Advertisement
E-Paper

সংসদ ভবন যখন মার্জার সরণির চেয়ে কম নয়! সাজে কে কাকে টেক্কা দিলেন বাজেট অধিবেশনে?

রিল পিছু ২০ সেকেন্ডও ব্যয় করতে নারাজ এখন মানুষ। নেতাদের বক্তৃতা শোনার ধৈর্য নেই। সেখানে প্রিয় নেতার একটা ছবি, তাঁর হাবভাব, সাজগোজ কয়েক সেকেন্ডেই তৈরি করে ফেলছে একটা ভাবমূর্তি। সেই সত্যের হদিস পেয়েছেন রাজনীতির জগতের মানুষজন।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ৩০ মার্চ ২০২৬ ০৮:৫৭

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

যেখানে আইন পাশ হয়, সেখানে কি সাজগোজ নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় আছে? এমন প্রশ্ন কিছু মানুষ আজও করেন। অথচ কোনও সাংসদের বিদেশি ব্যাগ দেখলে, বিদেশি জুতো দেখলে এঁরাই মাথা ঘামান সবার আগে। প্রশ্ন তোলেন। পিছপা হন না কটাক্ষ হানতে। নিজেরাই প্রমাণ করে দেন, রাজনীতিতে আর যা-ই হোক, সাজগোজ আলোচনার বাইরে থাকতে পারে না। বরং ইনস্টাগ্রামের যুগে ক্রমশ সাজপোশাকই হয়ে উঠছে যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যম। রিল পিছু ২০ সেকেন্ডও ব্যয় করতে নারাজ এখন মানুষ। নেতাদের বক্তৃতা শোনার ধৈর্য নেই। সেখানে প্রিয় নেতার একটা ছবি, তাঁর হাবভাব, সাজগোজ কয়েক সেকেন্ডেই তৈরি করে ফেলছে একটা ভাবমূর্তি। সেই সত্যের হদিস পেয়েছেন রাজনীতির জগতের মানুষজন। তাতেই সাজগোজের প্রতি আরও মনোযোগী হয়েছেন জননেতারা। যার প্রমাণ সংসদে বাজেট অধিবেশনের দ্বিতীয় পর্ব।

বিগত কয়েক সপ্তাহ ধরেই সংসদ ভবন চত্বরে দেশের বিভিন্ন রাজ্যের সাংসদেরা হাজির হচ্ছেন বাজেট অধিবেশনের জন্য। তাঁরাই পোশাকে-আশাকে, সাজগোজে তৈরি করছেন ‘স্টেটমেন্ট’। কেউ নিজের সাজে মিশিয়ে দিচ্ছেন প্রান্তিক মানুষের প্রতিবাদের ভাষা, কেউ বা আভিজাত্যের মোড়কে সাজিয়ে তুলছেন নিজস্ব ঘরানা। তৈরি করছেন ব্যক্তিত্বের ব্র্যান্ড। চলতি অধিবেশনে এক ঝাঁক সাংসদ তা করে দেখিয়ে দিলেন । দেশের সংসদের অলিন্দে সেই সব ‘স্টাইল স্টেটমেন্ট’-এরই হদিস নিল আনন্দবাজার ডট কম।

জুন মাল্য

সাদা থানের শাড়ি রাজনৈতিক নেত্রীরা পরেই থাকেন। তবে সংসদ ভবনে মেদিনীপুরের সাংসদ জুন মাল্যর সাদা শাড়ি অজস্র সাদার মধ্যে আলাদা করে নজরে পড়ে। নরম সাদা জমিতে অনুজ্জ্বল সোনালি জরির ত্রিকোণ বুটি। মিহি নরুন পাড় বোনা হয়েছে কালো সুতোয় কাঁথা কাজের নকশা তুলে। এর সঙ্গে কালো রোদচশমা আর রুপোলি ঘড়ি—পুরো সাজটাকেই ‘পাওয়ার ড্রেসিং’-এর পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে। সাদা শাঁখা আর কনুই অবধি ব্লাউজ় মিশিয়েছে বাঙালিত্ব।

প্রিয়ঙ্কা গান্ধী

প্রিয়ঙ্কার স্টাইলের তুলনা করা হয় তাঁর ঠাকুমা ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে। তিনি পরতেন ছিমছাম খাদির শাড়ি। মূলত অনুজ্জ্বল, একরঙা। তাতে সুতির মাঠা পাড়। প্রিয়ঙ্কা যদিও তেমন কিছু পরেননি। বাজেট অধিবেশনে প্রিয়ঙ্কা হাজির হলেন এক্কেবারে অন্য মেজাজে। পরনে রানি গোলাপি জমির মণিপুরি শাড়ি। তাতে কমলা পাড়। রুপোলি মন্দির নকশা পাড়ের গায়ে। আর শাড়ি জুড়ে রুপোলি জরির সমান্তরাল স্ট্রাইপ। রোদ পড়ে সেই শাড়ি থেকে ফেটে বেরোচ্ছে উজ্জ্বল রং। সংসদে কংগ্রেস যখন মণিপুর ইস্যু নিয়ে সরব, তখন প্রিয়ঙ্কা সেই রাজ্যের শাড়ি পরে অত্যন্ত সুকৌশলে সেরে নিলেন তাঁর ‘পোশাক রাজনীতি’। তবে এমন চড়া রং বইবার ক্ষমতা সকলের থাকে না। ঘাড় ছোঁয়া কাঁচা-পাকা চুল, বেজ রঙের পাম্প জুতো আর চওড়া স্টিল ব্যান্ডের রেট্রো ঘড়িতে প্রিয়াঙ্কা শাড়িটিকে যে উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন, তা সম্ভবত তিনি ছাড়া আর কারও পক্ষে সম্ভব ছিল না।

শশী তরুর

চুল রুপোলি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তাঁর সাজে কি বার্ধক্যের লেশমাত্র আছে? বরং ওই রুপোলি কেশ আর সুঠাম অবয়বের নীচে খুঁজে পাওয়া যাবে লাল সিল্কের পাঞ্জাবি পরা এক উদ্যমী তরুণকে। যাঁর কাঁধে হাজারো দায়িত্ব, দু-হাত ভরা কাজের বোঝা, তবু তার মাঝেই সময় বের করে ফিটফাট সেজে নিতে ভোলেন না। নেহরু জ্যাকেটের পকেটে গোঁজা থাকে কুর্তার রঙের সঙ্গে রং মেলানো রুমাল। চোখে প্রিয় কালো রোদচশমা। কায়দা করে কাটা চুলে আঙুল বোলাতে বোলাতে যখন তিনি এগিয়ে যান, তখন মনে হয় ক্লান্তি নয়, বরং ‘কেয়ার না করা’ মেজাজই তাঁর আসল স্টাইল স্টেটমেন্ট। শশী তরুর বুঝিয়ে দেন, স্টাইল শুধু পোশাক হয় না, তার অনেকটা জুড়ে থাকে নিজেকে গুছিয়ে রাখার ইচ্ছেও।

সায়নী ঘোষ

চুর করে বাঁধা অগোছালো খোঁপা, চোখে ওভারসাইজ়ড সানগ্লাস, কাঁধে ল্যাপটপ ব্যাগ। পরিপাটি গোছানো সাজ নয়। কিছুটা কেজো। কিন্তু কেতাদুরস্তও। প্যাস্টেল রঙের একটি সিল্কের শাড়ি পরেছেন যাদবপুরের সাংসদ সায়নী। সেই শাড়িতে ডুরে কেটেছে সাদা শান্তিনিকেতনী বাটিক। হালকা পিচ রঙের ওই শাড়ির সঙ্গে কনুই অবধি সাদা ব্লাউজ় আর কপালে বড় লাল টিপে সায়নী একই সঙ্গে এ কালের অগোছালো কুলনেস আর সে কালের সিগনেচার স্টাইলকে মিলিয়েছেন।

স্বাতী মালিওয়াল

সংসদের ফ্যাশন নিয়ে কথা হলে স্বাতী মালিওয়ালকে বাদ দিয়ে তা সম্ভব নয়। আম আদমি পার্টির এই রাজ্যসভা সাংসদ প্রথম দিন থেকেই নিজের এক স্বতন্ত্র ফ্যাশন স্টেটমেন্ট তৈরি করেছেন। সম্ভবত তিনি এই যুগে ‘আলোচনায় থাকা’ আর ‘নজরে পড়ার’ নিপুণ অঙ্কটি কষে ফেলেছেন। বাজেট অধিবেশনের দ্বিতীয় দফাতেও তাঁকে প্রতিদিন নতুন নতুন সাজে দেখা গিয়েছে।

তবে তার মধ্যেই মহারানি গায়ত্রী দেবী অনুপ্রাণিত এই সাজখানি নজর টানতে বাধ্য। ফ্লোরাল নকশার শিফন শাড়ি, স্লিভলেস বন্ধ গলা ব্লাউজ়ের সঙ্গে স্বাতী পড়েছেন এক ছড়া মুক্তোর মালা। তাঁর ঘাড় ছোঁয়া বব চুল যোগ্য সঙ্গত করেছে এই সাজের সঙ্গে। তবে এখানে একটু মোচড় আছে। গায়ত্রী দেবী ফিকে অথবা সাদা রঙের শাড়ি পছন্দ করতেন। স্বাতী একই স্টাইল করেছেন কালো রঙে।

রাহুল গান্ধী

তাঁর পোশাকে পরিবর্তন সচরাচর দেখা যায় না। সেই পোলো টি-শার্ট। সেই হালকা কাপড়ের সিক্স পকেট ট্রাউজ়ার্স। তবে এবারের বাজেট অধিবেশনে এক অভিনব স্টাইল স্টেটমেন্ট তৈরি করলেন রাহুলও। টি-শার্টের ওপরে গলায় ঝুলিয়ে নিলেন নাগাল্যান্ডের আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী গয়না— যার নাম ‘কান্যক’। গলায় হাড়ের তৈরি কলার। তার থেকে ঝুলছে পুঁতির মালা, সে মালার শেষপ্রান্তে পাঁচটি পিতলের মুখ আর উজ্জ্বল লাল সুতোর ঝুমকো। টি-শার্টের মতো অতি সাধারণ পোশাকের উপর এমন ভারী ও সাবেকি গয়না পরার এই স্টাইল আগামী দিনে শৌখিন পুরুষ ও মহিলাদের নিশ্চিত ভাবে প্রভাবিত করবে। তবে এই সাজ কেবল ফ্যাশন নয়, রাহুল তাঁর বোনের মতোই উত্তর-পূর্ব ভারতের সংস্কৃতিকে আক্ষরিক অর্থেই বুকে জড়িয়ে এক নিপুণ ‘পোশাক রাজনীতি’ সেরে নিলেন সংসদ চত্বরে।

মহুয়া মৈত্র

পরিপাটি সাজে মহুয়াকে প্রায়ই দেখা যায়। তবে এই সাজ একটু হলেও অন্য রকম। এই সাজের স্টার পারফর্মার মহুয়ার নিখুঁত কাটের ব্লাউজ়। গ্লাসহাতা, পিঠ ঢাকা দুধসাদা ব্লাউজ়টির নেক লাইন স্মার্ট আর পরিচ্ছন্ন। এর সঙ্গে যে কোনও শাড়িই ভাল লাগত। মহুয়া বেছে নিয়েছেন নীল রঙের ‘বান্ধনী’ নকশার আধা স্বচ্ছ শাড়ি। তার জমিতে সাদা আর কমলার আলপনা। রং মিলিয়ে তিনি কানে পরেছেন এক জোড়া ঝুমকো। চুল বেঁধেছেন টান টান পনিটেলে। সঙ্গে কেতাদুরস্ত ব্যাগ, চোখে বড় চশমায় মহুয়াকে দেখাচ্ছে কর্পোরেট দুনিয়ার ব্যস্ত শৌখিনির মতো।

কঙ্গনা রনৌত

কঙ্গনা রাজনীতিতে আসার পর থেকে যে রকম সাজগোজ করছেন আর তাতে তাঁকে যেমন গ্ল্যামারাস লাগছে, তাতে বছর কয়েক পরে মানুষ অভিনেত্রী কঙ্গনাকে ভুলেও যেতে পারে। ঐতিহ্যবাহী জমকালো নকশাদার শাড়ি থেকে সাধারণ সুতির শাড়িকে তিনি যে ভাবে ও অবলীলায় অফিস ওয়্যারে পরিণত করছেন, তা শেখার মতো। মন্ডীর সাংসদ চলতি বাজেট অধিবেশনেও হতাশ করেননি ভক্তদের। সংসদ ভবনের চত্বরে তিনি যে দিনই অবতীর্ণ হয়েছেন, সে দিনই মনে হয়েছে সেখানে ঐতিহ্যবাহী অফিস ওয়্যারের ফ্যাশন প্যারেড চলছে। তার মধ্যেই কঙ্গনার এই সমরঙের সুতোর নকশা করা লেস বসানো লিনেন শাড়ি আর ভি নেক ব্লাউজ়টি থেকে চোখ ফেরানো যাচ্ছে না, এক ফোঁটা গোলাপির ছোঁয়া থাকা এই শাড়ির রংটিও চোখে আরাম দেয়। অবশ্য সঙ্গের ব্যাগ, জুতো, সানগ্লাস, আর হিরে মুক্তোর ছোট্ট দুলের আবেদনও এড়ানো মুশকিল।

রাঘব চড্ডা

সাংসদ হিসেবে তো বটেই, ব্যক্তি রাঘব চড্ডারও ভক্তসংখ্যা উত্তরোত্তর বাড়ছে। কারণ, তিনি সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক সমস্যা নিয়ে কথা বলছেন, যা ভারী ভারী রাজনৈতিক বুলির চেয়ে অনেক বেশি যুগোপযোগী। এই আধুনিক ভাবনার প্রতিফলন রাঘবের সাজপোশাকেও স্পষ্ট। টি-শার্টের ওপর বোতাম খোলা ওভারসাইজ়ড শার্ট, হাতে কফির মিনি টাম্বলার, ফাইল আর ফোন— সব মিলিয়ে এক কেতাদুরস্ত অথচ নির্ভার লুক। শুধু কাজে নয়, সাজেও রাঘব বুঝিয়ে দিচ্ছেন তিনি সে যুগের কুর্তা-পাজামার প্রথা ভেঙে আসা আপাদমস্তক এ যুগের প্রতিনিধি।

হেমা মালিনী

যে যুগে সংসদ মানে নীরস সাজগোজহীন, শুষ্কং কাষ্ঠং জায়গা বলে মনে করা হত, সে যুগে সাংসদ হয়েছিলেন ড্রিম গার্ল। সংসদে সাজগোজের প্রথম দিকের ঝড় যাঁরা তুলেছিলেন, তাঁদের মধ্যে তিনি নিঃসন্দেহে একজন। সেই তিনি এই নতুন যুগের অল্পবয়সি সাংসদদেরও ফ্যাশনে টক্কর দিচ্ছেন এখনও। বাজেট অধিবেশনে তাঁর নানা সাজের মধ্যে এই ক্রিম রঙের জমির উপর কালো নকশার চান্দেরি সিল্ক শাড়ি চোখ টানল। তার দু’টি কারণের একটি হল— তাঁর স্মার্ট কাট-এর ব্লাউজ়। ছোট হাতা আর ‘ভি-নেক’ গলার এই ব্লাউজ় যেমন স্মার্ট, তেমনই হেমার বয়সকেও এক ধাক্কায় অনেকটা কমিয়ে দিয়েছে। দ্বিতীয় কারণটি হল, শাড়ির আঁচলের কুরুশের কাজ। যা আর পাঁচটা সাধারণ সিল্ক শাড়ির থেকে একে আলাদা করে দিয়েছে। আর হেমা বরাবরই জানেন, ভিড়ের মধ্যে আলাদা হতে হয় কী ভাবে।

নির্মলা সীতারমণ

সংসদে বাজেট অধিবেশনের দ্বিতীয় পর্যায় চলছে। ফলত দেশের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণের প্রতিটি বাক্যে নজর। দেখা গেল সংসদ ভবনের বাইরেও একই ভাবে নজর কাড়ছেন নির্মলা। সাজগোজে। বরাবরই দেশীয় ঐতিহ্যের ঝলক থাকে তাঁর পোশাকে। কমলা লেবুর রঙের আয়না চেক দেশজ তাঁতের শাড়ির সঙ্গে কালো-কমলা কলমকারির ব্লাউজ় পরে যখন দৃপ্ত পদক্ষেপে সংসদে এলেন নজর গেল তাঁর পায়েও। কালো আর ধূসর রং মিলন্তির বিদেশি ব্র্যান্ডের পাম্প জুতো থেকে হচ্ছে ক্ষমতার কেতাদুরস্ত বিচ্ছুরণ।

প্রিয়ঙ্কা চতুর্বেদী

পিচ রঙের তসরে লখনউ চিকেনের সূক্ষ্ম কারুকাজ। জমিতে ফুল। পাড়ে লতাপাতা। এই কাপড় আর এই নকশার মিশেল বড় একটা দেখা যায় না। তবে সংসদ ভবনের সাজের কথা মাথায় রেখে প্রিয়ঙ্কা চতুর্বেদী অমন শাড়ি খুঁজে বার করেছেন। এ শাড়ির রং যেমন মিষ্টি, তেমনই আরামদায়ক, তবে শিবসেনা সাংসদের সাজ ভিন্ন হয়েছে বিদেশি উঁচু হিলের পাম্প, বিদেশি ব্যাগের সঙ্গে কব্জিতে জড়ানো রুদ্রাক্ষের মালায়।


Sajer Sera
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy