Advertisement
E-Paper

রূপে মেয়েরাই এগিয়ে, সর্বকালে-সর্বদেশে পুরুষের চেয়ে নারীই অধিক আকর্ষণীয়, অঙ্ক কষে প্রমাণ দিল বিজ্ঞান

নারীর সৌন্দর্যের বর্ণনা কেবল সাহিত্যে আবদ্ধ নয়। চিত্রকলা ও ভাস্কর্যও পুরুষের থেকে বেশি সংখ্যায় নারীরূপের স্তব করেছে যুগে যুগে। রূপে, আকর্ষণে মনুষ্যজগতে নারীই যে শ্রেয়তর, তার প্রমাণ এ বার দিল বিজ্ঞান। গাণিতিক হিসেবনিকেশে পুরুষের চেয়ে আকর্ষণে নারীকেই এগিয়ে রাখা হল অনেকখানি।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৬ জুন ২০২৬ ০৮:৫৭
New Research Suggests Women Are Considered More Attractive Than Men Across Cultures

সৌন্দর্যে ও আকর্ষণে পুরুষের চেয়ে অনেক এগিয়ে নারী, কী ভাবে প্রমাণ দিল বিজ্ঞান? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

‘নারী’ আর ‘রানী’ শব্দ দু’টিকে উল্টেপাল্টেই নাকি প্রয়াত কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর ‘নীরা’ নামের কাব্যদয়িতাকে গড়ে তুলেছিলেন। সেটা ১৯৬২। সেই সময়েই লেখা নীরাকে নিয়ে প্রথম কবিতা। ‘বাসস্টপে দেখা হল তিন মিনিট, অথচ তোমায় কাল/ স্বপ্নে বহুক্ষণ/ দেখেছি... নীরা’ মধ্যবিত্ত বাঙালি যুবকের মনে ঝড় তুলেছিল নীরা। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতায় নীরা বহু বার নানা অনুষঙ্গে নানা রূপে ফিরে এসেছে। নীরা শুধু তো কাল্পনিক চরিত্র নয়, রূপে-গুণে-আকর্ষণে পুরুষের মনে গেঁথে যাওয়া এক স্বপ্ন। ঠিক যেমন যেমন ‘বনলতা সেন’-এর রূপের রহস্য আজও বাঙালির মননে জাগ্রত। নারীরূপের বর্ণনা মানেই এক ছন্দোময়তা, কাব্যরসের অনুভূতি জোগায়। সুবিখ্যাত ‘মোনালিসা’র স্মিত হাসির মধ্যে পৃথিবীব্যাপী দর্শক আজও খুঁজে বেড়ান তার যথার্থ মর্ম। নারী সুন্দর। আকর্ষণীয়। প্রকৃতির রূপের সঙ্গে তার সৌন্দর্যের তুলনা হয়। কোথাও গিয়ে নারী ও প্রকৃতি একাকার হয়ে যায়। মহাকবি কালিদাসের ‘মেঘদূত’ কাব্যে নারীর সৌন্দর্য ও রূপের বর্ণনা এক অনন্য নান্দনিকতার সৃষ্টি করে। যক্ষ তার বিরহকাতর হৃদয়ের কল্পনায় প্রিয়ার যে শারীরিক ও মানসিক রূপ ফুটিয়ে তুলেছে, তা ভারতীয় সাহিত্যে শাশ্বত ও কালজয়ী। নারীর রূপ যুগে যুগে শিল্পী, কবি, সাহিত্যিকদের কাছে অনুপ্রেরণার প্রতীকস্বরূপ। বিজ্ঞানও তা-ই বলছে। অকপটে স্বীকার করেছে, পুরুষের চেয়ে ঢের গুণে সুন্দর ও আকর্ষণীয় নারীরা। পুরুষ তার শৌর্য-বীর্য ও বাহুবলে এগিয়ে থাকলেও, সৌন্দর্যের মাপকাঠিতে নারীর পাল্লাই বেশি ভারী।

এ শুধু কথার কথা নয়। বৈজ্ঞানিক প্রমাণও রয়েছে। মুখের গড়ন, চাহনি, নাক-ঠোঁট-ললাট সব কিছু বিচার করে গাণিতিক ফর্মুলায় ফেললে নারীর সৌন্দর্য পুরুষকে টেক্কা দিয়ে যায়। পুরুষোচিত শক্ত চোয়াল, উন্নত নাসিকা বা আয়তাকার মুখের গড়নের চেয়ে নারীর গোলগাল বা পানপাতার মতো মুখের অবয়ব পুরুষদেরও বেশি পছন্দের। জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাক্স ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা তাঁদের দীর্ঘ বছরের গবেষণা ও সমীক্ষায় এমনই দাবি করেছেন। তা ছাপা হয়েছে ‘রয়্যাল সোসাইটি বি’ জার্নালেও। গবেষক ইউগেন ভাসিলিভিটস্কি খাতায়কলমে অঙ্ক কষে দেখিয়েছেন, সাজসজ্জায়, চালচলনে, পরিধানের পরিপাটিতে অথবা অভিব্যক্তিতে বিবর্তন যতই আসুক, সৌন্দর্য ও আকর্ষণে নারীই সেরা। নারীর মুখের অন্তত ৬০ শতাংশ পুরুষের চেয়ে বেশি আকর্ষণীয়। এই ৬০ ভাগের মধ্যে মুখের গড়ন, অভিব্যক্তি, রং, ত্বকের বৈশিষ্ট্য, হাসির মাধুর্য, অলঙ্কৃত হওয়ার সহজাত রুচি, যৌবনের উচ্ছলতা, সবই আকর্ষক। প্রায় ৭৬টি দেশের ১৭ হাজার নারীর মুখের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে এবং ৩০ হাজারেরও বেশি ‘রেটিং’ দেখে বোঝা গিয়েছে, পুরুষেরা শুধু নন, একজন নারীও আর এক নারীকেই সৌন্দর্যের বিচারে এগিয়ে রেখছেন। সমকামী, অ-সমকামী, উভকামী সব ক্ষেত্রেই পরীক্ষাটি করা হয়েছে। এবং আশ্চর্যের বিষয় হল, যৌন অভিযোজন যেমনই হোক না কেন, সৌন্দর্যের মাপকাঠিতে নারীকেই বেশি নম্বর দেওয়া হয়েছে। অতি বড় রূপবান পুরুষও সেখানে ঠাঁই পায়নি।

নারীই বেশি সুন্দর?

নারীই বেশি সুন্দর?

ডারউইনের তত্ত্ব ও বিবর্তনের ইতিহাস

বিবর্তনবাদের জনক চার্লস ডারউইন যখন প্রাণিজগৎ পর্যবেক্ষণ করেছিলেন, তখন তিনি দেখেছিলেন যে, পুরুষ প্রাণীরাই সাধারণত বেশি আকর্ষক হয়। কেশর ফুলিয়ে সিংহ যখন গর্জন করে, তখন তার শৌর্য সিংহীর সৌন্দর্যকে ছাপিয়ে যায়। পেখম তুলে নৃত্যরত ময়ূর, পেখমহীন ময়ূরীর চেয়ে বেশি সুন্দর। ডারউইনের তত্ত্ব ছিল, পুরুষ প্রাণীর শারীরিক সৌন্দর্যই নারীদের আকর্ষণ করে। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন মানুষের ক্ষেত্রে তা উল্টো। নারীর সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়ে পুরুষেরাই সম্পদ, ক্ষমতা বা লড়াইয়ের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত নারীকে জয় করে নেওয়ার চেষ্টা করেছে যুগ যুগ ধরে। বিবর্তনবাদীরা দীর্ঘ দিন ধরে এই রহস্যের জট খোলার চেষ্টা করছেন। রূপের পার্থক্যে নারীরাই এগিয়ে কি না, তার কোনও পরীক্ষা বৈজ্ঞানিক ভাবে আগে করা হয়নি। ইদানীং সময়ে তা হয়েছে। তাতে দেখা গিয়েছে, যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই অমোঘ বিশ্বাস নিছকই অনুমান বা ধারণা নয়, বৈজ্ঞানিক ভাবে পরীক্ষিত সত্য। মানতে কোনও দ্বিধা নেই, যে, নারীই বেশি সুন্দর।

রূপং দেহি জয়ং দেহি

নারী কখনও রূপসর্বস্ব, কখনও শক্তিস্বরূপা। ‘ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ’-এ নারীদের কোমল অঙ্গ, উন্নত বক্ষ, পদ্মের মতো আয়ত চোখ, মুক্তার মতো দাঁত এবং চন্দ্রতুল্য দীপ্তিময় মুখের কথা বলা হয়েছে। ‘বিষ্ণু পুরাণ’-এ দেবী সীতা বা রুক্মিণীর মতো চরিত্রদের বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, তাঁদের সৌন্দর্য ত্রিভুবনে অতুলনীয়। প্রেমে আকুল শ্রীকৃষ্ণ তাঁর শ্রীরাধিকার রূপের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘‘বন্ধূকদ্যুতিবান্ধবোহয়মধরঃ স্নিগ্ধো মধুকচ্ছবি-র্গণ্ডশ্চণ্ডি চকাস্তি চন্দনতিলকপ্রোদ্ভাসি ফালস্থলী। নাসভ্যেতি তিলপ্রসূনপদবীং কুন্দদন্তি প্রিয়ে।’’ রাধিকার মুখমণ্ডলকে কোটি চাঁদের থেকেও সুন্দর বলেছিলেন তিনি। কবি জয়দেব তাঁর ‘গীতগোবিন্দ’ কাব্যে এ কথা লিখে গিয়েছেন। আবার মহিষাসুরদলনী যে দেবীমূর্তি পূজিতা হচ্ছেন, বাঙালি মননে তিনি হৈমবতী, মা মেনকার আদরিণী উমা, স্নেহময়ী জননী আবার মহেশ্বরের প্রেমময়ী পত্নী। রূপে-গুণে তিনি শ্রেষ্ঠা। তাই ভারতীয় পুরাণে তিনি যেমন রূপের আধার, তেমনই নারীশক্তি এবং অদ্বৈততত্ত্বেরও প্রতীক। তাই এত দিন পুরাণ বা সাহিত্য যা বলেছে, তাকেই স্বীকৃতি দিল বিজ্ঞান। নারীর বহুমাত্রিক রূপকেই তার আকর্ষণের মূল বলা হচ্ছে। জার্মানির গবেষকেরা যে মরফোমেট্রির প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন, সেখানে কেবল নারীর পেলব রূপ নিয়ে গবেষণা হয়নি, তার ব্যক্তিত্ব ও মনন শক্তিকেও তুলে ধরা হয়েছে।

শ্রীরাধার মুখে কোটিচন্দ্রশোভা দেখেছিলেন শ্রীকৃষ্ণ।

শ্রীরাধার মুখে কোটিচন্দ্রশোভা দেখেছিলেন শ্রীকৃষ্ণ।

রূপের অঙ্ক

মরফোমেট্রি বিজ্ঞান ও গণিতের এমন একটি শাখা, যেখানে কোনও জীবের শারীরিক গঠন, আকার-আকৃতি সবই অঙ্ক কষে পরিমাপ করা হয়। নারীর মুখমণ্ডল কেন বেশি আকর্ষণীয় দেখায়, তা কেবল ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নয়, সেখানেও মরফোমেট্রির মতো গাণিতিক হিসেব কাজ করে। তা কী রকম, সেই ব্যাখ্যাই দিয়েছেন জার্মানির গবেষকেরা। মরফোমেট্রিক বিশ্লেষণে মানুষের মুখের কিছু নির্দিষ্ট অংশ, যেমন চোখের কোন, নাকের ডগা, ঠোঁটের সীমানা বা চোয়ালের হাড় বিশ্লেষণ করা হয়। আর সেটি করা হয় কম্পিউটার অ্যালগরিদমে। সে ভাবে জ্যামিতিক নকশা তৈরি হয়। সেখানে মুখের প্রতিটির অংশের অনুপাত বার করা হয়। সে অনুপাত কেমন হবে, তার উপরেই নির্ভর করবে একজন কত বেশি সুন্দর। গবেষকেরা দেখিয়েছেন, মহিলাদের ক্ষেত্রে তা সব সময়েই পুরুষদের চেয়ে এগিয়ে।

মরফোমেট্রিতে মুখমণ্ডলের নিখুঁত গাণিতিক হিসেব বার করেছেন গবেষকেরা।

মরফোমেট্রিতে মুখমণ্ডলের নিখুঁত গাণিতিক হিসেব বার করেছেন গবেষকেরা।

আগে গোল্ডেন রেশিয়ো দিয়ে তা পরিমাপ করা হত। সেটি ছিল প্রাচীন গ্রিক গণিতের একটি হিসেব। চোখ, নাক, মুখের মাপ দেখে তা বিচার করা হত। মুখের দৈর্ঘ্যকে প্রস্থ দিয়ে ভাগ করে যা ভাগফল হবে সেটিই হল গোন্ডেন রেশিয়ো। মেয়েদের সৌন্দর্যের ক্ষেত্রে এই ‘গোল্ডেন রেশিয়ো’ ধরা হয় ১.৬১৮। বিশ্বে কোন কোন মহিলা বেশি সুন্দর ও নিখুঁত মুখাবয়বের অধিকারী, তা এই হিসেব দিয়ে আগেও মাপা হয়েছে। সেখানে প্রথম দশ জনের মধ্যে বলিউড অভিনেত্রী দীপিকা পাডুকোনের নামও এসেছিল। তবে এখন শুধু গোল্ডেন রেশিয়ো নয়, মরফোমেট্রি দিয়ে ডিজিটাল হিসেবনিকেশ করছেন গবেষকেরা।

মরফোমেট্রিতে পুরুষের মুখমণ্ডল সাধারণত কৌণিক বা আয়তাকার হয়, যেখানে চোয়াল অনেক বেশি দৃঢ় হয়। অন্য দিকে, নারীর মুখমণ্ডল জ্যামিতিক দিক থেকে বেশি বৃত্তাকার বা ডিম্বাকার হয়। এই গোলাকার গঠনকে বলা হয় ‘নিয়োটেনিক’ অর্থাৎ শিশুসুলভ কোমলতা। অথচ দৃঢ় চারিত্রিক গঠন। এই বৈশিষ্ট্য মেয়েদেরই থাকে। বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা বলছে, মেয়েদের কোমল মুখাবয়বকে নিরাপদ আশ্রয় ভেবে নেওয়া যায়, যা পুরুষদের ক্ষেত্রে সাধারণত হয় না। পুরুষদের টেস্টোস্টেরন হরমোন তা হতে দেয় না। ভিতর থেকে শক্তপোক্ত একজন নারীর মুখেও সেই পেলবতা থাকে যা পুরুষের থাকে না। এখানেই পার্থক্য। আর এখানেই মেয়েরা এগিয়ে। ১৯৭২ সালে মার্কিন লেখিকা সুজান সোনট্যাগ তাঁর ‘দ্য ডাবল স্ট্যান্ডার্ড অফ এজিং’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন, সমাজ নারীর মূল্যকে তাঁর সৌন্দর্যের সঙ্গে এবং সৌন্দর্যকে তাঁর যৌবনের সঙ্গে তুলনা করে, যা পুরুষদের ক্ষেত্রে করা হয় না। এই গবেষণাতেও সোনট্যাগের ভাবনার কিছুটা প্রতিফলন দেখা গিয়েছে।

তবে বিজ্ঞান যা-ই বলুক না কেন, ‘সৌন্দর্য’ বিষয়টি সর্বদাই স্থান-কাল-পাত্র নির্ভর। মধ্যযুগের ইউরোপে যা সুন্দর বলে বিবেচিত হত, সমকালীন বঙ্গে তা না-ও হতে পারে। ভারতীয় ভাস্কর্যে নারী যে ভাবে প্রতিফলিত, পশ্চিমি ভাস্কর্যে তা নয়। আবার মিকেলেঞ্জেলোর ‘ডেভিড’ পুরুষ- সৌন্দর্যকে এতটাই গুরত্ব দেয় যে, তা নারী অবয়বের প্রতিস্পর্ধী হয়ে দাঁড়ায়। ‘গীতগোবিন্দম’-এর শ্রীকৃষ্ণ শ্রীরাধার মুখে কোটিচন্দ্রশোভা দেখতেই পারেন, কিন্তু তা বলে বলরামও যে তা দেখবেন, তার কোনও স্থিরতা নেই। আর্ট আর বাস্তবের জীবনে ফারাক বিস্তর। বিজ্ঞান বা এ ক্ষেত্রে মরফোমেট্রি বাস্তবের কথাই বলছে। কিন্তু মানবীচেতনাবাদীরা প্রশ্ন তোলেন, যুগে যুগে পুরুষশাসিত সমাজই স্থির করে নারীসৌন্দর্যের মাপকাঠি। একজন নারী যদি অন্য নারীর রূপে মুগ্ধ হয়ে থাকেন, তবে তার পিছনেও কাজ করছে ‘মেল গেজ’ বা পুরুষ-নজর, যা নারীর চিন্তনপ্রক্রিয়াকেও নির্ধারণ করে দেয়। সেখানে রূপের অঙ্ক কোনও চিরকালীন এবং সমসত্ত্ব মাপকাঠি তৈরি করতে পারে কি না, সন্দেহের অবকাশ থেকেই যায়।

Attraction Human Relation Women power Beauty
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy