সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে এ শহরের এমন একটি ঘটনা যা বাবা-মায়েদের আতঙ্কিত করে তুলেছে। বিশেষত যাঁদের সন্তান টিনএজার। অভিযোগ উঠেছে, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে তাদের হাতেই ধর্ষিত হয়েছে এক নাবালিকা। ঘটনার তিন মাস পরে তা প্রকাশ্যে এসেছে। মেয়েটিকে তার বন্ধুরা ভয় দেখিয়েছিল। বলেছিল, জানাজানি হলে মেয়েটির ছবি-ভিডিয়ো ছড়িয়ে দেবে। মেয়েটির বাবা বিদেশ থেকে ফিরে মেয়ের আচরণে অস্বাভাবিকত্ব লক্ষ করেন। তার পরই বিষয়টি সামনে আসে। পুলিশি তদন্ত, অভিযুক্তদের গ্রেফতার ইত্যাদি চলছে। কিন্তু এই গোটা ঘটনা কিছু প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। বাবা-মায়ের দায়িত্ব ও সচেতনতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
কখন একক ফোন দেওয়া হবে
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, সন্তানের হাতে ঠিক কোন বয়সে মোবাইল ফোন তুলে দেবেন এবং তা ব্যবহারে কতটা বিধিনিষেধ আরোপ করবেন? ফোন দেওয়া মানে একটা জগতের দরজার চাবি তাদের হাতে তুলে দেওয়া। অপরিণত বয়সে ঠিক-ভুল বিচারের ক্ষমতা থাকে না। তাই সন্তানের হাতে তার নিজস্ব ফোন তুলে দিলেও মা-বাবার উচিত নজরদারি করা। পেরেন্টিং কনসালট্যান্ট পায়েল ঘোষের পরামর্শ, “ক্লাস নাইন-টেনের আগে একক ফোন দেওয়া উচিত নয়। পড়াশোনা বা অন্য প্রয়োজনে সে তার অভিভাবকের ফোন ব্যবহার করতে পারে। তবে উভয় ক্ষেত্রেই বাবা-মাকে খেয়াল রাখতে হবে সন্তান ফোন নিয়ে কী করছে।”
বয়ঃসন্ধির ছেলেমেয়েদের নিজস্ব একটা জগৎ তৈরি হয়। বাবা-মা নজরদারি করতে গেলে পাল্টা প্রশ্ন করে, ‘তোমরা আমাকে বিশ্বাস করো না?’ এ ক্ষেত্রে পায়েল বলছেন, “সন্তানকে বোঝাতে হবে প্রশ্নটা বিশ্বাসের নয়, নিরাপত্তার। কারণ সে অপরিণত। ফোন দেওয়ার প্রথম এক বছর তাকে বিধিনিষেধের মধ্যে রাখতে হবে। ফোন নিয়ে সে কী করছে, স্ক্রিন টাইম... ইত্যাদি বিষয়ে খেয়াল রাখা জরুরি। এতে সে-ও বুঝে যাবে কোন দিকগুলো এড়িয়ে চলতে হবে। ধীরে ধীরে তাকে ফোন ব্যবহারে স্বাধীনতা দিতে হবে।” আঠারোর পর সন্তানকে ছাড় দিতেই হয়। তখন অনেকে বাইরে পড়াশোনাও করতে যায়। সন্তান যেন তার ভাল-মন্দ, স্বাধীনতার পরিধি বুঝতে পারে— সে ভাবেই তাকে তৈরি করে দিতে হবে।
সন্তানের ব্যক্তিগত পরিসর
টিনএজাররা ব্যক্তিগত পরিসরে বড়দের প্রবেশ করতে দিতে চায় না। সে ইন্টারনেটে কী সার্চ করছে, সমাজমাধ্যমে কারা তার বন্ধু সবই আড়ালে রাখতে চায়। এখন তেরো বছর বয়সেই ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে অ্যাকাউন্ট খোলা যায়। অনেকে বাবা-মাকে সমাজমাধ্যমে ব্লকও করে রাখে। এ বিষয়টি বুদ্ধি করে সামলাতে হবে। তার নিরাপত্তার কারণেই যে নজর রাখা হচ্ছে সেটা সন্তানকে বোঝাতে হবে। বাবা-মাকেও টেকনিক্যাল বিষয়ে জানতে হবে। এ প্রজন্মের ভাষা, ইমোজির ব্যবহার নিয়ে ওয়াকিবহাল হতে হবে। প্রয়োজনে সাইবার বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা যায়।
অনেক সময়েই মোবাইল না দেওয়ায় বা কেড়ে নেওয়ায় ছেলেটি বা মেয়েটি আত্মহত্যা করেছে, এমন ঘটনা ঘটেছে। ফলে বাবা-মায়েরা জোরাজুরি করতে পারেন না। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ জয়রঞ্জন রামের মতে, অপরিণত সন্তানের হাতে ফোন তুলে দেওয়াটা সব সময়েই চিন্তার। তাঁর কথায়, “ফোন দেওয়ার আগে বাবা-মাকে স্পষ্ট করে বিধিনিষেধ আরোপ করে দিতে হবে। শর্ত না মানলে, সে ফোন পাবে না। এখানে কোনও নমনীয় মনোভাব নয়। কী ভাবে সে মোবাইল, সমাজমাধ্যম ব্যবহার করবে, কার সঙ্গে মিশবে বা মিশবে না— সবটা কিন্তু ফোন হাতে দেওয়ার আগে স্পষ্ট করে দিতে হবে। এটাকে এক ধরনের পারিবারিক শিক্ষার অংশ হিসেবে দেখতে হবে।” ফোন ব্যবহারে অবাধ স্বাধীনতা দিয়ে, পরে রাশ টানতে যাওয়া কিন্তু বেশি কঠিন।
কথোপকথনের খোলামেলা পরিবেশ
পনেরো-ষোলো বছর বয়সে প্রেম, সম্পর্ক নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়। এ ক্ষেত্রে বাধা দিলে হিতে বিপরীত হয়। প্রেম যেমন হয়, ব্রেকআপও হয়। এটা অনেকেই সহজ ভাবে নিতে পারে না। কেউ ভেঙে পড়ে, কেউ প্রতিশোধ নিতে চায়। সম্প্রতি নেটফ্লিক্স সিরিজ় ‘অ্যাডোলেসেন্স’ দেখিয়েছে বয়ঃসন্ধির ছেলে ও মেয়েদের সম্পর্কের জটিলতা এবং তা থেকে কী ভাবে ঘটে যায় ভয়ঙ্কর ঘটনা।
সন্তানের গতিবিধিতে যেমন নজর রাখতে হবে, তেমনই তার মনের খোঁজও রাখতে হবে। ডা. রাম বলছিলেন, “সন্তানের জগতে বাবা-মাকে উপস্থিত থাকতে হবে। তার মনের হদিস, পছন্দের খাবার, গান-সিনেমা... সবটা জানতে হবে। সন্তানের বন্ধুবৃত্তে যোগাযোগ রাখা খুব জরুরি।” সাইবার বুলি, ডিজিটাল অ্যারেস্ট থেকে স্কুল-টিউশনে যৌন হেনস্থার মতো ঘটনা আকছার শোনা যাচ্ছে। বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে বাড়িতে খোলাখুলি আলোচনা করাটা জরুরি। এই অভ্যেসটা প্রি-টিনএজ থেকেই তৈরি করতে হবে। সন্তানকে ভরসা দিতে হবে, বাবা-মা সব সময়ে তার পাশে থাকবে। কিছু ঘটার আগে আগাম সতর্ক হওয়া দরকার। সমাজমাধ্যমে ছবি দেওয়া, লোকেশন অন রাখা ইত্যাদি থেকে বিরত থাকতে হবে। “সোশ্যাল মিডিয়ায় কাউকে চট করে বিশ্বাস করা যায় না। কারণ ওখানে কেউ তার আসল চেহারা প্রদর্শন করে না,” মন্তব্য ডা. রামের।
আলোচনায় উঠে আসা সব নিয়মকানুন কিন্তু বয়ঃসন্ধির ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে প্রযোজ্য। বাবা-মা যদি সন্তানকে বোঝাতে না পারেন, তা হলে কাউন্সেলর, পেরেন্টিং কনসালট্যান্টের সহায়তা নেওয়া যায়।
মডেল: মোনালিসা পাহাড়ি শতপথী, রাইমা গুপ্ত; ছবি: অমিত দাস,সর্বজিৎ সেন; মেকআপ:প্রিয়া গুপ্ত, কুশল মণ্ডল
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)