক্রিসমাসের রঙেই ভরে থাকে শহর থেকে শহরতলি। লাল, গাঢ় নীল-সবুজের (টিল রং) নানা রকম টোন, কালো ও ছাই রঙের আধিক্য এ সময়ে অনেক বেশি।’’ কিন্তু উৎসব মানেই যে রং। আর রঙের খেলা রয়েছে আপনারই হাতে। তাই কালো থেকে সাদা, লাল থেকে সবুজ, সব রকম রংকেই গুরুত্ব দিতে বলছেন শিল্পী।
শীতের দুপুরে বাইরে খাওয়াদাওয়া করতে গেলে বা দুপুরে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে গেলে খানিক হালকা রঙের উপর ভরসা করতে পারেন। ঠিক যেমন ভাবে সাদা আর মভ রঙের পোশাক পরেছিলেন প্রিয়াঙ্কা। ‘উইন্টার ব্রাঞ্চেস’ থিম এখন সাজসজ্জার দুনিয়ায় বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। আর তাই সে কথা মাথায় রেখে প্রিয়াঙ্কা সেজেছেন প্যান্ট স্যুটে।
এমব্রয়ডারি করা লম্বা সাদা জ্যাকেটে কাঁধের কাছে থ্রিডি লেদার ফুল বসানো হয়েছে। তার সঙ্গে মানানসই সুতোর কাজ করা বুটকাট প্যান্ট এবং নীচে একটি লেদার বাস্টিয়ার। একসঙ্গে আরামদায়ক এবং কেতাদুরস্ত। অভিষেক মনে করেন, শীতের মরসুম হল লেয়ারিংয়ের সেরা সময়। রকমারি জ্যাকেটের দেখা পাওয়া যায় এ সময়ে। ট্রাউজ়ার্স থেকে স্কার্ট, শর্টস থেকে ড্রেস— সব কিছুর সঙ্গেই জ্যাকেট পরা যেতে পারে। শল কলার জ্যাকেট, জ্যাকেট ড্রেস এখন ২০২৫-এর ফ্যাশন ট্রেন্ডে রাজত্ব করছে বলে মত পোশাকশিল্পীর।
প্যান্ট স্যুটের রঙের প্যালেটটি এমনই স্নিগ্ধ যে শীতের দুপুরের রোদে চোখেও আরাম দেবে। অফ হোয়াইট এবং ল্যাভেন্ডার রঙের মিশ্রণ দিনের বেলার অনুষ্ঠানের জন্য উপযুক্ত। এই জ্যাকেটটি নানা ভাবে পরা যাবে। প্যান্টের পরিবর্তে সিক্যুইনড ড্রেসের সঙ্গেও পরা যেতে পারে। আবার স্কার্টের সঙ্গেও মানিয়ে যাবে। সম্পূর্ণ দৃশ্যমান বাস্টিয়ারে স্বচ্ছন্দ হলে জ্যাকেটের বোতামটিও খুলে রাখা যেতে পারে।
আরও পড়ুন:
সঙ্গে হালকা মেকআপ আর যৎসামান্য অলঙ্কার দিয়ে সেজে নিতে পারেন। প্রিয়াঙ্কা যেমন সাদা রঙের ঝোলা দুল পরেছেন, আপনি মভ দুলেও সাজতে পারেন। কেউ কেউ আবার একেবারেই গয়নাগাঁটি পছন্দ করেন না। কেবল গাঢ় লিপস্টিক আর হালকা মেকআপ দিয়ে সাজ সম্পূর্ণ করতে চান। কেউ চুল খোলা রাখেন, কেউ বা পনিটেল করে নেন।
তবে বছরের শেষে নৈশপার্টি নিয়ে মাতামাতি থাকেই। ২৪ ডিসেম্বর রাত হোক বা ৩১ ডিসেম্বর। সারা বছর যে বাঙালি শাড়ি, ধুতি-পাঞ্জাবীর উপর ভরসা রেখে সাজগোজ করেন, তাঁদের জন্য এ সময়টা হল নতুন কিছু সাজার সুযোগ। পাশ্চাত্যের সাজের প্রভাব পড়ে এ সময়ে। তার উপর গত বেশ কয়েক বছর যে ভাবে বাহুল্যবর্জিত সাজের চল বেড়েছে, তার থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে ফ্যাশনদুনিয়া। বাহুল্যযুক্ত, অতিরিক্ত সাজের দিকে ঝুঁকছেন অনেকে।
রাতের পার্টির জন্য তাই প্রিয়াঙ্কাকে সাজানো হল নিছক পার্টিড্রেসে। চওড়া গলার ডিজ়াইন, স্বচ্ছ কাপড়ের লেয়ারিং এবং অসম কাট-সহ ঝালর দেওয়া হেমলাইন। ড্রেসটি ফুল হাতা। সঙ্গে থ্রিডি লেদার পাপড়ির আকর্ষণীয় কাজ করা। তার উপর সিক্যুইনের কাজ পোশাকটিকে আরও বেশি করে পার্টির উপযুক্ত করে তুলেছে। ব্লিং পোশাকের ট্রেন্ডের সঙ্গে পা মেলানোর জন্য আপনিও এই ধরনের জামা পরতে পারেন।
অভিষেক বলছেন, ‘‘ঝলমলে, আকর্ষণীয়, চোখধাঁধানো পোশাকের চল বেড়েছে। সিক্যুইনড পোশাক, এব্রয়েডারি করা জামায় মেটালিক ছোঁয়া, লেদারের পোশাকে ভরা আমার সম্ভার। আমি মনে করি, কলকাতার মানুষজন এখন নতুন কায়দায় লেদার দিয়ে সাজসজ্জা শুরু করেছে। লেদার স্কার্টের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। তার সঙ্গে ঊরু সমান বুট আর ট্রেঞ্চ কোট পরলে বেশ মানিয়ে যাবে।’’
আরও পড়ুন:
এমনই সাজের সঙ্গে হাতে বা পায়ে এবং গলায় বা ঘাড়ে শিমার জেল মেখে নিতে পারেন। আলো ঝলমলে রাতে আপনার সাজ আরও বেশি জেল্লাদার ও মায়াবী হয়ে উঠতে পারে। সঙ্গে অবশ্যই হাই হিল সবচেয়ে বেশি মানানসই। তবে হিলে স্বচ্ছন্দ না হলে প্ল্যাটফর্ম হিল বা ফ্ল্যাট বুটস পরতে পারেন।
প্রিয়াঙ্কা যেমন উঁচু করে চুল বেঁধেছেন, আপনিও তেমন ভাবেও সাজতে পারেন। নয়তো টপবান, খোলা চুলেও ভরসা রাখা যায়। নিজের চুলের দৈর্ঘ্য অনুযায়ী সেজে নিতে হবে। মেকআপেও হালকা মেটালিক লুক বেশ মানানসই হবে। চোখে থাকতে পারে স্মোকি আই-এর আমেজ। উৎসবের দিনে নৈশপার্টির সাজ এ ভাবেই নজরকাড়া করে নেওয়া যেতে পারে।
উৎসবের এই মরসুমে লাল রঙে সেজে ওঠে শহর। আপনিই বা কেন পিছিয়ে থাকবেন? বড়দিনে রঙের সঙ্গে পা মিলিয়েও ভিড়ের মধ্যে আলাদা হয়ে উঠতে পারেন। ঠিক যে ভাবে প্রিয়াঙ্কার সাজে নতুনত্বের ছোঁয়া আনতে পেরেছেন অভিষেক। কাটওয়ার্ক করা র্যাপ অ্যারাউন্ড জ্যাকেটের সঙ্গে মেটালিক লেদার স্কার্ট এবং এমব্রয়ডারি করা বিকিনি টপ পরানো হয়েছে অভিনেত্রীকে।
ক্লাবের পার্টি থেকে ডেট-নাইট, অথবা দিনের বেলায় কোনও পার্টিতে যোগদান করতে হলে এই ধরনের পোশাক সেরা পছন্দ হতে পারে। শীতের উদ্যাপনে লম্বা একটি বুট পরে নিতে পারেন প্রিয়াঙ্কার মতো। অথবা হাই হিলও পরা যেতে পারে। চাইলে জ্যাকেটের বোতাম খুলে নিতে পারেন। তা হলে ব্রালেট বা বিকিনি টপের কাজ আরও বেশি স্পষ্ট হবে।
নায়িকা এখানে লাল রঙের জ্যাকেটের সঙ্গে ব্রোঞ্জ স্কার্ট পরেছেন। পোশাকশিল্পীর মতে, এই যুগলবন্দি আসলে মরসুমের সেরা জুটি। গাঢ় থেকে হালকা, যে কোনও লালই ক্রিসমাসের কথা বলে।
পোশাকের আনুষঙ্গিক সাজেও লালের ছোঁয়া রাখতে পারেন। ঠোঁটের সাজে লাল লিপস্টিক, কানে প্রিয়াঙ্কার মতো মুক্তো না পরে লাল বেছে নিতে পারেন। কেউ বা লাল টুকটুকে ব্যাগ ব্যবহার করেও ক্রিসমাসের আমেজ আনতে পারেন নিজের সাজে। শীতের পার্বণের এমন সাজে বাহুল্যের ছোঁয়াও যেমন রয়েছে, তেমনই অতি সাজের অস্বস্তিও থাকে না।
রং আপনার, পোশাক আপনার, কেবল কী ভাবে কোনটি পরবেন, সে বিষয়ে ভাবনাচিন্তা করে নিতে হবে। এমন পোশাকগুলি কলকাতার হালকা শীতের সঙ্গে সম্পূর্ণ ভাবে মানানসই। অতিরিক্ত ভারী নয় বলে পার্টির মাঝে গরমে কষ্ট পাবেন না, আবার রাস্তায় বেরোলেও ঠান্ডায় কাঁপতে হবে না। শীতে লেয়ারিং ও রং বাছাইয়ের শৈলী জানা থাকলে, ভিড়ের মধ্যে নজর কা়ড়তে বেশি পরিশ্রম করার প্রয়োজন নেই।