×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

০৭ মার্চ ২০২১ ই-পেপার

সৃষ্টিসুখের উল্লাসে

নবনীতা দত্ত
২০ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ০৫:৪৮
পুরনো কাঠের চেয়ারে ট্রেন্ডি রং আর পর্দার কাপড় কেটে কভার।

পুরনো কাঠের চেয়ারে ট্রেন্ডি রং আর পর্দার কাপড় কেটে কভার।

কথায় আছে, পুরনো চাল ভাতে বাড়ে। সেটা কাজেও সত্যি। বাড়ির স্টোর রুম বা পুরনো ট্রাঙ্কটা টেনে নিয়ে একদিন বসলে দেখবেন, তার মধ্য থেকে যেন বেরিয়ে আসে আর একটা সংসার। ভাঙা রেডিয়ো, ছেঁড়া কাঁথা, পুরনো শাড়ি, পানের ডিবে আরও কত কী! কিন্তু দীর্ঘ ব্যবহারে হয় তারা জৌলুস হারিয়েছে বা ছিঁড়ে গিয়েছে। এ দিকে সেগুলি পুরোপুরি বর্জ্যও হয়ে উঠতে পারেনি, কোনও না কোনও স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। তখন কী করবেন? সেই মুশকিল আসান করবে আপসাইকল।

আপসাইকল কী?

সোজা করে বলতে গেলে, পুনর্ব্যবহার। রিসাইকলের দুটো ভাগ আছে, আপসাইকলিং ও ডাউনসাইকলিং। আপসাইকলিংয়ের ক্ষেত্রে পুরনো জিনিস বা বর্জ্য এমন ভাবে পুনর্ব্যবহারের যোগ্য করা হয়, তখন আসল প্রডাক্টের চেয়ে ওই আপসাইকলড প্রডাক্টের মূল্য বৃদ্ধি পায়। আর পুরনো প্রডাক্টকেও যথাসম্ভব রেস্টোর করার চেষ্টা করা হয়। এখানেই আপসাইকল সফল। যেমন-তেমন ভাবে পুনর্ব্যবহার নয়, বরং এমন ভাবে পরিকল্পনা করতে হবে যাতে জিনিসটা আগের চেয়ে বেশি সুন্দর ও ব্যবহার্য হয়ে ওঠে। ফ্যাশন থেকে শুরু করে খাবারদাবার, অন্দরসজ্জায়... সর্বত্রই এখন আপসাইকল ট্রেন্ড। দীর্ঘ অতিমারির পরে মানুষ কিছুটা হলেও জিনিসের মূল্য বুঝতে শুরু করেছে। ফলে পুরনো জিনিস পুনর্ব্যবহারের উপায় হিসেবে আপসাইকল এখন বেশ জনপ্রিয়। আর আপসাইকলে যেহেতু জিনিসটির মূল্য, সৌন্দর্য সবটাই বাড়ছে, তাই তার বিক্রয়মূল্য বাড়ায় অনেকেই পেশা হিসেবেও আপসাইকলকে বেছে নিচ্ছেন। তবে প্রডাক্ট হিসেবে আপসাইকলের ধরন বদলাবে। একে একে জানব, ফ্যাশন থেকে ফুড... সব দিকে আপসাইকল কী করে সম্ভব।

Advertisement

সাজপোশাকে

অনেকেরই পুরনো বেনারসি বা লেহঙ্গা আলমারিবন্দি হয়ে পড়ে থাকে। এগুলি দিয়ে জ্যাকেট বা স্কার্ট তৈরি করে নিতে পারেন। লেহঙ্গার উপরে মানাসই শার্ট বা টপ পরলেও বেশ ইন্দো-ওয়েস্টার্ন ফিউশন রূপ পেয়ে যাবেন। আবার ঢাকাই, চান্দেরি শাড়ি বেশি পুরনো হলে মাঝখান থেকে কেটে যায়। তাই এই শাড়ি থেকেও ড্রেস বা টপ তৈরি করে নেওয়া যায়। ছোট হয়ে যাওয়া পছন্দের পোশাকও বাড়িতে কম নেই। সেগুলিও কেটে প্যাচওয়র্কে কাজে লাগাতে পারেন। ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে আপসাইকলের সুযোগ সবচেয়ে বেশি। তবে এখন এই ট্রেন্ড খাবার থেকে শুরু করে অন্দরসাজেও...

সোনা দিয়ে জোড়া যায় ভাঙা ক্রকারি।

সোনা দিয়ে জোড়া যায় ভাঙা ক্রকারি।


ফুডজগতে

পোকা ধরা বেগুন, আধপাকা আম, বুড়ো ঢেঁড়স, দাগি আলু... এ সবই অধিকাংশ সময়ে ফেলে দেওয়া হয়। কিন্তু এদেরও আপসাইকল করা যায়। নষ্ট হয়ে যাওয়া অংশ বাদ দিয়ে বাকিটা ব্যবহার করা যায়। খারাপ অংশটা বাদ দিয়ে বাকিটা দিয়ে আচার, জ্যাম তৈরি করা যায়। ফলের রস করার পরে ফলের ছিবড়ে ব্যবহার করে গ্রানোলা বারের মতো তৈরি করতে পারেন। পুষ্টিবিদদের মতে, ফলের রস ও শাঁস দুটোই প্রয়োজনীয়। ফলের রস খেয়ে বাকিটা ফেলে দিলে ফাইবার পাওয়া যায় না। পড়ে থাকা মুয়েজ়লি, কর্নফ্লেকসও ব্যবহার করা যায় গ্রানোলা বারে। ব্রকোলি, ফুলকপির ডাঁটাও চিপস বা স্ন্যাকস স্টিকস তৈরিতে কাজে লাগানো যায়। একেবারেই ব্যবহার করা যায় না, এমন আনাজ বা তার খোসা কমপোস্ট করে সার তৈরি করে ফেলুন। এতে গাছ বাড়বে ভাল। বাড়িতে কয়েকটা সুন্দর গাছ থাকলে ঘরের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয়। তবে এখন ইন্টিরিয়রেও অনেক কাজ হচ্ছে এ ধরনের।

অন্দর মম...

বাড়িতে পুরনো ট্রাঙ্ক গুঁজে দেওয়া হয় খাটের তলায়। ভাঙা চেয়ারটা স্টোর রুমে। ভাঙা সাইকেল তো ওজন দরে বিক্রি করে দেন অনেকে। এ বার থেকে এগুলি জড়ো হলে আপসাইকলের কথা ভাবতে পারেন। পুরনো আসবাব কাঠের হলে ট্রেন্ডি পলিশ বা রং করে নতুন আসবাব বানানোই যায়। সাইকেলের চাকাগুলি খুলে সেটা সুন্দর করে রং করে উপরে কাঠের ফ্রেম রেখে বসার জায়গা করতে পারেন। দেখতে সুন্দর লাগবে। তবে নীচের দিকে স্টপার লাগাতে হবে। ট্রাঙ্কেও ভিনাইল বা মেটালিক রং পেন্ট করে ঘর সাজানো যায়। টেরাজ়ো আপসাইকলের সবচেয়ে পুরনো উদাহরণ। অষ্টাদশ শতকে ভেনিশিয়ান পেভমেন্টে এ ধরনের কাজ দেখা যেত। সিমেন্ট বা কৃত্রিম কাস্টিংয়ের মধ্যে মার্বেল, কোয়ার্টজ়, গ্রানাইটের টুকরো দিয়ে টেরাজ়ো তৈরি করা হয়। তাই বাড়ির পুরনো বেসিন, পাথরের স্ল্যাব, টাইলসের টুকরো ফেলে না দিয়ে এই ধরনের কাজে ব্যবহার করতে পারেন। কাজে লাগাতে পারেন ভাঙা পাথরবাটি সুন্দর করার জাপানি পদ্ধতি কিন্তসুকোরোই। কাচের কাপ, ডিশ, প্লেট, বাটি ভেঙে গেলেই ফেলে দেবেন না। সোনা, রুপো বা প্ল্যাটিনামের ল্যাকার দিয়ে সেই জায়গা ভরাট করার এই জাপানি পদ্ধতি কাজে লাগাতে পারেন। এতে পুরনো জিনিসটিও রেস্টোর করা হবে আবার তার সৌন্দর্যও বাড়বে প্রায় দ্বিগুণ।

উদ্দেশ্য হল, সাসটেনেবিলিটি অর্থাৎ টিকে থাকা ও টিকিয়ে রাখা। পৃথিবীর সম্পদ অনেকটাই ব্যবহৃত। তাই ভবিষ্যতের পৃথিবীতে টিকে থাকতে আপসাইকলিং অন্যতম উপায়। এর মাধ্যমে যেমন ধরা থাকবে অতীতের স্মৃতি, তেমনই জিনিসটির ব্যবহারযোগ্যতাও বাড়বে আগের চেয়ে বেশি। নতুন জিনিস তৈরির আনন্দও তো কম নয়। তাই পুরনো জিনিস নামিয়ে ধুলো ঝেড়ে নেওয়ার সময় এখন। ‘পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন।’

Advertisement