Advertisement
E-Paper

নির্জনতা নেই, নেই নিঃসঙ্গকে জড়িয়ে ধরাও

তাঁর মেকআপ, লিপস্টিক সব ধুইয়ে দিচ্ছে ধরে না রাখতে পারা জলস্রোত।

ঈশানী দত্ত রায়

শেষ আপডেট: ০৫ অগস্ট ২০১৮ ০১:১৯
ছবি: সুমন বল্লভ

ছবি: সুমন বল্লভ

দৃশ্যটা অপ্রত্যাশিত। মেট্রোয় নিম্নবিত্ত যুবতীর মাথায়, গালে হাত বোলাতে বোলাতে অঝোরে কাঁদছেন সুবেশা, মধ্যবিত্ত মধ্যবয়সী। তাঁর মেকআপ, লিপস্টিক সব ধুইয়ে দিচ্ছে ধরে না রাখতে পারা জলস্রোত।

কাঁধে ব্যাগ, কোলে ক’দিনের শিশু— ওই যুবতীকে দেখে সিট ছেড়ে দিয়েছিলেন এক জন। বাচ্চাটাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছিল অসুস্থ। সহযাত্রিণী তাই জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘সঙ্গে কেউ নেই?’ জানা গেল, মা একাই বাচ্চাকে নিয়ে হাসপাতালে যাচ্ছেন। স্বামী বা অন্য কেউ সঙ্গে যাচ্ছেন কি না, সে সব প্রশ্নে উত্তর আদৌ সুখকর নয়। বলতে বলতেই মেয়েটি কাঁদতে শুরু করলেন, বাচ্চাটি বাঁচবে কি না, মায়ের চিন্তা সেটাই... হঠাৎই দেখলাম, সামনে দাঁড়ানো সুবেশাও কাঁদছেন, যুবতীর হাতে কিছু টাকাও গুঁজে দিলেন। মেয়েটি নেবেন না। মাথায় হাত বুলিয়ে টাকা নেওয়ালেন তিনি। আশপাশের সকলেই সজল।

যে শহরে পাশের ফ্ল্যাটে মরে পড়ে থাকলে জানা যায় দুর্গন্ধ বেরোনোর পরে, মেট্রোয় সকলেই ইয়ার ফোন, মোবাইলের স্ক্রিনে ব্যস্ত। টিকিট কেটে, অনেক লোকের ধাক্কা খেয়েও যে প্ল্যাটফর্ম থেকে অনায়াসে আত্মহত্যা করা যায় নিজস্ব জগতে নিমগ্ন থেকে, সেখানে এই দৃশ্য মুছল হয়তো কিছু নিঃসঙ্গতাও। ভিড়ের মধ্যেও একা হয়ে থাকার পরে হাতে হাত রেখে কাঁদার একাত্মবোধে। নিম্নবিত্ত মেয়েটির শিশুকে বুকে নিয়ে একা হয়ে যাওয়ার নীরব যাত্রাটা হয়তো বুঝতে পারা গেল। কিন্তু যে মধ্যবিত্ত রমণী কাঁদলেন হাউহাউ করে, তাঁর সহমর্মিতা, না অন্য চাপা দুঃখ? যশোধরা রায়চৌধুরী ‘ঐ যে ও: পাতালপ্রবেশপূর্বে সীতা’তে লিখেছিলেন— ‘সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউ থেকে কাদা পা জল পা টেনে নিয়ে কিউতে দাঁড়াচ্ছে, পাশে আমরা সব: অপরিচিত, অপরিচিতা..... দ্রুত নেমে গিয়ে নিচে,...এক কোণায় গিয়ে বসবে, তারপর ঠান্ডা দু’চোখ বুজে নেবে, পালাবে সমস্ত দৃশ্য থেকে...’।

লোকাল ট্রেনে এমন দৃশ্যকল্প সহজে বা চট করে আসে না।। ‘আসবে কখন? কিছু বলেছে? না। রোজই ট্রেনের ঝক্কি একই রকম।’ ... এমন টুকরো কথা, মৃদু পরিচিতির হাসিতে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে যে সূত্রপাত, তা-ই নিত্য যাত্রায় হয়ে দাঁড়ায় বন্ধন। অন্তত সহমর্মিতা, বেশ কয়েক দিন না দেখলে উদ্বেগ। মেট্রোয় তা হওয়ার সুযোগ নেই। দুই মেয়ের কান্নায় ভাসাভাসি দেখে তাই মনে হয়েছিল অপ্রত্যাশিত।

মনে হয়েছিল। কারণ, নির্জনতার জায়গা, সলিটিউডের জায়গা, একক থাকার জায়গাটা দিতে চায় না, বুঝতে চায় না বলেই হয়তো এ শহরে মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্তের নিঃসঙ্গতা বাড়ছে। কফিশপ বা বইয়ের দোকানে একক ভাবে মগ্ন থাকার সুযোগ এখানে কোথায়? নিজের মতো থাকব, নিজের সঙ্গে থাকব, এই একক নির্জনতার স্বাধীনতাও নেই কিন্তু নিঃসঙ্গকে জড়িয়ে ধরতেও ভুলে যাচ্ছে।

বাড়ি নেই, বাগান নেই, আড়ালে থাকার মতো ছাদ নেই, ধরে দাঁড়ানোর মতো একান্ত গেট নেই। হাত ধরতে চাওয়ার জন্য ছড়িয়ে যাওয়া নয়, কেবলই খোপ-খোপ করে আকাশের দিকে উঠে যাওয়া আর তা থেকে ঝাঁপ দেওয়ার মতো বহুতল-সর্বস্ব হতে চাওয়া শহর একা করে দিতে পারে একককে। এবং বহুকেও। বলার কেউ নেই, আড্ডা, বন্ধু, ক্লাবে হুড়োহুড়ির মধ্যেও লুকিয়ে রাখতে হয় যে নিঃসঙ্গতা, তা কি নেহাতই নাগরিক? হয়তো। হয়তো নয়। অপমান, লাঞ্ছনা, মারধর দেখে এড়িয়ে যাওয়া বা কিছু না জেনেই দু’ঘা লাগানোর মধ্যেও একা হয়ে যাওয়া থাকে। একা এবং কয়েকজনের।

বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজের সামনে দিয়ে যে রাস্তাটা চলে গিয়েছে, সে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে হাঁটতে একদিন মনে হয়েছিল, সুজাতা গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘দীর্ঘ, বড় দীর্ঘ ছিলো শীত, রুক্ষ, বড়ো রুক্ষ ছিলো পথ-ও’...। অথচ বেশ কয়েক বছর পরে তার খুব কাছে ডিসেম্বরের এক বিকেলে চলছিল গণেশ পাইনের প্রদর্শনী। সেখানে বড় বড় করে লেখা ছিল, ‘জীবন যে নশ্বর, তা-ই শুধু নয়, একে শেষ করে দিতে হয়। নিঃশেষ হয়ে যাওয়াটাও একটা শর্ত!’ এক সাক্ষাৎকারে যে কথা বলেছিলেন শিল্পী। মহাভারত নিয়ে তাঁর ছবি আর কথাগুলো দেখে বেরিয়ে আসার পথে প্রথম অনুভব করেছিলাম নির্মোহ আনন্দ, চারদিকের আলো, জনপথ, ভিড়ের মধ্যেও।

শহর যে কত ভাবে সুযোগ দেয় দেয় জীবনে জীবনে যোগ করার। পুজোর যে পাগলপারা ভিড় দেখে ভাবা যায় হুজুগ, রাস্তার দু’ধারে খাওয়ার অনর্গল আয়োজনে পেট গুলিয়ে ওঠে। কিন্তু ভাল করে ভাবলে? এত কষ্ট, সমস্যা, তবু ক’টা দিন সব ভুলে পথে নেমে পড়া। হুজুগই সই। বজ্রে তোমার বাজে বাঁশি তো নেহাত হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাওয়ার কথা নয়। সেই লড়াকু স্রোতের দিকে তাকিয়ে দেখলেও তো মনে হয়, আহা খুশি থাক। সুখী হোক। এ আমার লোক। এ আমরা।

এ-ই সে। আগুন যাকে পোড়াইতে পারে না। না হলে কেওড়াতলায় যাকে দিয়ে দিলাম আগুনে, ধাতব ঘটাং শব্দটা শাশ্বত হয়ে জীবনে ঢুকে গেল, বছর কয়েক পরেই দেখি, তাকে— মেট্রো থেকে নেমে হাঁটছে। মুখের ধাঁচ পাশ থেকে একইরকম। অন্ধের মতো চলেছি তার পিছনে। এখন মাঝেমধ্যেই দেখি এমন মুখ। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে নিজের মনে স্মিত হাসা যায়, হঠাৎ পাওয়া এমন মুখ।

সেই থেকে এ শহর সহ্য হয়ে গিয়েছে।

চতুরঙ্গে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘বন্ধন আমার নয় বলিয়াই কোনো বন্ধনকে ধরিয়া রাখিতে পারি না, আর বন্ধন তোমারই বলিয়াই অনন্ত কালে তুমি সৃষ্টির বাঁধন ছাড়াইতে পারিলে না। ...... ‘অসীম, তুমি আমার, তুমি আমার এই বলিতে বলিতে শচীশ উঠিয়া অন্ধকারে নদীর পাড়ির দিকে চলিয়া গেল।’

ভর দুপুরে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়েও নদী থাকে।

Loneliness
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy