Advertisement
০৮ ডিসেম্বর ২০২২
Mount Everest

এভারেস্টের আবর্জনায় শিল্পকর্ম, পরিচ্ছন্নতার জন্য চাই আইনি পদক্ষেপ, বলছেন বিশেষজ্ঞরা

আগে এই আবর্জনার অনেকটাই পুড়িয়ে দেওয়া হত। তাতে পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছিল।

এভারেস্টের সাফাই অভিযান।

এভারেস্টের সাফাই অভিযান।

নিজস্ব সংবাদদাতা
কলকাতা শেষ আপডেট: ২৩ জানুয়ারি ২০২১ ১৬:৫৬
Share: Save:

এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে জমে থাকা আবর্জনা সাফ করার অন্য রকম উদ্যোগ নিল নেপাল সরকার। এ বার সেই আবর্জনাকে অন্যত্র সরিয়ে এনে তাকে শিল্পরূপ দেওয়া হবে, এবং তার জাদুঘর বানানো হবে। এই শিল্পকলা পর্যটক এবং একই সঙ্গে স্থানীয়দেরও সচেতন করবে বলে মত উদ্যোক্তাদের।
বিপুল জনপ্রিয়তার কারণে এখন প্রতি বছর পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গের আরোহণে হাজার হাজার মানুষ হাজির হন বেস ক্যাম্পে। তাঁদের ব্যবহৃত প্লাস্টিক, ছেঁড়া তাঁবু, চটি, অক্সিজেন সিলিন্ডারের মতো বহু কিছুই পড়ে থাকে এভারেস্টের গোড়ায়। বছরের পর বছর জমতে জমতে সেখানে আবর্জনার পাহাড় তৈরি হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। এর আগে এই আবর্জনার অনেকটাই পুড়িয়ে দেওয়া হত। তাতে পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে বলেই, এ বার সেগুলোকে নীচে নামিয়ে এনে তাকে শিল্পরূপ দেওয়ার উদ্যোগ।
কবে থেকে এভারেস্টের পাদদেশে এই ভাবে আবর্জনা জমতে শুরু করল? পর্বতাভিযান গবেষক এবং চিকিৎসক রূপক ভট্টাচার্য বলছেন, যখন থেকে এভারেস্ট অভিযানের বাণিজ্যিকীকরণ শুরু হয়েছে তবে থেকেই আবর্জনার পরিমাণ বাড়ছে। ‘‘নয়ের দশকের গোড়ার দিকে নিউজিল্যান্ডের কোম্পানি ‘হল অ্যান্ড বল অ্যাডভেঞ্চার কনসালট্যান্টস’ বিপুল অর্থের বিনিময়ে এভারেস্ট শৃঙ্গে অভিযাত্রীদের নিয়ে যাওয়া শুরু করে। এর পর থেকেই হু হু করে অভিযাত্রীদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। আর আবর্জনার পরিমাণও বাড়তে থাকে পাল্লা দিয়ে’’, বলছেন তিনি।
২০১০ সালে সফল ভাবে এভারেস্ট শৃঙ্গ আরোহণ করেন বসন্ত সিংহরায়। বেস ক্যাম্পের আবর্জনা পরিষ্কার করার সুষ্ঠু বন্দোবস্ত তিনি অবশ্য দেখেছিলেন তখন। তাঁর কথায়, ‘‘লুকলা থেকে এভারেস্ট বেস ক্যাম্প পর্যন্ত জায়গায় জায়গায় আবর্জনা ফেলার পাত্র রাখা আছে। ফলে এ দিক ও দিক ময়লা ফেলার প্রয়োজন নেই। বেস ক্যাম্প থেকেও শেরপারা নিয়মিত আবর্জনা নীচে নিয়ে যেতেন। যে সমস্ত আবর্জনা বায়োডিগ্রেডেবল, সেগুলো রাখার জন্যও আলাদা পাত্র ছিল। আলুর খোসা বা এমন কিছু জিনিস পাখিরা খেত। ফলে সেগুলো নিয়ে আলাদা করে ভাবতে হয়নি। যেগুলো বায়োডিগ্রেডেবল নয়, সমস্যা সেগুলো নিয়েই।’’
এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে জমা আবর্জনা রিসাইকেল করে তার শিল্পরূপ দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছে ‘সাগরমাতা নেক্সট’ নামের সংস্থা। সংস্থার প্রধান টমি গুস্তাফসন সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আবর্জনা জ্বালিয়ে না দিয়ে, পরিবেশ বান্ধব করে কী ভাবে তাকে ব্যবহার করা যায়, তার প্রশিক্ষণও দেবে এই উদ্যোগ। ‘‘আমাদের আশা, মানুষ এখন থেকে জঞ্জাল-সমস্যা মেটানোর কথা অন্য ভাবে ভাববেন’’, জানালেন টমি।
ঠিক কী ধরনের অবর্জনা জমেছে এভারেস্টের গোড়ায়? রূপক ভট্টাচার্যের বক্তব্য, ‘‘ছেঁড়া তাঁবু, হাজার হাজার মিটার দড়ি, ভাঙা মই, প্লাস্টিকের প্যাকেট, আর তার সঙ্গে অক্সিজেনের প্রচুর খালি সিলিন্ডার। সিলিন্ডারগুলো নামিয়ে আনা দরকার। কারণ ওগুলো আবার ব্যবহার করা যায়।’’ এভারেস্ট থেকে কুড়িয়ে আনা এই সব চটি, তাঁবুর টুকরো জুড়ে সিয়াংবোচে নামের এলাকায় তৈরি হয়েছে এই জাদুঘর। এ সব টুকরো দিয়ে বানানো হচ্ছে পাখি বা অন্য প্রাণীর অবয়ব।
কী ভাবে আবর্জনা সরানো হচ্ছে এভারেস্ট থেকে? ‘ইকো হিমাল গ্রুপ’ নামের এক সংগঠন এই সাফাইয়ের কাজে যুক্ত। সংগঠনের সদস্য ফিনজো শেরপা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ‘ক্যারি মি ব্যাক’ নামে একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ‘‘প্রত্যেক অভিযাত্রী এবং গাইডকে অনুরোধ করা হচ্ছে, তাঁরা যেন ফেরার সময় ১ কিলোগ্রামের একটি আবর্জনার বস্তা লুকলা বিমানবন্দর পর্যন্ত সঙ্গে নিয়ে যান। পর্যটক এবং অভিযাত্রীদের সাহায্য পাওয়া গেলে কাজটা সহজ হবে।’’
কিন্তু অভিযাত্রী বা পর্যটকরা এ বিষয়ে কতটা সচেতন? বসন্ত সিংহরায়ের মত, অভিজ্ঞ অভিযাত্রীদের নিয়ে সমস্যা নেই। ‘‘যাঁরা দীর্ঘ দিন পর্বতারোহণের সঙ্গে যুক্ত তাঁরা যত্রতত্র আবর্জনা ফেলেন না। কিন্তু কম অভিজ্ঞদের নিয়েই সমস্যা হয় বেশি। এক পর্বতারোহী এক বার এভারেস্ট জয় করে ফেরার পর বেস ক্যাম্পে এসে আনন্দের চোটে অক্সিজেন সিলিন্ডারে আগুন লাগিয়ে দেন। তাঁর কিছু না হলেও, যে এজেন্সি তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল, তাদের লাইসেন্স ৫ বছরের জন্য বাতিল হয়ে যায়’’, বলছেন তিনি।
তবে কি আইনের কড়াকড়িই পারে পাহাড় পরিষ্কার রাখতে? পর্বতারোহী অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, হিমালয় পরিষ্কার রাখতে আইনের কড়াকড়ির প্রয়োজন আছে। ‘‘প্রতি বছর কিলিমাঞ্জারো আরোহণ করতে হাজার হাজার অভিযাত্রী যান। একটা লজেন্সের মোড়কও পড়ে থাকে না। তার কারণ আইনি কড়াকড়ি। ন্যাশনাল পার্ক নিয়ম করেই দিয়েছে প্রত্যেক গাইডকে বছরে অন্তত এক বার কিলিমাঞ্জারো সাফাই অভিযানে যেতে হবে’’, বলছেন অনিন্দ্য। কিন্তু ভারতে বা নেপালের পাহাড়ে তা হয় না। জ়োংরি, সিংগালিলা বা সান্দাকফুর মতো পাহাড়েও পর্যটক বা অভিযাত্রীরা বহু সময়ই সচেতনতার অভাবে আবর্জনা ফেলে আসেন। শুধু মানুষকে বুঝিয়ে এটা আটকানো যাবে না, দরকার আইনি নিয়ন্ত্রণও— এমনটাই মত তাঁর।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE
Popup Close
Something isn't right! Please refresh.