Advertisement
E-Paper

ডায়াবিটিজ় থেকে সতর্ক

দিনদিন বাড়ছে ডায়াবিটিজ়ে আক্রান্তের সংখ্যা। এই পরিস্থিতিতে সুস্থ জীবনযাত্রা, ঠিক খাদ্যাভ্যাস ও শরীরচর্চাই হতে পারে বাঁচার উপায়। জানাচ্ছেন চিকিৎসক সত্যসুন্দর নন্দীদিনদিন বাড়ছে ডায়াবিটিজ়ে আক্রান্তের সংখ্যা। এই পরিস্থিতিতে সুস্থ জীবনযাত্রা, ঠিক খাদ্যাভ্যাস ও শরীরচর্চাই হতে পারে বাঁচার উপায়।

শেষ আপডেট: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ ০১:০৮
ডায়াবিটিজ়ে বাড়তে পারে অন্য সমস্যাও। তাই দরকার নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষার, মত চিকিৎসকের। ছবি: অভিজিৎ সিংহ

ডায়াবিটিজ়ে বাড়তে পারে অন্য সমস্যাও। তাই দরকার নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষার, মত চিকিৎসকের। ছবি: অভিজিৎ সিংহ

প্রশ্ন: ডায়াবিটিজ় বা মধুমেহ রোগ আসলে কী?

ডায়াবিটিজ় বা মধুমেহ এমন একটি রোগ যাতে রক্তে শর্করার পরিমাণ নির্দিষ্ট মাত্রা থেকে বেড়ে যায়। খালি পেটে ১১০ মিলিগ্রাম প্রতি ডেসিলিটার এবং খাওয়ার দু’ঘন্টা পরে বা ৭৫ গ্রাম গ্লুকোজ খাওয়ার ২ ঘন্টা পরে ১৪০ মিলিগ্রাম প্রতি ডিসিলিটার থেকে বেশি মাত্রায় শর্করা পাওয়া গেলে ডায়াবিটিজ়ে আক্রান্ত বলা হয়।

প্রশ্ন: ডায়াবিটিজ় কেন হয়?

আমাদের শরীরে শর্করার মাত্রা, অগ্ন্যাশয় থেকে নিঃসৃত ইনসুলিন নামে একটি হরমোন নিয়ন্ত্রণ করে। কোনও কারণে শরীরে ইনসুলিনের মাত্রা কমে গেলে অথবা ইনসুলিন ঠিক মতো কাজ করতে না পারলে ডায়াবিটিজ় হয়।

প্রশ্ন: এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার কি কোনও নির্দিষ্ট বয়স আছে?

ডায়াবিটিজ় দু’প্রকারের হয়। প্রথমটি, টাইপ ওয়ান ডায়াবিটিজ় (IDDM) অথবা জুভেনাইল ডায়াবিটিজ়। এই রোগে জন্ম থেকেই রোগীর শরীরে ইনসুলিন তৈরি হয় না। খুব অল্প বয়সেই ডায়াবিটিজ় ধরা পড়ে। এ ক্ষেত্রে ছোট থেকেই ইনসুলিন নিতে হয়। অপর প্রকার হল, ডায়াবিটিজ় টাইপ টু (NIDDM), যা বয়সের সঙ্গে সঙ্গে শরীরে কোনও কারণে ইনসুলিনের ঘাটতি হলে দেখা দেয়। এ ক্ষেত্রে ওষুধ অথবা ক্ষেত্র বিশেষে ইনসুলিন নিতে হয়।

প্রশ্ন: ডায়াবিটিজ়ের প্রাথমিক লক্ষণগুলি কী কী?

এই রোগের প্রধান লক্ষণ বারবার প্রস্রাব হওয়া। এ ছাড়া, তেষ্টা বেড়ে যাওয়া, হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া, মাথা ঘোরা, অল্পেই ক্লান্ত হয়ে পড়া, শরীরের কোনও জায়গা কেটে গেলে ক্ষতস্থান শুকোতে দেরি হওয়া, ঘন ঘন অসুস্থ হয়ে পড়া, বিভিন্ন স্থানে ফোঁড়া, ঘা বা অ্যালার্জি—এ সবই ডায়াবিটিজ়ের প্রাথমিক লক্ষণ।

প্রশ্ন: ডায়াবিটিজ় ধরা পড়লে কী কী করণীয়?

ডায়াবিটিজ়ের প্রধান চিকিৎসা খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন ও নিয়ন্ত্রণ। মিষ্টি, গুড়, চিনি, আলু খাওয়া বন্ধ করা, বেশি ক্যালোরি এবং শর্করাযুক্ত খাবার খাওয়া নিয়ন্ত্রণ করা, প্রোটিনযুক্ত খাবার খাওয়া, নিয়মিত ব্যায়াম, হাঁটা ও ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখাও জরুরি।

এ ছাড়া, প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ মতো ওষুধ খেতে হবে। বতর্মানে মেটফরমিন, বিভিন্ন সালফোনিল ইউরিয়া (যেমন গ্লাইক্লাজাইড, গ্লিমিপ্রাইড, গ্লিপিজাইড) ও বিভিন্ন গ্লিপটিন জাতীয় ওষুধ পাওয়া যায়, যা বেশ কার্যকরী। আর প্রয়োজনে ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে ইনসুলিন তো আছেই।

প্রশ্ন: ভাত, আলু, রুটি—তিন ধরনের খাবারই তো শর্করা। তবে রাত্রে ভাত, আলুর পরিবর্তে কেন রুটি খেতে বলা হয়?

এ ক্ষেত্রে জানা জরুরি যে, ভাত, আলু বা মিষ্টি খাওয়ার পরে তা অতি দ্রুত রক্তে মিশে যায় এবং হঠাৎ করে রক্তে শর্করার পরিমাণ বেড়ে যায়। এই বাড়তি শর্করাকে কোনও ডায়াবিটিজ় আক্রান্ত রোগীর শরীর নিঃসৃত ইনসুলিন (যা সুস্থ মানুষের থেকে কম থাকে) কমাতে পারে না। কিন্তু রুটিতে যে পরিমাণ শর্করা থাকে, তাতে রক্তে শর্করার পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়ে। ফলে ওই সময়ে রোগীর শরীর নিঃসৃত ইনসুলিন ওই শর্করার কমাতে সময় পায় এবং শর্করার পরিমাণও নিয়ন্ত্রণে থাকে।

প্রশ্ন: ইনসুলিন নিয়েও অনেকের নানা ধরনের প্রশ্ন থাকে। যেমন, ইনসুলিন কি জীবনভর নিতে হবে বা দীর্ঘদিন নিলে কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনা আছে কিনা। এ বিষয়ে কী বলবেন?

টাইপ ওয়ান ডায়াবিটিজ় রোগীদের ক্ষেত্রে জীবনভর ইনসুলিন নিতেই হবে। টাইপ টু ডায়াবিটিজ় রোগীদের ক্ষেত্রে কী কারণে ইনসুলিন দেওয়া হচ্ছে, তা দেখতে হবে। অনেক সময়ে অপারেশনের আগে এবং ডায়াবিটিজ় আছে এমন রোগীর গর্ভাবস্থায় সাময়িক ভাবে কিছু দিনের জন্য ইনসুলিন দেওয়া হয়। অপারেশনের পরে বা প্রসবের পরে ইনসুলিন বন্ধ করে রোগী আবার মুখে ডায়াবিটিজ়ের ওষুধে ফিরে যেতে পারেন। কিন্তু কিছু টাইপ টু ডায়াবিটিজ় রোগীর ক্ষেত্রে ওষুধ খেলেও শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে আসে না। সে ক্ষেত্রে ইনসুলিন নেওয়া ছাড়া কোনও উপায় থাকে না। তবে এতে কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয় না।

প্রশ্ন: ডায়াবিটিজ় রোগীদের কী কী সাবধানতা মেনে চলা উচিত?

ডায়াবিটিজ় রোগীদের নিয়ন্ত্রিত খাওয়া, ব্যায়াম এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মতো নিয়মিত ওষুধ খেতেই হবে। এ ছাড়া যদি চোখে অসুবিধা, পা ফোলা, হাত-পায়ে অসাড় ভাব দেখা যায়, সময় নষ্ট না করে চিকিৎসককে জানানো উচিত। কারণ ডায়াবিটিজ়ে চোখ, স্নায়ু এবং কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ ছাড়া যদি কোনও ঘা হয়, তা একেবারেই অবহেলা করা উচিত নয়। কারণ, অনেক ক্ষেত্রে এমন ঘা ‘গ্যাংগ্রিন’-এ পরিণত হতে পারে। এ ছাড়া, অনেক সময়ে ওষুধের পরিমাণ বেশি হলে অথবা সময়মতো ওযুধ না খেলে হঠাৎ করে রক্তে শর্করার পরিমাণ কমে যেতে পারে। এই অবস্থাকে ‘হাইপোগ্লাইসিমিয়া’ বলে। মাথা ঘোরা, হাত পা ঝিমঝিম করা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া—এসবই লক্ষণ। এমন অবস্থায় রোগীকে অবিলম্বে হাসপাতালে স্থানান্তরিত করতে হবে।

প্রশ্ন: ডায়াবিটিজ়ের রোগীরা কি ফল খেতে পারেন? অনেকেই আম, আপেল, কলার মতো বেশ কিছু ফল খেতে নিষেধ করেন?

ডায়াবিটিজ় রোগীদের মিষ্টি ফল খাওয়া উচিত নয়। তবে শশা, পেয়ারার মতো ফলগুলি খাওয়া যেতে পারে।

প্রশ্ন: ডায়াবিটিজ় রোগীদের কি প্রতি দিন হাঁটা খুব প্রয়োজন? হাঁটা কি সকলের জন্যই প্রযোজ্য?

শরীরের অতিরিক্ত মেদ ঝরানোর জন্য হাঁটা অবশ্যই দরকার। বেশ জোরে হাঁটতে হবে, যাতে ঘাম ঝরে। তবে পায়ের কোনও সমস্যা, বাত, হার্ট অথবা অন্য কোনও অসুখের জন্য হাঁটতে না পারলে বাড়িতেই হালকা ব্যায়াম করা যেতে পারে।

প্রশ্ন: হাঁটা ছাড়া আর কী ধরনের ব্যায়াম বা জীবনযাত্রায় কী ধরনের পরিবর্তন করা যেতে পারে?

খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন সবার আগে জরুরি। মিষ্টি জাতীয় খাবার, ‘ফাস্টফুড’ খাওয়া চলবে না। টেনশন থেকে দূরে থাকতে হবে। শাক-সবজি বেশি করে খাওয়া দরকার। বিশেষ করে এক বারে বেশি না খেয়ে বারে বারে অল্প অল্প করে খাওয়া উচিত। সবচেয়ে বড় কথা, চাপমুক্ত থাকতে হবে। ডায়াবিটিজ় হয়েছে বলে ভেঙে পড়ার কিছু নেই।

প্রশ্ন: দীর্ঘদিন ডায়াবিটিজ়ে ভুগলে কী ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে?

দীর্ঘদিন ডায়াবিটিজ়ে ভুগলে প্রধানত চোখ, নার্ভ এবং কিডনির সমস্যা দেখা দেয়। এ ছাড়া হার্ট, লিভার, হাড়ের জয়েন্টে ব্যথা, কোলেস্টেরল বেড়ে যাওয়া—এমন সমস্যাগুলি দেখা দিতে পারে।

প্রশ্ন: অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ডায়াবিটিজ়ের রোগীরা চিকিৎসার পরে খুব রোগা বা মোটা হতে থাকেন। এর কারণ কী?

কিছু কিছু রোগী ভয়ে এবং চিন্তায় এত বেশি খাওয়া নিয়ন্ত্রণ করেন যে, ওজন অতিরিক্ত কমে যায়। এ ছাড়া কিছু ওষুধ, যেমন— মেটফরমিন জাতীয় ওষুধের মাত্রা খুব বেশি হলে ওজন কমতে পারে। আবার, ডায়াবিটিজ়ের সঙ্গে কোলেস্টেরল বা থাইরয়েডের সমস্যাও থাকলে ওজন বাড়তে পারে। কিছু ওষুধ, যেমন— পায়োগ্লিটাজন জাতীয় ওষুধে ওজন বাড়তে পারে। এ সব ব্যাপারে চিকিৎসকের সঙ্গে অতি অবশ্যই যোগাযোগ করা উচিত।

প্রশ্ন: গর্ভাবস্থায় কি ডায়াবিটিজ় হতে পারে? হলে কী সমস্যা হয়? কী ভাবে এড়ানো সম্ভব?

গর্ভাবস্থায় ডায়াবিটিজ় হতে পারে। এ সব ক্ষেত্রে মায়ের পেটের ভেতরেই বাচ্চার ওজন অত্যধিক বাড়তে থাকে এবং নানা জটিল রোগ নিয়ে বাচ্চা জন্মাতে পারে। প্রসবের সময়েও নানা জটিলতা দেখা দেয়। এ জন্য গর্ভাবস্থায় রোগীর ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, ঠিক খাদ্যাভ্যাস, বাচ্চার ক্ষতি না হয় এমন হালকা ব্যায়াম এবং হাঁটা জরুরি। প্রয়োজনে প্রসব না হওয়া পর্যন্ত ইনসুলিন দেওয়া যেতে পারে।

প্রশ্ন: যোগ ব্যায়ামে কি ডায়াবিটিজ় নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব?

যে কোনও ব্যায়ামই ডায়াবিটিজ়ের পক্ষে ভাল আর যোগ ব্যায়াম অবশ্যই উপকারী। কিছু কিছু যোগ ব্যায়াম ডায়াবিটিজ় নিয়ন্ত্রণে কাজ দেয়। তবে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মেনেই ব্যায়াম করা উচিত।

প্রশ্ন: আমাদের দেশে ডায়াবিটিজ় রোগীর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এক জন চিকিৎসক হিসেবে আপনি এই রোগ থেকে দূরে থাকতে কী পরামর্শ দেবেন?

সুস্থ খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা এবং নিয়মিত ব্যায়াম করা দরকার। বাচ্চাদেরও বেশি মিষ্টি বা বেশি ক্যালোরিযুক্ত খাবার থেকে দূরে রাখুন। মোবাইলে গেম খেলার পরিবর্তে মাঠে খেলতে নিয়ে যান, শরীরচর্চার অভ্যাস গড়ে তুলুন। সকলের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, শরীর সচল রাখা এবং স্বাস্থ্যকর ও ঠিক ক্যালোরিযুক্ত খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন।

সাক্ষাৎকার: রাজদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

Health Diabetes
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy