সন্তানের শিক্ষাদীক্ষা বললে অভ্যাসবশেই স্কুলের পড়াশোনার কথা মনে পড়ে বেশির ভাগ বাবা-মায়ের। কিন্ত কার্যক্ষেত্রে সেই স্কুলশিক্ষার চেয়ে ভবিষ্যতে যেটা বেশি কাজে লাগে, তা হল বাবা-মা এবং অভিভাবকের থেকে প্রাপ্ত বাস্তব জীবনের ‘দীক্ষা’। সঞ্চয় দৈনন্দিন জীবনে কাজে লাগার মতো তেমনই এক জরুরি পাঠ। যা সাধারণত স্কুলপাঠ্য বইয়ে থাকে না। মেলে জীবন থেকে। অনেকেই ঠেকে শিখে তার পরে এর প্রয়োজন বোঝেন। কিন্তু সময় থাকতে যদি বাবা-মায়ের কাছেই সেই শিক্ষা পাওয়া যায়, তা হলে? সে ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আসন্ন জীবন অনেকটা সহজ হয়ে যায়।
সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। এর মধ্যে সন্তানকে যদি যথাযথ ভাবে মানুষ করতে হয় তবে কঠোর বাস্তবের সঙ্গে পা মিলিয়ে চলার শিক্ষাও দিতে হবে। কিন্তু সন্তানকে যথাযথ ভাবে সঞ্চয়ের শিক্ষা দেবেন কী ভাবে?
সন্তানকে সঞ্চয়ের শিক্ষা
সঞ্চয়ী হতে শেখানো মানে শুধু টাকা জমাতে বলা নয়, বরং তাকে পরিকল্পনা আর ধৈর্যেরও শিক্ষা দেওয়া।
১. তিনটি মাটির ‘ভাঁড়’
প্রথমেই ব্যাঙ্কের শিক্ষা না দিয়ে বরং তিনটি টাকা জমানোর ‘ভাঁড়’ কিনুন। মাটির ভাঁড় কিনতে পারেন। তবে আরও ভাল হবে তিনটি স্বচ্ছ কাচের বয়াম ব্যবহার করতে পারলে। এতে কত টাকা জমছে তা দেখাও যাবে। তিনটি টাকার বয়ামের তিনটি নাম দিন—
জমা : দীর্ঘমেয়াদি কোনও লক্ষ্যের জন্য টাকা জমা করা।
খরচ : ছোটখাটো শখ পূরণের টাকা জমানোর জন্য।
দান : অন্যকে সাহায্য করার আনন্দ অনুভব করার জন্য। এটি সন্তানকে সমাজ সম্পর্কে সচেতন করবে এবং অর্থের উপযুক্ত ব্যবহারও শেখাবে।
২. ‘ম্যাচিং স্কিম’
মানে সন্তান যত জমাবে, তার হিসাবে পুরস্কার হিসাবে আপনিও তার নামে কিছু জমাবেন। সন্তানকে বলুন, সে যদি তার জমানো টাকা থেকে ১০০ টাকা কোনও বিশেষ উদ্দেশ্যে জমায়, তবে আপনি আরও ২০, ৩০, ৪০ বা ৫০ টাকা পুরস্কার হিসেবে তাতে যোগ করবেন। এতে সে আরও বেশি জমানোর জন্য উৎসাহিত হবে।
৩. ‘প্রয়োজন’ বনাম ‘ইচ্ছা’
কেনাকাটা করতে গেলে সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে বেরোন। কোনও জিনিস দেখে সে বায়না করলে তার কাছে জানতে চান, "ওই জিনিসটি না পেলে কি কোনও ক্ষতি হবে। না কি এটা শুধুই ইচ্ছে হয়েছে বলে কিনতে চাইছ?’’ প্রয়োজন আর ইচ্ছের পার্থক্য বুঝতে শিখলে সন্তান নিজেই ঝোঁকের বশে কিনে ফেলার অভ্যাস বদলাবে।
৪. পারিবারিক বাজেট মিটিং
সপ্তাহে বা মাসে এক দিন সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে বসে বাজেট তৈরি করুন। তাকে দেখান বিদ্যুৎ বিল, খাবার কেনার খরচ এবং ইন্টারনেটের পিছনে কত টাকা ব্যয় করতে হয়। তাকে ছোট কোনও একটি দায়িত্বও দিন। যেমন— মাসের বিস্কুট কেনা বা চিপস-চানাচুরের প্যাকেট কেনা। এতে সে অর্থের মূল্য বুঝতে শিখবে। বুঝে খরচ করতেও শিখবে।
৫. ‘অপেক্ষা করার নিয়ম’
কোনও দামি খেলনা বা গ্যাজেট চাইলে সঙ্গে সঙ্গেই না কিনে দিয়ে বলুন, "৪৮ ঘণ্টা পর এটা নিয়ে আবার ভাবব।" অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, দু’দিন পর জিনিসটির প্রতি আগ্রহ কমে যায়। এই পদ্ধতি কেনাকাটার ব্যাপারে তাৎক্ষণিক আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে শেখাবে।
৬. কাল্পনিক ‘ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্ট’
যদি সন্তান একটু বড় হয়, তবে ব্যাঙ্কের পাসবুকের মতো তার একটি হিসাবের খাতা তৈরি করে দিন। প্রতি বার সে টাকা জমালে বা খরচ করলে সেখানে এন্ট্রি করবে। বছরশেষে তাকে কিছু ‘সুদ’ বা লভ্যাংশও দিতে পারেন। তাতে সে বুঝবে, টাকা ফেলে না রেখে কোথাও বিনিয়োগ করলে তা বৃদ্ধি পাবে।
আর যা মনে রাখবেন
১) নিজে যদি অপচয় করেন, তবে সন্তান সঞ্চয় শিখবে না।
২) সন্তানকে নিজের জমানো টাকা থেকে কিছু কিনতে দিন। যদি কেনার পর সে বুঝতে পারে, জিনিসটি ভাল ছিল না, তবে সেই আক্ষেপ তাকে ভবিষ্যতে আরও সতর্ক করে তুলবে।
৩) সন্তানকে এ কথাও শেখান যে, আনন্দ পেতে সব সময় অর্থ ব্যয় করতে হয় না। একটি টাকাও ব্যয় না করে আরও নানা ভাবে ভাল থাকা যায়।