E-Paper

ড্রোনাচার্য

যত্রতত্র বিনা অনুমতিতে ড্রোন ওড়ানো যায় না। তা ওড়ানোর আগে জেনে নিন নিয়মকানুন।

কোয়েনা দাশগুপ্ত

শেষ আপডেট: ২৫ অক্টোবর ২০২৫ ০৯:১৪

পুষ্পক রথে চড়ে রাবণ যখন সীতাহরণ করে লঙ্কা যাচ্ছিল, তাকে বাধা দিয়েছিল জটায়ু। রাক্ষসরাজের সঙ্গে ভীষণ লড়াই হয় তার। পরে রামকে সীতাহরণের খবর দিয়েছিল সে। রামায়ণের সেই পাখিই যেন এ যুগের ড্রোন, আনম্যানড এরিয়াল ভেহিকেল (ইউএভি)। এক কথায়, রিমোট নিয়ন্ত্রিত এই যান ‘জটায়ু’র আধুনিক রূপ। সেন্সর বা প্রোগ্রামের সাহায্যে আকাশে ওড়ে, নজর রাখে সীমান্তে, পৌঁছে দেয় ওষুধ, পণ্য। এক সময় ড্রোন শুধুই খেলনা ছিল, শখে ওড়াত অনেকে। এখন ছবি তোলা থেকে কৃষিকাজ, সামরিক নজরদারি থেকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা— ড্রোন হয়ে উঠেছে এক যান্ত্রিক আকাশদূত। ক্যামেরা, জিপিএস, সেন্সর-সহ নানা আধুনিক সুযোগসুবিধা থাকে এতে। তবে এই স্বাধীন উড়ান কিন্তু কখনওই আইন বহির্ভূত নয়। ড্রোন ব্যবহারের আগে জানতে হয় নির্দিষ্ট নিয়ম, অনুমতি ও নিরাপত্তাবিধি।

কেনার আগে জানুন

ড্রোন কেনার আগে তা দিয়ে ঠিক কী ধরনের কাজ করা হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি—

  • মাল্টি-রোটর: আশপাশে বেশি দেখা যায়। হেলিকপ্টারের প্রপেলারের মতো একাধিক রোটর থাকে। সেই সংখ্যা অনুযায়ী কোয়াডকপ্টার, হেক্সাকপ্টার, অক্টোকপ্টার নাম হয়। রোটরের সংখ্যা যত বাড়ে, ড্রোন তত ভারী ক্যামেরা বহন করতে পারে। ছবি তোলা, সিনেম্যাটিক ভিডিয়োগ্রাফি, খবর সংগ্রহ, নজরদারি, উদ্ধারকাজ ও কৃষিক্ষেত্রে এটি ব্যবহৃত হয়।
  • সিঙ্গল-রোটর: একটিই শক্তিশালী মূল রোটর থাকে। ভারসাম্য রাখতে নীচে বা পিছনের দিকে একটি ছোট টেল রোটর থাকে। ভারী বস্তু, বিশেষ সেন্সর, ম্যাপিং লেজ়ার, বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম বহনে সক্ষম। কৃষি ও শিল্পক্ষেত্রে, বনভূমি পর্যবেক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণে ব্যবহার হয়।
  • ফিক্সড-উইং: ছোট বিমানের মতো ডানাওয়ালা ড্রোন বড় এলাকার সার্ভে ও নজরদারি করে। সাধারণ ড্রোনের মতো যত্রতত্র টেক অফ-ল্যান্ডিং করতে পারে না। এর জন্য নির্দিষ্ট রানওয়ে কিংবা ছুড়ে ছাড়ার প্রয়োজন হয়। দীর্ঘ দূরত্বের পাইপলাইন, পাওয়ারলাইন বা রেলপথের দেখাশোনা করে।
  • ভিটিওএল: মাল্টি-রোটর ও ফিক্সড-উইংয়ের সংমিশ্রণে তৈরি এই ভার্টিকাল টেক-অফ অ্যান্ড ল্যান্ডিং ড্রোন, রানওয়ে ছাড়াই সোজা উপরে উঠে নীচে নামতে পারে। সন্ধান ও উদ্ধারকার্যে, গ্রাম বা দুর্গম অঞ্চলে ওষুধ, জরুরি পরিষেবা বা ডেলিভারি দিতে ব্যবহার হচ্ছে।

ডিজিসিএ-র নিয়মনীতি

ড্রোন নিয়ন্ত্রিত হয় ডিজিটাল স্কাই প্ল্যাটফর্ম মারফত। তা ওড়াতে ডিরেক্টরেট জেনারেল অব সিভিল অ্যাভিয়েশন (ডিজিসিএ)-এর অনুমতি প্রয়োজন। ডিজিটাল ফরেন্সিক অ্যান্ড ফিনানশিয়াল ক্রাইম ইনভেস্টিগেটর পার্থপ্রতিম মুখোপাধ্যায় বলছেন, “যে কোনও জায়গায় ইচ্ছে মতো ড্রোন ওড়ানো যায় না। এর জন্য লাল, হলুদ, সবুজ বিভিন্ন জ়োন ভাগ রয়েছে।” বিমানবন্দরের আশপাশের পাঁচ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকা রেড জ়োন। এই এলাকায় ড্রোন ওড়ানোর অনুমতি নেই। রেড জ়োনের পরের তিন কিলোমিটার ইয়েলো জ়োন। এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল (এটিসি)-এর অনুমতি নিয়ে এই জ়োনে ড্রোন ওড়ানো যায়। বিমানবন্দর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে গ্রিন জ়োন। এখানে এটিসির অনুমতির প্রয়োজন নেই। বিমানের সঙ্গে সংঘর্ষ এড়াতেই ড্রোনের ওড়ার সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দেওয়া হয়।

নো-ফ্লাই জ়োন

বিমানবন্দর, সামরিক ঘাঁটি ও তার নিকটবর্তী এলাকা, আন্তর্জাতিক সীমান্ত— নো-ফ্লাই জ়োন। রাষ্ট্রপতি ভবন, সংসদ ভবনের মতো সরকারি এলাকা, বন্যপ্রাণ সংরক্ষিত অঞ্চলেও ড্রোন ওড়ানো নিষিদ্ধ। কিছু রাজ্য, জেলা সীমান্তেও ড্রোন ওড়াতে হলে আগাম অনুমতি প্রয়োজন। কলকাতায় যেমন ফোর্ট উইলিয়ামের আশপাশে ড্রোন ওড়ালে বিশেষ অনুমতি দরকার। জনসমাগম, মিছিল, কোনও ধর্মস্থান বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের উপরেও ড্রোন ওড়ানো বারণ। এ ক্ষেত্রে ডিজিসিএ ও নির্দিষ্ট প্রশাসনিক দফতরের অনুমতি লাগে।

ড্রোনের জন্য প্রয়োজনীয় নিয়মকানুন

  • ডিজিটাল স্কাই প্ল্যাটফর্মে ড্রোনের (ন্যানো ছাড়া) রেজিস্ট্রেশন করানো বাধ্যতামূলক। ড্রোনের জন্য ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন নম্বর এবং অপারেটরের জন্য আনম্যানড এয়ারক্রাফট অপারেটর পারমিট বা লাইসেন্স নিতে হয়।
  • ড্রোন ওড়ানোর আগে ডিজিটাল স্কাই অ্যাপ মারফত অনুমতি নিতে হয়। একই জায়গায় বারবার ওড়ালেও অনুমতি নেওয়া প্রয়োজন। এই অনুমতি সাধারণত কয়েক ঘণ্টার জন্যই বৈধ থাকে। তবে ব্যক্তিগত এলাকায় এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। এখন অনেক ড্রোনেই ‘নো পারমিশন, নো টেক অফ’ সিস্টেম থাকে, যেখানে ডিজিসিএ-এর নির্দিষ্ট এলাকাভিত্তিক অনুমতি আপলোড না করলে, ড্রোন আনলক হয় না।
  • ফ্লাই করার সময়ে ডিজিটাল স্কাই ম্যাপে নজর রাখা জরুরি।
  • অপারেটরের বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি হতে হবে।
  • ন্যানো কিংবা মাইক্রো ছাড়া অন্য ড্রোনের জন্য ডিজিসিএ অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান থেকে ড্রোন পাইলট ট্রেনিং নিতে হবে।
  • ড্রোনকে দৃশ্যমান সীমা অর্থাৎ ভিসুয়াল লাইন অব সাইটের (ভিএলওএস) মধ্যেই রাখতে হবে।
  • বিনা অনুমতিতে অন্যের বাড়ি বা সম্পত্তিতে ড্রোন ওড়ালে, ছবি তুললে শাস্তি হতে পারে।
  • সাধারণত রাতে ড্রোন ওড়ানো যায় না। তার জন্য আগাম বিশেষ অনুমতি নেওয়া প্রয়োজন।
  • ড্রোন দুর্ঘটনার শিকার হলে তৎক্ষণাৎ ডিজিসিএকে জানাতে হবে।

পার্থপ্রতিম বলছেন, “সাময়িক ভাবেও কোনও এলাকায় কোনও নির্দিষ্ট দিনের জন্য উড়ান বন্ধ থাকতে পারে। সে কারণে যে কোনও ড্রোন ওড়ানোর আগে অবশ্যই ডিজিটাল স্কাই প্ল্যাটফর্ম অ্যাপ দেখে নেওয়া জরুরি।”

শখে হোক কিংবা পেশার খাতিরে— আজকাল অনেকেই ড্রোন ব্যবহার করেন। ড্রোন ওড়ানোর আগে খেয়াল রাখুন নিয়মকানুন। নিয়ম অমান্য করলে জরিমানা, শাস্তি হতে পারে। এমনকি প্রশাসন চাইলে ড্রোন বাজেয়াপ্তও করতে পারে। তাই প্রযুক্তিকে দায়িত্বের সঙ্গে ব্যবহার করুন।

ওজন অনুসারে

ন্যানো: ২৫০ গ্রামের কম।

মাইক্রো: ২৫০ গ্রাম-২ কেজি।

ছোট: ২-২৫ কেজি।

মাঝারি: ২৫-১৫০ কেজি।

বড়: ১৫০ কেজির বেশি।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

drone camera Tech and Gadgets

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy