E-Paper

শেষ গান্ধর্বী

সঙ্গীতের সীমানা বিস্তৃত করে দিলেন আশা ভোঁসলে। শিখরে পৌঁছেছেন প্রতিভার জোরে তো বটেই, সঙ্গে ছিল জীবনের ধাক্কা। 

চিরশ্রী মজুমদার 

শেষ আপডেট: ২৫ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৫১
আশা-আরডি বর্মণ।

আশা-আরডি বর্মণ।

পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকর ছিলেন স্বল্পায়ু। লতাকে প্রশিক্ষণ দিলেও আশাকে তৈরি করার সুযোগ পাননি। ছোট্ট আশা শুনে শুনে গাইতেন ঠিকই, কিন্তু তাঁকে শিল্পী করেছে জীবন। তাঁর গায়িকা হওয়ার এত ইচ্ছে ছিল না, চাইতেন সুখী সংসার, ভালবাসার মানুষ। রান্না-ঘরকন্নায় আগ্রহ। যা দেখতেন তাই হতে ইচ্ছা হত, পুলিশ, মেলার দোলনাওয়ালা...

কৈশোরে পা দিয়েই পরিবারকে হতবাক করে দিদির সচিব ত্রিশোর্ধ্ব গণপতরাও ভোঁসলের সঙ্গে ঘর ছাড়লেন। পরের বছরই এক মাসের সন্তানকে ছেড়ে লোকাল ট্রেনে ডেলি প্যাসেঞ্জারি শুরু। বুঝেছেন, দিদির কাজ সামলানোর সঙ্গেই ফিল্মদুনিয়ার হালহকিকত, যোগাযোগ হাতিয়ে রেখেছেন গণপত। আশার কণ্ঠসম্পদকে ব্যবহার ও লতার প্রতি রাগ মেটানোই এই বিয়ের অন্যতম উদ্দেশ্য। আশাকে শাসন করেন কেন— এই প্রশ্নে প্রবল পুরুষতান্ত্রিক গণপতরাওয়ের জবাব ছিল, ‘ওর মন খুব উড়ু উড়ু’। লতা ক্যাবারে গান না, রফির সঙ্গে গাইছেন না, অসুস্থ হয়েছেন— এ সব খবর পেলেই সেখানে ‘লতার মতো গলা’ হিসেবে আশাকে পাঠাতেন। উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের তালিমের বন্দোবস্তের কৃতিত্বটুকুও অবশ্য গণপতরাওয়েরই। কিন্তু ভালবাসা, যত্নের বদলে ছিল মারের দাগ, মনের ক্ষত। মঙ্গেশকর-বাড়িতে ঢোকেননি আশা এক দশক। তখন স্টুডিয়োয় দিদির সঙ্গে বাক্যবিনিময়ও হত না।

সব সুরকারই লতাকে চান, ওপি নাইয়ার ছাড়া। নায়িকার কণ্ঠে নিয়মিত ব্যবহার করে আশাকে লতার মুখোমুখি দাঁড় করান ওপিই, কিন্তু গাইতে বলতেন গীতা দত্তের স্টাইলে, উত্তেজক ভাবে। ‘লোতা’র উপর রাগ করে কয়েক বছর শচীন দেব বর্মণ আশাকে প্রচুর গাওয়ালেন। জীবনের অভিজ্ঞতা মিশিয়ে, জায়গা মতো ‘হরকত’ ভরে দেওয়ার কায়দা দেখালেন। আশা বলেছেন, “আমাকে বৃহত্তর সংসারের সন্ধান দেন বর্মণদাদা।” তখন দুই সন্তান-সহ অন্তঃসত্ত্বা আশাকে রাতের পথে বার করে দিয়েছেন গণপতরাও। কেড়ে নিয়েছেন টাকা, বাড়ি-গাড়ি। রইল শুধু কণ্ঠ।

দ্য গ্রেট গ্যামলার

কণ্ঠে শান দিতে চলল অক্লান্ত পরিশ্রম। ভোরে উঠে রেওয়াজ, বাচ্চাদের খাবার তৈরি করে স্কুলে পাঠিয়ে ছুটতেন রিহার্সাল, রেকর্ডিং-এ। ফিরতে রাত দুটো। আবার কাকভোরে সাধনা। তাঁর ‘এনার্জি’, দম আজীবনই বেশি। কিন্তু স্বামীকে ছেড়ে যখন ওপি নাইয়ারের ছবিওয়ালা লকেট পরলেন, তখন ইন্ডাস্ট্রির অন্যরাও তাঁকে পরনারী, স্বৈরিণী, মোহিনী চরিত্রের গানে বেছে নিল। এক্সট্রা, কাওয়ালি বা ক্যাবারেশিল্পী হিসেবে যে গানক’টি আশা পেয়েছিলেন সেগুলিকে অসাধারণের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। একটা কারণ তো তাঁর সাধা গলায় আবেদনের মীনাবাজ়ার, অন্য কারণটি ব্যাখ্যা করেছেন জাভেদ আখতার— ‘আশা বহুরূপী’।

এটাই আশা-ম্যাজিক। কষ্ট, জীবনের যুদ্ধ আর তৃষ্ণা তাঁর ক্ষমতা এতটাই বাড়িয়েছিল যে তিনি গাওয়ার সময়ে সেই অভিনেত্রীতে বদলে যেতেন। লতা মিমিক্রিতে ওস্তাদ, অভিনেত্রী গাইলে যেমন হবে তেমন করে গাইতেন, আর আশা একেবারে সেই নায়িকার রূপটাই ধরতেন। ‘পিয়া তু’-তে উচ্চারণের টানেই অভিনেত্রীর শরীরের পাক দেখা যায়, শ্বাসগুলোও পড়ে নাচের গমকে— সমালোচকরা বলেছেন ‘হেলেন ভোঁসলে’র ডান্স-নাম্বার। ‘দম মারো’য় সুর দীর্ঘায়িত হয়ে জ়িনতের হিল্লোলে জড়িয়ে যায়। ‘জওয়ানি জানেমন’-এ প্রতিটি নোট, স্বরক্ষেপণ যেন দেহজ রূপ ধরে। এ কারণেই বলা হয় আশাকণ্ঠের শরীর আছে। এই একাত্ম হতে, উত্তরণ ঘটাতে গিয়ে কত কী যে সয়েছেন। অহঙ্কারী ওপি পুরো কৃতিত্বটাই নিতে চাইতেন, বলতেন, ‘মারকে শিখায়া হ্যায়।’ এক দশকের উপর আশা তাঁকে সহ্য করেছেন, কারণ তখন প্রায় সব সুরস্রষ্টা লতাকে নিয়ে ব্যস্ত, অন্য দিকে একা ওপি-আশা। এমনকি বর্মণদাদাও ছেলের সুবাদে লতার সঙ্গে মিটমাট করে আশাকে গেলেন ভুলে। ফলে, পরিস্থিতি ছিল— বিনা নাইয়ার বিপদে কেরিয়ার।

আশাকন্যা বর্ষাকে থাপ্পড় মারায় ওপির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়। নাইয়ার আশাকে লতার বদলি করেছিলেন, কিন্তু আশার বিকল্প পেলেন না। মাধুরী জোগলেকরকে সব দিক দিয়ে দ্বিতীয় আশা তৈরি করতে গিয়ে শুধু ‘গসিপ’ই বাড়ালেন।

দুই অযোগ্য পুরুষের পর সার্থক সঙ্গী আশা পেয়েছিলেন সুরের রাজপুত্র রাহুলে। গানে ওঁরা ‘মেড ফর ইচ আদার’। কিন্তু সম্পর্কের কথা জেনে বিমূঢ় শচীনকর্তা বলেছিলেন, “সিঙ্গারে বিয়া করন ঠিক নয়, রাস্তা কঠিন হয়।” চাকুরিরত ছেলেমেয়ে-সমেত ছ’বছরের বড় আশা পুত্রবধূ হবেন শুনে নাকি জিনিসপত্র ছুড়েছিলেন মীরা দেব বর্মণ। কিন্তু আরডি-আশা জুটি ভাঙে কে! ভারতে বিপ্লব আনল রাহুল দেব বর্মণের ঝঙ্কারগীত, সেই ‘আরডিএক্স বিস্ফোরণ’ই আশাকে পৌঁছে দিল চূড়ার খুব কাছে। কিন্তু পঞ্চমের তো তিন অস্ত্র— কিশোর, লতা, আশা। সুরের সব হিরে-জহরত লতার জন্য তুলে রাখছেন দেখে আশার প্রতিভা ছটফটায়। আরডি বিষণ্ণ হতেন— তুমি না গাইলে তাল-লয় নিয়ে এক্সপেরিমেন্টই ছেড়ে দেব।

দিদি লতার সঙ্গে বোন আশা।

দিদি লতার সঙ্গে বোন আশা।

পেয়ার কা তোফা

দু’-এক বছরেই বিচ্ছেদের গুঞ্জন উড়ছিল। কারণ, আশা আরডির সঙ্গে থাকেন না। তাঁদের নাকি চুক্তি হয়েছিল যে আশা প্রতি রাতে ফিরবেন ছেলেমেয়েদের কাছে। উপরন্তু, ‘মাসুম’-এর মতো সাউন্ডট্র্যাকের একটি গানেও আশা নেই। বলেছিলেন, “পঞ্চম শিল্পী নির্বাচনে দুঃসাহসী। ওর সৃজনশীল সিদ্ধান্তগুলিতে আমি বাধা দিই না।” কিন্তু চারিত্রিক বিচারে আশা প্রবল কষ্টসহিষ্ণু হলেও যন্ত্রণা লুকোনোর বান্দা নন। মদনমোহনকে সর্বসমক্ষে হেসে বলেছেন, সব উপহার তো দিদিকেই দেন। ঠিক আছে, আপনার ওই ‘ঝুমকা’ই আমার যথেষ্ট।

জীবনে যত ক্ষত, হানি, দুর্যোগের সম্মুখীন হয়েছেন সব যেন কখনও উচ্ছল হাসির তরঙ্গে, আবদারের সুরে, অভিমানে, রাগে, অনুরাগে, অনুভব হয়ে তাঁর গানের শরীরে বয়ে গিয়েছে। যত বাণ বিঁধেছে সব বুকে নিয়ে হাসিটি অক্ষুণ্ণ রেখে এগিয়ে গিয়েছেন। এক একটা তির উপড়েই তো গেয়েছেন— ‘দিল চিজ় কেয়া হ্যায়...’

সেই রেকর্ডিং শেষেই নিজহাতে উপকরণ কিনে কাবাব রেঁধেছেন, রণধীর কপূর বিস্মিত— গান ছেড়ে শেফ হচ্ছেন না কেন? হাজার ঝড়ে অটল থাকার এমন অফুরান শক্তি উদাসী পঞ্চমের ছিল না। আশির দশকে তাঁর শব্দরহস্যের কিছুটা বাপ্পী লাহিড়ী ধরে ফেলেছিলেন। সেই গান মৌলিক হোক বা না হোক, রাহুলের সাম্রাজ্য টলে গেল। আরও বহু কারণই ছিল, সে সবের পরিণামে পঞ্চম স্বাস্থ্যকে অবহেলা করলেন। বাপ্পীর গান আশার গলায় জমজমাট। স্ত্রী রেকর্ডিং থেকে ফিরলে বলতেন, “মাইকেল জ্যাকসন কি আমার স্টাইলে গাওয়াল?”

‘মেলডি’র বৃষ্টি নামিয়ে রাজত্ব পুনরুদ্ধার দেখার আগেই আরডিকে ছিনিয়ে নিল হার্ট অ্যাটাক। মীরা দেববর্মণ তা মেনে নিতে পারেননি। বলতেন, ছেলে দুবাইয়ে শো করতে গিয়েছে। আশা বিধ্বস্ত। ধরেই নেওয়া হয়েছিল, দিন ফুরাল। একে ক্যাসেট কোম্পানির ঘরের গায়িকাদেররমরমা, তায় নতুন সুরকাররাও তরুণদের চান। শচীনকর্তার মানসপুত্র,কিংবদন্তি গায়ক রাহুলকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, বিয়ের ‘ডকুমেন্ট’ রাখবে না। তাই মন্দিরে মালাবদল, ছবিও নেই। ফলাফল, বৈধব্যের পরে আইনি টানাটানি। মঙ্গেশকররা পরে নাকি বিয়ে নথিবদ্ধ করান, তাতেই শেষরক্ষা।

তিসরা কোই দূর তক নহিঁ...

শিল্পে আঁচমাত্র পড়েনি। বরং বিরাট বিরাট শৃঙ্গজয় নব্বই দশকেই। রাজকীয় পুনরুত্থান, এক নম্বর রূপে আবির্ভাব ইন্ডিপপে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিয়ে গেলেন পঞ্চমের সুরকে। শত রক্তপাতেও আশ্চর্য সজীব তরুণ হৃদয়। তাই, কণ্ঠে বয়সের হতাশা লাগেনি দীর্ঘ দিন। বিপন্ন শৈশবের যন্ত্রণায় চির-অবসন্ন মেয়ে বর্ষা তিন বার চেষ্টা করে আত্মঘাতী হয়েছেন। বড় ছেলেকে কেড়েছে ক্যানসার। তিনি কেঁপে উঠেছেন, “হয়তো সত্যিই আমরা গন্ধর্ব। যার পাপ যত ভারী, তার জ্বালা তত বেশি। রফিসাব, কিশোরদা তাই আগে চলে গিয়েছেন।” ফের গানে ফিরেছেন তিনি। বাঁচতে শিখিয়েছেন চার প্রজন্মকে।

“পথ কেউ ছাড়ে না। পথ করে নিতে হয়। আমাকে স্টুডিয়োয় ঢুকতে না দিতে তদ্বির করতেন আমীরবাই কর্নাটকি।” রাগপ্রধান গানে আশাই সেরা— বলেও ছাপতে বারণ করেছেন নৌশাদ। আশা বলেন, “এ সব থাকবেই। এতে যারা হাল ছেড়েছে তারাই বলে দুই বোন মিলে আটকে দিয়েছে।” “প্রথমে এসেছে সন্তানেরা, তার পরে শিল্প— এই দুয়ের রাস্তায় কিছু এলে নির্মমতায় বাদ দিয়েছি।” এই স্বীকারোক্তির মধ্যেই হয়তো জবাব মিলবে প্রায় সব অভিযোগের, এমনকি, শেষকালে মীরা দেববর্মণকে কেন বৃদ্ধাশ্রমে যেতে হল, সেই প্রশ্নেরও। তখন আশা প্রায় পঁচাত্তর, সন্তানদের সুবিধা-অসুবিধা আরওই অমূল্য।

বুদ্ধি, কৌশল, দ্রোহ, আগুন হয়তো ছিল, কিন্তু সবচেয়ে বেশি ছিল দক্ষতা। স্টুডিয়োতে পঞ্চমের এক সৃষ্টিসাগরে লতার নিষ্ঠা দেখে আশা বোঝেন, এ গান দিদির চেয়ে ‘পারফেক্ট’ কেউ গাইবে না। তেমনই, যাঁরা লড়েছেন, তাঁরা সকলেই অবিস্মরণীয়, কিন্তু তাঁদের বাকি গানগুলি এমনই অমরত্বে পৌঁছেছে তো? পরে, যখন লতা-আশারই গান গেয়েছেন তাঁরা, একই জাদু হয়েছে?

কারণ, লতার সমকক্ষ হয়নি, আশার ঊর্ধ্বেও কেউ নেই।গুলজ়ারের কথায়, “একই এলপি রেকর্ডের দু’টি পিঠ।” এক মীরা, এক রাধা। এক জন যদি ভারতের ‘নাইটিঙ্গল’ হন, অন্য জন তবে উপমহাদেশের ‘এনচ্যান্ট্রেস’। স্বরকোকিলা ও মায়া-কোকিল।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

RD Burman lata mangeshkar

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy