বাড়ির ঠিকানা কিংবা বাজারের হিসাব, বারবার লিখেও মনে রাখা কঠিন হয়ে উঠেছে বরাহনগরের বছর পঁয়ষট্টির ডাক বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত কর্তা অসীম হালদারের। বহু চেষ্টা করেও পেন্সিল দিয়ে সাদা কাগজে গোলাকার বৃত্ত আঁকতে পারছেন না সত্তরোর্ধ্ব সুতপা সাহা।

নিজের নাম, কোথায় থাকেন আপাত এই সহজ বিষয়গুলি অসীমবাবু কিংবা সুতপাদেবীর মতো অনেক প্রবীণই ভুলে যাচ্ছেন। যার জেরে খিটখিটে এবং অসহিষ্ণু হয়ে উঠছেন তাঁরা। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই রোগের নাম স্মৃতিভ্রংশ (ডিমেনশিয়া)। ভুক্তভোগী অনেকে হলেও এই রোগের চিকিৎসার সুযোগ কিন্তু বিশেষ নেই। এ বার কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগে দেশের ১৩টি মেডিক্যাল কলেজ এ নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী কাজ শুরু করল। স্মৃতিভ্রংশের রোগীদের চিহ্নিত করে তাঁদের উপসর্গ জেনে তথ্য তৈরি ও বিশ্লেষণের কাজ হবে। পূর্ব ভারতে এ কাজের দায়িত্ব পেয়েছে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। এই প্রকল্পে যুক্ত চিকিৎসকদের আশা, রোগীদের চিকিৎসা সংক্রান্ত দিকটিও নতুন দিশা পাবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মস্তিষ্কের কাজ কমে গেলে এই রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। কিন্তু কী কী কারণে এই সমস্যার ঝুঁকি বাড়ে সে নিয়েও কোনও স্পষ্ট ধারণা নেই। এই সমস্যায় আক্রান্তদের কেউ হৃদ্‌রোগের সমস্যায়, আবার কেউ স্নায়ুর সমস্যায় আক্রান্ত থাকেন। কিন্তু এই সমস্যার সঙ্গে কী ধরনের শারীরিক সমস্যা জড়িয়ে সে নিয়েও স্পষ্ট কিছু বোঝা যায় না।

কেন্দ্রীয় সরকারের ডায়াগনস্টিক অ্যাসেসমেন্ট অব ডিমেনশিয়া (ডিএডি) নামের এই গবেষণার কাজে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন, সাইকায়াট্রি এবং স্নায়ু বিভাগের চিকিৎসকেরা যুক্ত রয়েছেন। মেডিক্যাল কলেজ সূত্রের খবর, কেন্দ্রের জনগণনা রিপোর্টের সাহায্য নিয়ে ৩০০০ মানুষকে নির্বাচন করা হয়েছে। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জীবনযাপনের ধারা, শারীরিক সমস্যা সম্পর্কে তথ্য জোগাড় করা হবে। নির্বাচিতদের মধ্যে যাঁদের স্মৃতিভ্রংশ হয়েছে, তাঁদের ও অন্যদের তথ্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে উপসর্গের রূপরেখা তৈরি করা হবে।

এ কাজে যুক্ত কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক অরুণাংশু তালুকদার বলেন, ‘‘বহু মানুষ এই সমস্যায় ভুগছেন। দেখা যাচ্ছে, পুরুষদের সমস্যা বেশি। এখনও এই চিকিৎসার স্পষ্ট দিশা নেই। উপসর্গের তালিকা তৈরি করতে পারলে ঝুঁকির মাত্রা বোঝা যাবে। মানুষের আয়ু বেড়েছে। সেই নিরিখে জীবনের গুণমান বজায় রাখাও জরুরি।’’

ইতিমধ্যেই হাওড়া, হুগলি, বর্ধমান-সহ একাধিক জেলায় তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু হয়েছে। বিভিন্ন প্রশ্নের মাধ্যমে নমুনা সংগ্রহের কাজ চলছে। এই গবেষণায় যুক্ত দিল্লি এইমস হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অপরাজিত দে বলেন, ‘‘দীর্ঘ সময় ধরে সমীক্ষার ফলে ভারতে বার্ধক্যে মানুষের কী কী প্রভাব ফেলে সেগুলি বোঝা যাবে। স্মৃতিভ্রংশের মতো সমস্যায় সমীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।’’