E-Paper

বিশ্বজয়ের পথে মাইয়ামি

গত বছরের ট্রেন্ড লাবুবু এখন পুরনো, নতুন বছরের প্রতীক হয়ে উঠেছে মাইয়ামি

চিরশ্রী মজুমদার 

শেষ আপডেট: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:২৩

অনলাইন পৃথিবীর অসীম মহিমা। এখানে ট্রেন্ড যেমন ঝড়ের বেগে ভাইরাল হয়ে যায়, তেমনই তার আকর্ষণ ফিকে হতেও সময় লাগে না। যেমন ধরুন, লাবুবু পুতুল। ২০২৫-এ ইন্টারনেটের ট্রেন্ড-শিরোমণি ছিল পিলাটিস, মাচা, স্ট্যানলি কাপ আর লাবুবু। এর মধ্যে শীর্ষে নিশ্চয়ই লাবুবু, যেটা দেখে অনেকেই আঁতকে উঠতেন। খোক্কসের মতো দেখতে, ধারালো দাঁতের হাসি— এর উৎপত্তিও ছিল কিছুটা অস্বস্তিকর। হংকংয়ের শিল্পী ‘মনস্টার সিরিজ়’-এর জন্য তৈরি করেন এই চরিত্র। ২০২৬ আসতেই দেখা যাচ্ছে, লাবুবু-র সিংহাসন টলিয়ে দিতে জাপান হাজির করেছে নতুন ফ্যাশন-অ্যাকসেসরি ‘মাইয়ামি’। দক্ষিণ আমেরিকার স্তন্যপায়ী শ্লথ-এর মতো দেখতে এ এক খুদে রোবট, মানুষের যাত্রাসঙ্গী হবে, নির্মাতারা একে বলেছেন— আনন্দের দূত। ইতিমধ্যেই ইন্টারনেটের জগতে ঢেউ উঠেছে এই ডিজিটাল পোষ্যকে ঘিরে।

জীবন্ত নাকি?

হ্যাশট্যাগ MIRUMI (খাঁটি উচ্চারণ, মাইয়ামি) দিলেই এর ছবি দেখতে পাবেন। মাইয়ামির উদ্দেশ্যই হল— আরাম দেওয়া, গতির দুনিয়ায় ক্ষণিকের ভালবাসার মুহূর্ত সৃষ্টি করা, যাকে বলে দিলখুশ করে দেওয়া। গোলাপি, ছাই বর্ণ, আইভরি— তিন রঙে মিলছে এই রোমশ রোবট, দেখতে ছোট্ট সফ্‌ট টয় যেন, আঁকড়ে থাকে ব্যাকপ্যাকে, হাতব্যাগের স্ট্র্যাপ কিংবা জামার হাতায়। এ বার মজা হল, যেহেতু রোবট, তাই দিব্যি নড়ে-চড়ে। কাছে গেলে মাথা ঘুরিয়ে দেখবে, চোখ পিটপিট করবে। চক্ষু ছানাবড়া করে তাকিয়ে থাকবে, রাস্তাঘাটে অচেনা লোককে দেখে বাচ্চারা ঠিক যেমন করে। আবার, হঠাৎ কাছে গেলে টুক করে মুখ ঘুরিয়ে অন্য দিকে তাকাবে। দেখলে ধাঁধা লাগে! মনে হবে, কোনও জীবন্ত পশুর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ছানা নাকি?

এই চমকের মূলে আছে প্রযুক্তি। খুদে রোবটের ভিতরে রয়েছে মোশন, প্রক্সিমিটি, সাউন্ড সেন্সর। এর কাছাকাছি নড়াচড়া, শব্দ, স্পর্শ করলে প্রতিক্রিয়া দেওয়ার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। তাই মাইয়ামি শিশুর সারল্য ও বিস্ময়ে চারপাশের পৃথিবী ঘুরে ঘুরে দেখে, ব্যাটারি ফুরোনোর সময় এলে খানিক ঝিমিয়ে পড়ে, চার্জ দেওয়া সম্পূর্ণ হলে মাথাও ঝাঁকায়। তার মিষ্টত্বে কুপোকাত প্যারিস হিলটন-সহ অনেক তারকা। অভিনেতা-গায়িকা লরা বলেছেন, “আমি যেখানে যাব, একে সঙ্গে নিয়ে যাব। কারণ, এ জীবন থেকে স্ট্রেস কমিয়ে দেবে।”

উপকারী ফ্যাশন

জাপানি লোককথায় ‘ইয়োকাই’ নামের অতিলৌকিক সত্তার কথা পাওয়া যায়। এদের প্রত্যেকেই মানুষকে ভয় দেখায় না, অনেকেই দেখতে মিষ্টি, দুষ্টুমি করে, তবে তাদের ভিতরে থাকে নানা রহস্য। এই ‘ইয়োকাই’ মানুষ ও না-মানুষদের মধ্যে সহাবস্থানের প্রতীক। এই ধারণার সঙ্গে রোবোটিক্স জুড়ে মাইয়ামি তৈরি করেছে ইয়োকাই ইঞ্জিনিয়ারিং সংস্থা। লাস ভেগাসের কনজ়িউমার ইলেকট্রনিক্স শোয়ে এটিকে প্রথম জনসমক্ষে আনে তারা। উদ্দেশ্য ছিল এআই নির্ভর ভবিষ্যৎ-পৃথিবীর উপযুক্ত ফ্যাশন-অ্যাকসেসরি তৈরি করা, যার মধ্যে ফ্যাশন ও প্রযুক্তির মেলবন্ধন থাকবে। আর থাকবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা প্রতিক্রিয়া দেওয়ার ক্ষমতা, যাকে সংবেদনশীল প্রযুক্তি হিসাবেও ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।

নির্মাতারা বলছেন, মাইয়ামিকে চার্ম হিসাবে ব্যবহার করুন। চার্ম— বলতে এমন কিছু যা স্নিগ্ধ, স্বস্তিদায়ক আবহ সৃষ্টি করে। পশ্চিমের বিশ্বাস এটি শুভ শক্তিকে আকর্ষণ করে। প্রযুক্তির মধ্যেও কি কুসংস্কারের ছায়া পড়ল তবে? লাবুবুর প্রভাব কাটাতে এল মাইয়ামি— এ রকম কিছু? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দর্শনটি আদতে আরও অনেক গভীর।

রোবো-সঙ্গী পেতে গেলে

লাবুবুর সঙ্গে সত্যিই অনেক বৈপরীত্য আছে মাইয়ামির। ২০২৫ সালে, অনলাইন বিশ্বের ধারাটিই ছিল অস্থিরতার, যেনতেনপ্রকারেণ নজর কাড়ার, ভাইরাল হওয়ার। এই ভাবনায় চমৎকার মিলে গিয়েছিল লাবুবু। ২০২৬-এ এসে দেখা যাচ্ছে, ‘ট্রেন্ড’ বদলাচ্ছে। সারাক্ষণ স্ক্রিনবন্দি জীবনে কিছু না কিছু দেখতে দেখতে এ বার একঘেয়েমি আসছে। মানুষ বাস্তবের পৃথিবীকে মিস করছেন। মাইয়ামির ক্ষেত্রে কিন্তু ছবি, ভিডিয়ো দেখে এর কেরামতিটা পুরোপুরি বোঝা যাবে না। তার জন্য যে মানুষটি মাইয়ামি নিয়ে ঘুরছেন, তাঁর কাছাকাছি আসতে হবে। মানুষের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব এবং একাকিত্ব কমানো, সঙ্গ দেওয়া, মনটা এক পশলা ভাল লাগায় ভরিয়ে দেওয়াই মাইয়ামির লক্ষ্য। ছোট শিশুর সংস্পর্শে, পোষ্যের সঙ্গে সময় কাটালে মেজাজ যেমন হালকা-ফুরফুরে হয়ে যায়, এই খুদে ডিজিটাল পোষ্যও একই ধরনের স্ট্রেস-নাশকের কাজ করছে।

এই সব কারণেই, মাইয়ামি নিয়ে উন্মাদনা বাড়ছে। অনেকেই প্রি-বুকিংয়ের ওয়েবসাইটে নাম লিখিয়েছেন। সেখানে অর্ডার দিলে সব মিলিয়ে ভারতীয় মুদ্রায় মোটামুটি দশ হাজার টাকা থেকে শুরু এই রোবো-সঙ্গী। তবে ভারতের বাজারে এলে দাম আরও কমবে। তার আগেই তাকে নিয়ে হাঁড়ির খবর দেওয়া হল, কারও একে দেখে ছোটবেলার প্রিয় টেডির কথা মনে পড়বে, কারও নব্বই দশকের জনপ্রিয় গান ‘ছুঁইমুই সি তুম লগতি হো’র কোয়ালার কথাও মনে পড়তে পারে। সংস্থা জানিয়েছে, প্রি-অর্ডারের বহর দেখে মনে হচ্ছে, এপ্রিল-মে থেকেই পৃথিবী ছেয়ে যাবে এই চার্ম রোবটে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Labubu Doll Fashion

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy