চোখের পাতার উপরে বা নীচের কোণের দিকে সাদা বা হলদেটে ছোপ ছোপ দাগ বেশ পরিচিত। একটু বয়স্কদের মধ্যে তো বটেই, অনেক সময়ে কমবয়সিদের মধ্যেও একই উপসর্গ দেখা যায়। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় বলে জ়্যান্থেলাসমা। এর কারণ হিসেবে আমরা সকলেই কমবেশি জানি, শরীরে লিপিড প্রোফাইলের তারতম্য। ডিসলিপিডেমিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের প্রায় ৫০ শতাংশের চোখের কোণায় এই ছোপ ধরে। রক্তে লিপিডের মাত্রা বেড়ে গেলে সেই সব রোগীদের হৃদ্রোগের সম্ভাবনা বেশ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এটি কেন হয়, কী ভাবেই বা তুলবেন, তা জেনে নেওয়া যাক।
জ়্যান্থেলাসমা কেন দেখা দেয়?
শরীরে লিপিডের মাত্রার তারতম্য দেখা দিলে অনেকেরই চোখের কোণে পাতলা চামড়ার স্তরের ঠিক নীচে কোলেস্টেরল ক্রিস্টালস জমতে আরম্ভ করে। কখনও চোখের উপরের পাতায় বেশি, কখনও আবার চোখের কোলের কাছেও এই ডিপোজ়িশন হতে পারে। তখনই জ়্যান্থেলাসমা প্রকট হয়ে ওঠে। এটি রিমুভালের বিশেষ পদ্ধতি রয়েছে। তবে এই ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে গোড়ার কারণটি নির্ণয় করে সেই মতো চিকিৎসা জরুরি।
কেন হয় জ়্যান্থেলাসমা?
অকুলোপ্লাস্টি সার্জন ডা. জয়িতা দাস জানালেন, এই ধরনের রোগী যখনই তাঁদের কাছে আসেন, প্রথমেই ফাস্টিং লিপিড প্রোফাইল টেস্ট করাতে দেওয়া হয়। তাঁর কথায়, “যদি ধরা পড়ে যে রোগীর লিপিড প্রোফাইল ইরেগুলার, তখনই আমরা তাঁকে ফিজ়িশিয়ানের কাছে পাঠিয়ে আগে লিপিড প্রোফাইল ঠিক করি। এর সঙ্গে দেখতে হয়, সেই ব্যক্তির থাইরয়েড বা ডায়াবিটিস আছে কি না। কারণ প্রত্যেকটিই একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত। জ়্যান্থেলাসমা হল হিমশৈলের চূড়া। শরীরে ট্রাইগ্লিসাইড বা এলডিএল-এর মাত্রা বেশি থাকার ইঙ্গিত এটি, যা হৃদ্রোগ ডেকে আনতে পারে। কাজেই জ়্যান্থেলাসমা রিমুভ করার চেয়েও কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা বেশি জরুরি।”
তবে সব সময়ে যে কোলেস্টেরলের উচ্চ মাত্রাই চোখের কোণে ক্রিস্টাল জমার জন্য দায়ী, এমনটা নয়। কারও কারও ক্ষেত্রে জিনগত কারণেও এই কোলেস্টেরল ক্রিস্টালস জমতে পারে। বয়সের কোঠা তিরিশ পেরোনোর আগে থেকেই অনেকের চোখে জ়্যান্থেলাসমার উপসর্গ দেখা যায়। তাঁদের শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা হয়তো স্বাভাবিক, তবুও এই ডিপোজ়িশন হয়। কাজেই লিপিড প্রোফাইল টেস্ট ছাড়া আসল কারণটি নির্ণয় করা সম্ভব নয়। যাঁদের পরিবারের অন্যদের উচ্চ রক্তচাপ বা কোলেস্টেরলের সমস্যা রয়েছে, সেই সব ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট সময় অন্তর মেডিক্যাল স্ক্রিনিংয়ের মধ্যে থাকতে হয়।
জ়্যান্থেলাসমা অনেক সময়ে রেটিনার উপরেও প্রভাব ফেলে। রেটিনার ব্লাড ভেসেলে কোলেস্টেরল ডিপোজ়িট হয়ে ছোটখাটো স্ট্রোক হতে পারে।
চিকিৎসা পদ্ধতি
কোলেস্টেরল ক্রিস্টালগুলির আকার, গভীরতা ও কোথায় হয়েছে দেখে তবেই এগুলি পরিষ্কার করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর পাশাপাশি আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল স্কিন ল্যাক্সিটি, অর্থাৎ রোগীর ত্বকের বাঁধুনি কতখানি। কমবয়সিদের টাইট স্কিন ও বয়স্কদের ঝুলে যাওয়া চামড়ার ক্ষেত্রে রিমুভালের পদ্ধতি আলাদা হয়। এ ছাড়া চোখের উপরের পাতা না নীচের পাতা, রিমুভ করার আগে সেটিও বিচার করে দেখেন চিকিৎসকেরা। “একটু বয়স্কদের ক্ষেত্রে, অর্থাৎ ৫৫-৬০ বছর বয়সি রোগীদের ক্ষেত্রে ব্লেফারোপ্লাস্টি করে থাকি আমরা, যেখানে আপার আইলিডের স্কিন, ফ্যাট রিমুভ করা হয়। এ ক্ষেত্রে ইনসিশনের সময়েই এই জ়্যান্থেলাসমা রিমুভ করে দেওয়া যায়। আবার কমবয়সিদের ক্ষেত্রে অন্য পদ্ধতি নেওয়া হয়,” বললেন ডা. দাস। তিনি জানালেন, কোনও কোনও রোগী যেমন সরাসরি সার্জারির পথ বেছে নেন, আবার কেউ কেউ লেজ়ার ট্রিটমেন্ট, কার্বন-ডাই-অক্সাইড, কেমিক্যাল পিলিং কিংবা প্লাজ়মা থেরাপির সাহায্য নেন। বিশেষ করে কমবয়সিরা এই নন-সার্জিক্যাল পদ্ধতি বেছে নেন সাধারণত।
খরচ কেমন?
সাধারণত অকুলোপ্লাস্টি সার্জন, কসমেটিক সার্জন উভয়েই এই ধরনের চিকিৎসা করে থাকেন। সার্জিক্যাল পদ্ধতিতে জ়্যান্থেলাসমা রিমুভ করলে অকুলোপ্লাস্টি সার্জনদের কাছে যাওয়াই দস্তুর। আবার যদি কেউ লেজ়ার, কার্বন-ডাই-অক্সাইড, প্লাজ়মা কিংবা কেমিক্যাল পিলিং-এর সাহায্যে এই রিমুভাল করান, তা হলে কসমেটিক সার্জন কিংবা ডার্মাটোলজিস্টদের কাছে যেতে পারেন। সার্জারির ক্ষেত্রে প্রধানত একবারেই রিমুভাল হয়ে যায়। খরচ আনুমানিক ২৫-৩০ হাজার টাকার মধ্যে। অন্য দিকে নন-সার্জিক্যাল পদ্ধতিতে একাধিক সিটিং দরকার হয়। ইঞ্জেক্টেবল মেডিসিন প্রয়োগ করে যে রিমুভাল ট্রিটমেন্ট চলে, সেখানে প্রতি সিটিং-এ ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা বা তার বেশিও খরচ হতে পারে।
জ়্যান্থেলাসমা দৃষ্টিশক্তিতে সরাসরি প্রভাব ফেলে না। তবে এটি রিমুভ করার পাশাপাশি এর মূল কারণ অর্থাৎ রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করাও প্রয়োজন।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)