প্রয়াত হলেন সমাজতত্ত্ববিদ আন্দ্রে বেতেই। মঙ্গলবার রাতে দিল্লিতে নিজের বাসভবনেই তিনি মারা যান। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৯১ বছর।
বেতেইয়ের জন্ম ১৯৩৪ সালে চন্দননগরে। ফরাসি পিতা ও বাঙালি মায়ের সন্তান বেতেইয়ের পড়াশোনা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃতত্ত্ব নিয়ে। এখান থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভের পরে তিনি পিএইচডি সম্পন্ন করেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ভারতের বর্ণ, জাত এবং সামাজিক ক্ষমতা কাঠামোর বিশ্লেষক হিসাবে বেতেই খুব অল্প বয়সেই বিদ্যাচর্চার জগতে পরিচিতি লাভ করেন। জীবিকা হিসাবে শিক্ষকতাকেই বেছে নেন এই ফরাসি-বঙ্গসন্তান। প্রথমে কিছু দিন কলকাতার ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটে অধ্যাপনা করেন, পরে সমাজবিদ্যার অধ্যাপক হিসাবে যোগ দেন দিল্লি স্কুল অফ ইকোনমিকসে। পড়িয়েছেন অক্সফোর্ড, কেম্ব্রিজ এবং শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়েও। একসময় কলকাতার সেন্টার ফর স্টাডিজ় ইন সোশ্যাল সায়েন্সেস এবং ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ সোশ্যাল সায়েন্স রিসার্চ-এর চেয়ারম্যান হিসাবে কাজ করেছেন। পরবর্তী সময়ে বেতেই শিলংয়ের নর্থ ইস্টার্ন হিল ইউনিভার্সিটির চ্যান্সেলর এবং অশোকা ইউনিভার্সিটির প্রথম চ্যান্সেলর হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেন।
বেতেইয়ের প্রাথমিক গবেষণার বিষয় ছিল তামিলনাড়ুর তাঞ্জাভুর তথা তাঞ্জোরের গ্রামাঞ্চলের জাত ও বর্ণ কাঠামো ও সামাজিক ক্ষমতায়ন। পরবর্তী কালে সেই ক্ষেত্রটিই বড় হতে থাকে। সামাজিক অসাম্য এবং ক্ষমতায়নের বহুমাত্রিকতাকে বেতেই তাঁর আজীবনের লেখালিখিতে তুলে আনেন। তাঁর রচিত গ্রন্থগুলির মধ্যে ‘কাস্ট, ক্লাস অ্যাণ্ড পাওয়ার: চেঞ্জিং প্যাটার্ন অফ স্ট্র্যাটিফিকেশন ইন আ তাঞ্জোর ভিলেজ’, ‘ইনইকুয়ালিটি অ্যান্ড সোশ্যাল চেঞ্জ’, ‘ইনইকুয়ালিটি অ্যামং মেন’, ‘ক্রনিক্ল অফ আওয়ার টাইম’ বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে।
বেতেইয়ের নব্বই বছরের জন্মদিন উপলক্ষে ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ সংবাদমাধ্যমে লেখা এক নিবন্ধে সমাজ-ইতিহাসবিদ রামচন্দ্র গুহ তাঁকে ‘একাধারে বাঙালি ও সর্বভারতীয় নাগরিক’ হিসাবে বর্ণনা করেছিলেন। দিল্লি স্কুল অফ ইকোনমিকসের অধ্যাপক গৌতম পাল জানান, দিল্লি স্কুল অফ ইকোনমিকসেই তাঁর সঙ্গে বেতেইয়ের আলাপ হয়। যেহেতু দু’জনেই বাঙালি, তাই আলাপ জমে ওঠে। বেতেইয়ের দিদি লিনা বেতেইয়ের শ্বশুরবাড়ি ছিল কলকাতার বাগবাজারে। সেই সূত্রে উত্তর কলকাতার সঙ্গেও বেতেইয়ের বেশ ঘনিষ্ঠ পরিচয়ই ছিল।
চন্দননগরের বিশিষ্ট মানুষেরা বেতেইকে ‘চন্দননাগরিক’ হিসাবেই মনে করতেন। চন্দননগরবাসী ইতিহাস গবেষক কল্যাণ চক্রবর্তী বেতেইয়ের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে বলেন, “তাঁর প্রয়াণ মানে চন্দননগরের নক্ষত্রপতন।” চন্দননগরের বর্তমান মেয়র রাম চক্রবর্তীও শোক প্রকাশ করেছেন।
ভারত সরকার বেতেইকে পদ্মভূষণ সম্মান প্রদান করে। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে প্রদান করে ফেলো অফ দি ব্রিটিশ অ্যাকাডেমি সম্মান।
আজীবন বঞ্চিত, নিপীড়িত মানুষ এবং সামাজিক অসাম্যের বিরুদ্ধে সরব বেতেই ব্যক্তিগত ভাবে ছিলেন নিরহংকারী এবং বিনয়ী। তাঁর প্রয়াণে কলকাতার বিদ্বৎসমাজও শোকাহত।