'লিপস্টিক' শব্দটির সঙ্গেও যখন জগতের পরিচয় ঘটেনি, লাল রঙে রাঙানো ঠোঁটের আকর্ষণ তখন থেকেই। সেই হিসাবে ওষ্ঠরঞ্জনের দুনিয়ায় লাল রং হল সনাতনী! অর্থাৎ আদি। আদিম সেই লাল ঠোঁটের প্রতি আকর্ষণও।
ঠোঁটে লালচে আভা পেতে আদিকালে রাজমহিষীরা গোলাপের পাপড়ি বেটে লাগাতেন। বিটের রস, ফলের রসেও রাঙাতেন ঠোঁট। বাংলার নারীরা আবার আবহমানকাল ঠোঁট রাঙিয়েছেন তাম্বুলরাগে। অর্থাৎ পান খেয়ে। কিন্তু সে সব অত্যন্ত ভাল জিনিস। লাল রঙের ঠোঁট পেতে মরিয়া মহিলারা আজ থেকে হাজার পাঁচেক বছর আগে এমন অনেক কিছু ব্যবহার করতেন, যা শুনলে এ কালের শৌখিনীদের শরীর ঘুলিয়ে উঠবে!
শোনা যায় প্রাচীন গ্রিস এবং রোমে যৌনকর্মীরা ঠোঁটে লাল রং করতেন ভেড়ার ঘামের সঙ্গে কুমিরের পুরীষের মিশ্রণ দিয়ে। মিশরের রানি ক্লিওপেট্রার ঠোঁটের লাল রং তৈরি করা হত পিঁপড়ে আর গুবরেপোকা থেঁতো করে, তার রস থেকে। তবে ঠোঁটে লাল রঙ করার সবচেয়ে প্রাচীন উদাহরণ মেসোপটেমিয়ার রানি পুয়াবি। তিনি সিসা বা লেডের সঙ্গে লাল পাথর গুঁড়ো মিশিয়ে লাগাতেন ঠোঁটে। অথচ লেডের মতো রাসয়নিক প্রাণঘাতীও হতে পারে।
সোজা কথায় ঠোঁটের লাল রঙের আবেদন যাকে বলে পরীক্ষিত এবং প্রমাণিত। এখন যে শৌখিনীরা লিপস্টিক বেছে নেওয়ার সময় বলেন, "হোয়েন ইন ডাউট, চুজ় রেড!", তা কেবল কথার কথা নয়। সত্যিই ভাল দেখানোর জন্য অগতির গতি হতে পারে লাল ঠোঁট। রক্তিম ঠোঁটের যেমন এক রকমের জোরালো উপস্থিতি আছে, তেমনই আছে এড়াতে না পারার মতো অদম্য আকর্ষণ। মনোবিদেরা আবার বলেন, কোনও কোনও মহিলা লাল রঙে ঠোঁট রাঙালে বাড়তি আত্মবিশ্বাসও অনুভবও করেন।
তা বলে ‘রেড লিপস’-এর নিন্দক যে নেই, তা নয়। অনেকেই টকটকে লাল রঙে রাঙানো ঠোঁট দেখলে চড়া দাগের সাজ বলে কটাক্ষ হানেন। কিন্তু তাতে ভারি বয়েই গিয়েছে সুন্দরীদের। হলিউডের নায়িকারা তো বটেই, লাল ঠোঁটের জয়জয়কার বলিউডেও। দেশে হোক বা বিদেশেঁ, নানা অনুষ্ঠানে সেজেগুজে টকটকে লাল রঙে ঠোঁট রাঙিয়েই হাজির হন এ যুগের নায়িকারা। কী ভাবে ‘রেড লিপস'কে প্রকাশ করেন তাঁরা?
দীপিকা পাড়ুকোন
নিন্দকেরা একটি কথা ঠিক বলেন। লাল বড় চোখে পড়ে। তাকে সামলানো সোজা কথা নয়। লালকে সামলানোর জন্য দরকার জোরালো ব্যক্তিত্ব। তবেই লাল বশ মানে। আর লাল রংকে লাগাম পরানোর ক্ষমতা যদি কারও থেকে থাকে, তবে দীপিকা পাড়ুকোন নিঃসন্দেহে তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। তাঁর বহু পোশাকের সঙ্গেই টকটকে লাল রঙে ঠোঁট রাঙিয়েছেন দীপিকা। কখনও তার সঙ্গে চোখে ডানা মেলেছে আইলাইনারের স্ট্রোক, কখনও আইশ্যাডো দিয়ে নাটকীয়তা এনেছেন চোখের পাতায়। সব মিলিয়ে দীপিকা যখন ঠোঁট রাঙিয়েছেন লালে, তখন বিচ্ছুরণ ঘটেছে এক অন্য মাত্রার আত্মবিশ্বাস আর তারকাসুলভ গ্ল্যামারের।
তমন্না ভাটিয়া
তাঁর গায়ের রং অত্যন্ত উজ্জ্বল। তার উপর গাঢ় লাল রঙের লিপস্টিক খুব বেশি ফুটে ওঠার কথা। আধুনিক সাজের দুনিয়া এই ধরনের চরম বৈপরীত্যকে অনেক সময় এড়িয়ে চলে। কারণ, বৈপরীত্যকে এক সুতোয় বাঁধতে পরিশ্রম বেশি। ভুল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও বেশি। তবে তমন্না সেই ঝুঁকি নিয়েই লাল রঙে রাঙিয়ে নেন ঠোঁট। শাড়ি হোক বা গাউন— যে পোশাকেই সাজুন, লাল রঙে ভয় নেই তাঁর।
আলিয়া ভট্ট
আলিয়া ভট্ট নাকি গাঢ় রঙের লিপস্টিক এড়িয়ে চলেন! এমনকি, বিয়ের সাজেও লিপস্টিকে রাঙাননি ঠোঁট (অথবা ব্যবহার করেছিলেন ন্যুড রং)। মোট কথা, সাজে ‘মিনিমালিজম’ পছন্দ করেন নায়িকা। খুব বেশি চোখের মেক আপ নয়, খুব বেশি ঠোঁটে রংও নয়। সেই তিনিও লাল লিপস্টিক পরেছেন। তবে খুব চড়া লালের বদলে তাঁর পছন্দ একটু নরম ধাঁচের লাল রং। সঙ্গে সাদা শাড়ি, হালকা মেকআপে আলিয়া বুঝিয়েছেন, রেড লিপস স্নিগ্ধও হতে পারে।
কৃতি খরবন্দা
কৃতির পছন্দের রেড লিপস আবার টুকটুকে লাল নয়। তিনি বেছে নিয়েছেন চেরিফলের লাল রং। সঙ্গে শিমারি গোল্ডেন গাউন, ভিজে ভাব ফুটিয়ে তোলা ডিউয়ি মেকআপ আর খোলা চুলে তাঁকে দেখাচ্ছে হলিউডের নায়িকাদের মতো।
কিয়ারা আডবাণী
কিয়ারা আডবাণীর সাজ মানে তা হতেই হবে অঙ্ক কষা নিখুঁত। কোথাও এক চুল ভুলচুক হওয়ার জো নেই। সেই তিনি যখন লাল ঠোঁটে ধরা দেন, তখন সেই সাজে এক অদ্ভুত পরিচ্ছন্নতা ফুটে ওঠে। কিয়ারার পছন্দ সাধারণত ‘পপি রেড’ বা টকটকে লাল রঙ। তাঁর উজ্জ্বল গমরঙা মসৃণ ত্বকের ক্যানভাসে সেই টকটকে লাল ঠোঁট ‘শো স্টপার’ হয়ে বিরাজ করে। ভারী মেকআপ ছাড়াই কেবল ঠোঁটের জাদুতে ফুটে ওঠে রানির মেজাজ।
কৃতি শ্যানন
কৃতি শ্যাননের রেড লিপ বাকিদের থেকে আলাদা ভাবে ধরা দেয় টেক্সচারে। তাঁর ঠোঁটে লালিমায় শুধু রঙের বিশেষত্ব নয়, তার সঙ্গে রয়েছে মখমলের অনুভব। কৃতির ‘রিচ ভেলভেটি টোন’ রেড লিপস নায়িকার ধারালো মুখের সঙ্গে এক অদ্ভুত মার্জিত ভারসাম্য তৈরি করে। কৃতি সেই ভারসম্যের দাঁড়িপাল্লা আরও সমান সমান করেন গালে-কপালে হালকা ঝিকমিকে অভ্রকণার মতো ঔজ্জ্বল্যে।
তৃপ্তি ডিমরী
তৃপ্তি ডিমরীর সাজে এক রকমের রহস্যময়ী ভাব থাকে। তবে রেড লিপস সম্ভবত উপরের সব নায়িকার থেকে তাঁরই বেশি পছন্দের। প্রায়শই লাল ঠোঁটে দেখা যায় এই বলিসুন্দরীকে। ইদানীং তিনি চড়া লালের বদলে ডার্ক বা ‘মুডি’ রেড টোন নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করছেন। তাতে তাঁর সাজে একরকম ধারালো ভাব আসছে। শুধু তা-ই নয় এ দেশীয় নায়িকার প্রথাগত মিষ্টি মিষ্টি ভাব কাটিয়ে খানিক খলনায়িকা সুলভ লুকও তৈরি করছে তৃপ্তির লাল ঠোঁট।