সুমিষ্ট, সুস্বাদু হিমসাগর, ল্যাংড়া, মল্লিকা, আম্রপালি ইত্যাদি আম খাওয়ার পরে মনে হতেই পারে, এমন একটা গাছ বাগানে থাকলে মন্দ হয় না। ইচ্ছেপূরণ করতে সেই আম খেয়ে আঁটি রোপণ করে ফেলেন অনেকে। কিন্তু যে স্বাদের ফল খেয়ে মন ভরেছিল, সেই ফল কি হবে এই আঁটি থেকে? তার জন্য কলম করতে হবে।
হর্টিকালচারিস্ট পলাশ সাঁতরা বললেন, “আঁটির গাছের বয়স যখন ছ’-সাত মাস হবে, পেনসিলের মতো মোটা হবে, তখন গাছের মাথার ডাল কেটে যে গাছের ফল খাওয়া হয়েছিল সেই গাছের ডাল বা উৎকৃষ্ট মানের আম গাছের ডাল কেটে গ্রাফ্টিং করতে হবে। আমরা যত ভাল আম খাই, তা সবই কিন্তু কলমের গাছের দৌলতে। কলম না করলে গাছে ভাল ফলন হবে না,” বললেন হর্টিকালচারিস্ট পলাশ সাঁতরা।
আঁটির গাছটি বড় হওয়ার সময়ে খেয়াল রাখতে হবে তাতে যেন পোকা না ধরে। এর পর গাঢ় সবুজ পাতাওয়ালা উৎকৃষ্ট মানের গাছ থেকে সমব্যাস ও আকৃতির পরিণত অর্ধশক্ত ডাল বাছতে হবে। যাকে বলে সায়ন। সায়ন শাখাটিও যেন রোগহীন, পোকামাকড়মুক্ত হয়। এ ভাবে শুধু আম নয়, আপেল, পেয়ারা, লিচু, লেবু বহু রকমের ফল গাছ কলমের মাধ্যমেই করা হয়। তবে উদ্ভিদভেদে কলমের পদ্ধতি আলাদা। জোড়, গুটি, শাখা, চোখ ইত্যাদি— কলমের পদ্ধতি একাধিক। অঙ্গজ বা কলম পদ্ধতিতে তৈরি গাছের ফল-ফুলের মান এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি।“আর কলম করার উপযুক্ত সময় এখনই অর্থাৎ বৃষ্টি চলাকালীন। এই সময়ে দেখা যায় নার্সারিগুলিতেতৈরি হচ্ছে আমগাছের চারা। এ সময়ে বাতাসের আর্দ্রতা ও গাছের কোষের কার্যকারিতা বেশি থাকে,” বললেন পলাশ।
এক গাছে একাধিক প্রজাতি
অনেক সময়ে শোনা যায়, একটি আম গাছে নানা প্রজাতির আম ধরেছে। ছবি দেখে মনে হতে পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগের ফল। এই বিষয়ে পলাশ বললেন, “অবিশ্বাস্য হলেও এমনটা সম্ভব বাস্তবে। এ ক্ষেত্রে মাল্টিপল কলম পদ্ধতিতে আম গাছে গ্রাফ্টিং করা হয়। ধরা যাক, একটি প্রজাতির আম গাছের নতুন শাখার মাথা কেটে বিভিন্ন প্রজাতির আম গাছের ডাল গ্রাফ্টিং করা হল। যখন ফল ধরবে, তখন প্রত্যেক ডালে ভিন্ন প্রজাতির আম হবে। এই ধরনের গ্রাফ্টিং আম গাছের ক্ষেত্রে ভাল হয়, কারণ আমের প্রজাতি অনেক।” শুধু আম নয়, এমন কারিকুরি ফুল গাছের ক্ষেত্রেও করা যায়। অনেক সময়ে দেখা যায়, একটা জবা গাছে তিন-চার রঙের জবা ফুটেছে। গোলাপেও করা সম্ভব এমনটা। গোলাপ বা জবা ফুলের অসংখ্য প্রজাতি। গোলাপের ক্ষেত্রে টি-বাডিং করা হয়। একটি গাছের ডাল ইংরেজি টি অক্ষরের মতো কেটে তার মধ্যে অন্য রঙের গোলাপ গাছের ছাল বসিয়ে দিতে হবে। তার পর পলিথিনের ফিতে দিয়ে মুড়ে রাখতে হবে। এ ভাবে দেশি কুল গাছের বাডিংও করা হয়।
আনাজপাতিও পিছিয়ে নেই
বিশ্বে অনেক দেশে ফলন বাড়াতে আনাজপাতির উপরেও গ্রাফ্টিং করা হচ্ছে। যেমন লাউয়ের সঙ্গে তরমুজ, করলা, বেগুনের সঙ্গে টম্যাটো ইত্যাদি। এতে যেমন ফলন বেশি হচ্ছে তেমন পুষ্টিগুণও বাড়ছে। এই আনাজে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়ে। চিন-জাপানে এই পদ্ধতিতে এখন চাষ হচ্ছে। যেমন, লাউ গাছের সঙ্গে তরমুজের কলমে, লাউ গাছের ডগা দু’-তিন ইঞ্চি হলেই সেটা কেটে তরমুজের ডগা গ্রাফ্টিং করা হচ্ছে। এতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যায়, ফলন বেশি হয়। কীটনাশক প্রয়োগের মাত্রা কমে, ফলে খাদ্যগুণ বেশি বজায় থাকে। এ ভাবে লাউয়ের সঙ্গে করলার কলমও হয়। যেখানে আগে ১০ টন ফলন হত, সেখানে লাউয়ের সঙ্গে কলম করার ফলে ফলন ৭০-৮০ টন হয়ে যাচ্ছে।
“অন্ধ্রপ্রদেশ, ছত্তীসগঢ়ের চাষিরা বুনো বেগুন বা তিতা বেগুনের গাছের সঙ্গে টম্যাটো গাছ গ্রাফ্টিং করে প্রচুর টম্যাটো ফলাচ্ছেন। এই প্রথা এ দেশে আগেও ছিল। এখন আবার নতুন করে হচ্ছে। বুনো বেগুনের সঙ্গে ভাল বেগুনের কলম করিয়েও প্রচুর বেগুন চাষ হচ্ছে,” জানালেন পলাশ সাঁতরা।
ছাদে বা বাড়ির বাগানে গাছ করলেও কলম করা যায়। বিন ব্যাগ বা টবে একটা-দুটো বেগুন বা টম্যাটো গাছের উপরে এক্সপেরিমেন্ট করতেই পারেন। এতে কম জায়গায় প্রচুর ফলন হয়। একটি জবা গাছে একাধিক প্রজাতির জবা ফোটাতে পারেন।
কিন্তু কলম করার জন্য প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। সেই প্রশিক্ষণ না থাকলে নার্সারিতে গিয়ে বা প্রশিক্ষিত মালির সাহায্য নিয়ে করে ফেলতে পারেন কলমের গাছ।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)