‘‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে’’
সন্তানকে ভাল রাখতে কে না চান! ভাল স্কুল, ভাল জামাকাপড়, পছন্দের খাবার, বেড়াতে যাওয়া, বিলাসবহুল অভিজ্ঞতা— সব অভিভাবকই চেষ্টা করেন ছেলেমেয়েদের সেরাটা দিতে। কিন্তু সেই চেষ্টার মাঝেই একটা প্রশ্ন থেকে যায়। সন্তানকে সব কিছু সহজে দিয়ে দিলে, সে কি জিনিসের আসল মূল্য বুঝতে শিখবে? প্রযোজক-পরিচালক ফরাহ খানের মাথাতেও সেই প্রশ্নই ঘুরপাক খায়। আর তাই তিন সন্তান পালনে বিশেষ পন্থা অবলম্বন করেন তিনি। আপনি যদি অভিভাবক হন, এই পদ্ধতি শিক্ষণীয় হতে পারে আপনার কাছেও।
ফরাহ জানিয়েছেন, তিনি নিজে বিমানের বিজ়নেস ক্লাসে ভ্রমণ করলেও তাঁর তিন সন্তান ইকোনমি ক্লাসেই যাতায়াত করেন। কারণ তাঁর বিশ্বাস, বিলাসিতা জন্মগত অধিকার নয়, সেটা অর্জন করতে হয়।
শুনতে কঠোর, কিন্তু এর নেপথ্যে রয়েছে সন্তানকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা।
১. কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে
নতুন প্রজন্মের শিশুরা ছোট থেকেই নানা সুযোগ-সুবিধার মধ্যে বড় হচ্ছে। ফলে অনেক সময়ে তারা ধরে নেয়, সব কিছু পাওয়া স্বাভাবিক। ডিজিটাল যন্ত্র থেকে শুরু করে কেতাদুরস্ত খাবারদাবার। ফরাহ চান, তাঁর সন্তানেরা বুঝুন, জীবনের সব আরাম সহজে আসে না। কোনও কিছু পেতে গেলে পরিশ্রম করতে হয়, অপেক্ষা করতে হয়, নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয়। ফরাহর প্রশ্ন, ‘‘তারা এখনই এমন কী করেছে, যাতে তারা বিজ়নেস ক্লাসে বসে যাত্রা করবে? এখন থেকেই এই সুবিধাগুলি দিতে থাকলে আমি নিজেই বিপদে পড়ব।’’ ফরাহর মতে, তারকাসন্তান বলেই সমস্ত সুবিধা পাওয়া উচিত নয়।
২. সেরাতেই আনন্দ নয়
ফরাহ বলছেন, অনেক বাবা-মা ভাবেন, সেরাটা না দিলে তারা অসুবিধায় পড়বে। কিন্তু তিনি নিজের তিন সন্তানকে বিমানের সস্তা টিকিটে বসিয়ে দেখেছেন, তাঁরা নিজেদের মতো কানে হেডফোন নিয়ে সিনেমা দেখেন, আনন্দ করতে করতে যান। তাঁরা গন্তব্য নিয়ে বেশি উৎসাহী, ছুটি কাটানো নিয়ে আগ্রহী, কিসে চেপে যাচ্ছেন, তা নিয়ে নয়। সেরাটা দিতে না পারলেও ছেলেমেয়েরা নিজেদের মতো মানিয়ে নিতে পারে। অন্তত সেই শিক্ষাই দেওয়া উচিত।
৩. পরিশ্রমের মূল্য বোঝা
ফরাহর মতে, সন্তানদের বুঝতে হবে যে সাফল্য এবং সুযোগ-সুবিধার মধ্যে একটা সম্পর্ক আছে। যে কঠোর পরিশ্রম করে, নিজের লক্ষ্য পূরণ করে, সে অনেক সময়ে জীবনে বেশি সুবিধা পায়। এই সত্যিটা ছোট থেকেই জানলে শিশুরা নিজেদের লক্ষ্য নিয়ে আরও সচেতন হতে পারে। দরকারে মা-বাবা বা দাদু-ঠাকুরমার পরিশ্রম সম্পর্কে অবগত করতে হবে তাদের।
৪. সুবিধাভোগী মানেই খারাপ নয়
ফরাহর ছেলে এক বার তাঁকে বলেছিলেন, ‘‘আমার মনে হয়, আমি খারাপ, নষ্ট হয়ে যাওয়া।’’ এক দিকে যেমন কষ্ট করতে শেখানোর চেষ্টা করছেন, উল্টো দিকে তাঁর সন্তানেরা যেন সুবিধাভোগী বলে অপরাধবোধে না ভোগেন, সে শিক্ষাও তাঁদের দিয়েছেন ফরাহ। আর তাই তাঁর উত্তর ছিল, ‘‘না, তোমরা নষ্ট বা খারাপ নও, তোমরা সুবিধাভোগী শ্রেণির। আমরা কষ্ট করেছি, যাতে তোমরা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়িতে করে ভাল স্কুলে পড়তে পারো, যেখানে ক্লাসগুলিতেও এসি রয়েছে।’’ তাই অপরাধবোধ নয়, বরং কৃতজ্ঞ হতে শিখতে হবে। যখন কোনও জিনিসের জন্য অপেক্ষা করতে হয় বা নিজের চেষ্টায় কিছু পাওয়া যায়, তখন তার আনন্দও বেশি। মনোবিদেরা বলেন, যে সব শিশু ছোট থেকেই কৃতজ্ঞ হতে শেখে, তারা বড় হয়ে অনেক বেশি বাস্তববাদী এবং মানসিক ভাবে শক্ত হয়। তারা যা পেয়েছে, তার মূল্যও বেশি বোঝে। আর ফরাহর মতো এই বিষয়ে সন্তানদের সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা করা উচিত।
৫. ‘না’ বলাও ভালবাসার অংশ
অনেক সময় অভিভাবকেরা মনে করেন, সন্তানের কোনও আবদার ফিরিয়ে দেওয়া মানে তাকে কষ্ট দেওয়া। কিন্তু সব আবদার পূরণ করাই যে ভালবাসা, তা নয়। কখনও কখনও ‘এখন নয়’ বা ‘এটার প্রয়োজন নেই’— এই কথাগুলিও সন্তানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়ে ওঠে। এতে ধৈর্য বাড়ে, অপেক্ষা করার অভ্যাস তৈরি হয় এবং হতাশা সামলানোর ক্ষমতাও গড়ে ওঠে।