E-Paper

বরযাত্রী, বেনারসি ও নহবতের গল্প

কোথাও বরযাত্রী যেত স্টিমারে চড়ে, কোথাও রথের মতো সাজানো হত ভিন্টেজ গাড়ি। কনের চুলে উঠত সোনা-রুপোর চিরুনি, বরের গলায় সাতনরি হার।

নবনীতা দত্ত

শেষ আপডেট: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:৩১
‘অপুর সংসার’।

‘অপুর সংসার’।

বরযাত্রী, ব্যান্ডপার্টি, বাসরঘর... বাঙালি বিয়ের সঙ্গে জুড়ে ছিল কত গল্পগাথা। সাবেক বিয়ের প্রসঙ্গ উঠলে কলকাতার অভিজাত পরিবারগুলির মধ্যে ঠাকুরবাড়ির কথাই উঠে আসে আগে। গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠ পুত্র গেহেন্দ্রনাথের বিয়ে। গগনেন্দ্রনাথের শৈল্পিক পরিকল্পনায় সেই বিয়ের আয়োজন পৌঁছেছিল এক অন্য উচ্চতায়। তখন বৈদ্যুতিক আলো ছিল না। গ্যাসের আলো, তেলের আলো দিয়েই রাস্তা থেকে বিবাহবাসর পর্যন্ত সাজিয়ে দিয়েছিলেন গগনেন্দ্রনাথ। মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখায় বিবরণ রয়েছে সে আলোকসজ্জার, “গগনেন্দ্রনাথ রাশি রাশি অভ্র কিনে মিস্ত্রি ডেকে তাদের দিয়ে নিজের মনের মতো করে কেটে শিসের পাত দিয়ে জুড়ে জুড়ে অতি সুশোভন খাস-গেলাস করেছিলেন। মিস্ত্রিরা তা লোহার বাঁকে গেঁথে পঞ্চাশজন বেহারার জন্য একশো বাঁক সাজিয়ে দিয়েছিলেন।” রাস্তার দু’পাশ ধরে সেই খাস-গেলাসের আলো যেন রাতকেও দিন বানিয়ে দিয়েছিল। আর ছিল বাঁধা রোশনাই। চিৎপুর রোডের বিত্তবান ও শৌখিন শ্যাম মল্লিক তাঁর ছেলে নন্দলালের বিয়েতে বাঁধা রোশনাই করেন। সেই আলো দেখতে ভিড় জমে গিয়েছিল।

আলোকমালায় সজ্জিত সেই রাস্তা দিয়ে বরযাত্রী আসত ব্যান্ডপার্টি নিয়ে। তখন লোবো সাহেবের ব্যান্ডপার্টির খুব নামডাক। তাদের ডাক পড়ল ঠাকুরবাড়ির বিয়েতে। গগনেন্দ্রনাথ বলে বসলেন ব্যান্ডপার্টিকে রবি ঠাকুরের গান বাজাতে হবে। কিন্তু সেই গানের নোটেশন কে তৈরি করে দেবে? শুধু নোটেশন তৈরি করে দিলেও তো চলবে না, গান হারমোনাইজ় করেদিতে হবে, সেটাই বা করবে কে? নোটেশন লিখে দিলেন রবীন্দ্রনাথ নিজে আর হারমোনাইজ় করে দিলেন ইন্দিরা দেবী। ঠাকুরবাড়ির বাগানেই চলতে লাগল গান তোলার মহড়া। বিয়ের দিন বরযাত্রীর সঙ্গে ব্যান্ডপার্টির সেই গান শুনে তাজ্জব কলকাতাবাসী। সেই ব্যান্ডপার্টির পিছনে বরের কালো ফিটন গাড়িটিও সাজানো হয়েছিল রুপোর পাতে মুড়ে, সামনে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল ঘোড়া।

ফুলসাজে

শুধু ঠাকুরবাড়িই নয়, কলকাতার অভিজাত পরিবারে বিয়েকে কেন্দ্র করে আড়ম্বর কম ছিল না। লাহাবাড়ির ছেলে অতীন লাহার কাছ থেকে জানা গেল তাঁর বাবা প্রফুল্লচরণ লাহার বিয়েতে ভিন্টেজ কার সাজানো হয়েছিল শ্রীকৃষ্ণের রথের আদলে। আবার লাহাবাড়ির ছেলে প্যারীচরণ ফুলসাজে মোড়া স্টিমারে চড়ে বিয়ে করতে গিয়েছিলেন চুঁচুড়ায়। ঘোড়ার গাড়ি করে বিয়ে করতে যাওয়ার চলও ছিল। সাতঘোড়ার গাড়ি থাকত কিছু জমিদারবাড়িতে। বর, নিতবর যেত সেই সাতঘোড়ার গাড়িতে। আর বরকর্তা যেত দু’ঘোড়ার গাড়িতে, বললেন পাথুরিয়াঘাটা মল্লিকবাড়ির মেয়ে সংযুক্তা চন্দ্র ও ধর বাড়ির ছেলে সুব্রত ধর।

বরপক্ষের আয়োজন যেমন এলাহি ছিল, আত্মীয়স্বজনকে আমন্ত্রণ করার ব্যবস্থাতেও কার্পণ্য ছিল না। আত্মীয়বাড়িতে বিয়ের ‘সন্দেশ’ পাঠাতে মোরাদাবাদি পিতলের উপরে মিনে করা থালা আনিয়েছিলেন গগনেন্দ্রনাথ। সেই থালায় সন্দেশ, নিমকি, কাপড় দিয়ে সাজিয়ে দিয়েছিলেন। এখন বিয়ের আমন্ত্রণপত্রেই সেই কাজ সারা হয়ে যায়। কলকা আঁকা বিয়ের কার্ডও বদলে গিয়েছে ই-কার্ডে। কিন্তু সে যুগে আমন্ত্রণপত্রেও নিজস্ব স্পর্শ রেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। বন্ধুবান্ধবকে বিয়ের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন কবিগুরু নিজে হাতে লেখা চিঠিতে।

চন্দনচর্চিত

বর-কনের সাজ ছিল আর এক অধ্যায়। কনের বসনে বেনারসি, ভূষণে সোনা ছিল সাবেক সাজের অঙ্গ। সে যুগে বেনারসি বোনা হত সোনা, রুপোর জরিতে। সেই সোনার জরির কাজ ঘন হত আঁচলে এসে। বেনারসির জায়গায় বালুচরি, স্বর্ণচরিতেও সেজেছে কনেরা। বসনে-ভূষণে জৌলুস থাকলেও কনের সাজ ছিল পরিমিত। চন্দন আর কাজলই মায়া তৈরি করে দিত কনের মুখে। ঠাকুরবাড়ির কনেদের চন্দন পরানো হত বিশেষ কায়দায়। প্রথমে চন্দন লেপে দেওয়া হত কপালে, তার পর সরু যশুরে চিরুনি দিয়ে সেই চন্দন আঁচড়ে দেওয়া হত। ডুরেকাটা চন্দনের উপরে আঁকা হত সিঁদুর-কুমকুমের টিপ। তবে বেশির ভাগ বঙ্গবধূর কপালে চন্দন পরানো হত লবঙ্গ দিয়ে।

‘অপুর সংসার’-এ অপর্ণার (শর্মিলা ঠাকুর) চন্দনচর্চিত ভ্রুযুগলের নীচে কাজলকালো সেই মায়াবী চোখ কি কেউ ভুলতে পারে? অথবা ‘সমাপ্তি’তে মৃণ্ময়ী (অপর্ণা সেন)? বিয়ের রাতে মৃণ্ময়ী যখন নিজের কান টেনে দেখছে, দুধওয়ালা হারানদার মতো, নতুন বর তার দুল টেনে কান ছিঁড়ে দিতে পারে কি না, তার কাজলকালো চোখে নববধূর সেই সন্দিহান দৃষ্টি কৌতুকের সঙ্গে নতুন জীবনের প্রতি কৌতূহলও এঁকে দিয়ে যায়। নববধূর কপাল জুড়ে চন্দনের কলকায় ধরা থাকে চিরন্তন গ্রামবাংলার ছবি। আসলে বাঙালি বিয়ের সঙ্গে জুড়ে-জুড়ে থাকে প্রকৃতি। সেখানে যেমন আছে অগ্নিসাক্ষী সপ্তপদী, লাজহোম, ফুলশয্যা, তেমনই চন্দনে ফুটে ওঠে গ্রামবাংলার কলমিলতা বা পদ্মকলির আলপনা, যা নববধূর নতুন জীবনের সূচনাসঙ্গী।

বরের পাঞ্জাবির গলায়, হাতাতেও ফুটে উঠত মাধবীলতা, পদ্মলতা। শীতকালে আবার বরের গায়ে উঠত দামি শাল। কবিগুরুর বিয়ের বর্ণনায় পাওয়া যায়, পাঞ্জাবির উপরে শালের সাজে বিবাহবাসরে এসেছিলেন তিনি। লাহাবাড়ির মেয়ে সুস্মেলী দত্তর কাছ থেকে জানা গেল, সুবর্ণবণিকদের মধ্যে আবার বরের সাজে কখনও কখনও পশ্চিমি ছোঁয়াচ চোখে পড়ত। তাদের বাড়ির বরের পরনে থাকত চোগা চাপকান, কোমর থেকে হাঁটু পর্যন্ত ঝোলানো তরোয়াল ভরা থাকত সোনার খাপে। মাথার পাগড়িতে হিরে, পান্না, চুনি... বুকে জড়োয়ার ব্রোচ। বরের কানেও থাকত বড় বালি বা দুল, তা দু’কানে ঢুকিয়ে পিছনে সরু সুতো দিয়ে বেঁধে দেওয়া হত। গলায় মুক্তো বা পান্না বসানো কলার, তার উপরে সাতনরি হার, মুক্তোর শেলী। সবশেষে একটা লম্বা মফচেন ঝুলত প্রায় হাঁটু পর্যন্ত।

কনের গয়নার ফিরিস্তি শুরু হলেও শেষ হওয়ার নয়। গলায় চোকার, মোহরা, সীতাহার। হাতে রতনচূড়, মানতাসা। চুলে সোনা-রুপোর কাঁটা আর সোনার ফুল দিয়ে তৈরি হত খোঁপার বাগান। কপালের সামনে মাথা জুড়ে থাকত সিঁথিমৌড়। কেশসজ্জার আগে চুলকে সুবাসিত করে তোলার নিয়মও ছিল। বিয়ের দিন গোলাপজলে চুল ধুয়ে ধুনিতে গুগ্গুল, কর্পূর জ্বালিয়ে তার ওমে শোকানো হত চুল। বিয়ের পিঁড়িতে বরের চারপাশে পানপাতার আড়ালে কনেকে ঘোরানোর সময়ে সেই সুবাসেই পরিচয় হত কনের সঙ্গে।

সুরের বাঁধনে

সেই সুগন্ধি বাতাস আবার বয়ে আনত সানাইয়ের সুর। বিয়েবাড়িতে প্রবেশপথের পাশেই বসত নহবতখানা, সেখানে থাকত শিল্পীদল। তাঁদের সঙ্গে থাকত সানাই, হারমোনিয়াম, তবলা। বাদ্যযন্ত্র পাল্টে গেলেও সানাইয়ের সঙ্গত ছিল আবশ্যিক। আসলে সানাই মঙ্গলবাদ্য হিসেবে পরিচিত। তাই শুভ অনুষ্ঠানে সানাই বাজানোর রেওয়াজ বহু দিনের। সারা দিন বিয়ের অনুষ্ঠান অনুযায়ী বদলে যেত সানাইয়ের সুরও। বাসি বিয়ের দিনে সানাইয়ের ধুনে যেন মিশে থাকত কনে বিদায়ের বিচ্ছেদের সুর, জানালেন সানাইশিল্পী জয়হিন্দ ঘড়ুই।

সুরের আসর শুধু নহবতেই শেষ নয়। বিয়ের রাতে বাসর জাগাও ছিল মেয়েমহলের বিনোদনের অংশ। বাসরঘর থাকত মহিলামহলের দখলে। সেখানে বসত গানের আসর। ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’-এর সেই দৃশ্য যেখানে রসিককে হারমোনিয়াম এগিয়ে দিয়ে গান গাইতে বলায় সে নারাজ। সঙ্গে সঙ্গে তার কান ধরে শাসানি ‘হয় গান, নয় কান’। আসলে ধাঁধায়, কূট প্রশ্নে জামাইকে নাজেহাল করে দেওয়া ছিল বাসরঘরের আর এক খেলা। বাসর জাগা নিয়ে বিদ্যাসাগর আফসোস করে বলেছিলেন, “আজকাল বিবাহে আমোদ নেই। বরকে তেমন সঙ্কট পরীক্ষায় পড়িতে হয় না।” তার কারণ লুকিয়ে আছে তাঁর নিজের বাসরঘরেই। বিয়ের পরে পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্রকেও বাসরঘরে শ্যালিকারা তাঁর নিজের কনেকে খুঁজে বার করার পরীক্ষায় বসান। বিদ্যাসাগর তখন এক শ্যালিকাকে টেনে ধরে বলেন, ‘এই আমার কনে, একে হলেই চলবে।’ ব্যস! সেই মহিলা তো লজ্জায় পড়ে যান। তখন শ্যালিকারাই তাঁর কনেকে সামনে এনে দেয়। এমন জামাই ঠকানো সব মজার খেলা ছিল নব-পরিণীতার বাড়ির লোকের সঙ্গে আলাপচারিতার সূত্রধর।

এখন বাসরঘরে ভাগ বসিয়েছে ডিজে নাইটস, নহবতের বদলে সঙ্গীত। সাজপোশাক থেকে বিয়ের আয়োজনে এখন ভিনদেশি ইভেন্টের পাল্লা ভারী, বাঙালির স্বকীয় চিন্তাভাবনার ছোঁয়াচও নেই। সেখানে বঙ্গভূমের সাবেক বিয়ের গল্প যেন নবরত্ন গয়নার মতোই খাঁটি ও জৌলুসে ভরা।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Wedding Ceremony Wedding

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy