দু’টি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ বললেই মন চলে যায় উত্তরবঙ্গের নয়নভোলানো চা-বাগানে। দেশের উৎকৃষ্ট মানের চা বলতে দার্জিলিং চায়ের কথাই আগে আসে। যেমন তার স্বাদ, তেমনই গুণ। এমন রূপ-রস-গন্ধে সমৃদ্ধ চায়েই বাঙালি তর্কের তুফান তুলতে পারে। একসময় মদ্যপকে ‘মাতাল’ বলার চটুল অনুকরণে প্রাক্স্বাধীনতা যুগে ‘চা-খোর’কে ‘চাতাল’ বলেছে বাঙালি। আর সে চা-পাতা যদি চন্দ্রালোকে তোলা হয়, তা হলে তার স্বাদে ‘চাতাল’ না হয়ে উপায় থাকে না। উত্তরবঙ্গের কুয়াশাঘেরা চা-বাগানগুলিতে পূর্ণিমার রাতে এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটে। জ্যোৎস্নার স্নিগ্ধ আলোয় গোটা চরাচর যখন নিশ্চুপ, তখন একদল দক্ষ শ্রমিক অত্যন্ত যত্নে বেছে বেছে তুলে নেয় দু’টি পাতা ও একটি কুঁড়ি। চাঁদের আলোয় চা-পাতা তোলার এই রেওয়াজ প্রাচীন, উত্তরবঙ্গে তা উৎসবের চেয়ে কম কিছু নয়। এই প্রথাকে বলা হয় ‘মুনলাইট টি প্লাকিং’ বা ‘মুনলাইট হার্ভেস্টিং’। বিশ্বের উৎকৃষ্ট মানের চা চন্দ্রালোকেই তোলা হয়। আর সে চায়ের স্বাদ আর পাঁচরকমের সাধারণ চায়ের চেয়ে অনেক আলাদা। দামেও আকাশছোঁয়া।
আলিপুরদুয়ারের মাঝেরডাবরি চা-বাগান, কার্শিয়াঙের মকাইবাড়ি এবং মিরিকের ওকাইতি চা-বাগানেই মূলত পূর্ণিমার রাতে চা-পাতা তোলা হয় রীতিমতো জাঁকজমকের সঙ্গে। তা ছাড়া ক্যাসলটন, আমবুটিয়ার মতো গুটিকয়েক চা-বাগানে এই রীতি প্রচলিত। পূর্ণিমার রাতে চা-বাগানগুলিতে জ্বলে ওঠে মশাল। আলো লাগানো বিশেষ টুপি পরে চা তুলতে নেমে পড়েন দক্ষ শ্রমিকেরা। মাদলের তালে তালে উৎসব শুরু হয়ে যায়। এই দৃশ্য দেখতে পর্যটকের ঢল নামে রাতের চা-বাগানগুলিতে। এমন বিরল অভিজ্ঞতার সাক্ষী হতে আসেন বিদেশি পর্যটকেরাও। বহু দিন ধরে উত্তরবঙ্গ পর্যটনেরও একটি অংশ হয়ে উঠেছে এই ‘মুনলাইট প্লাকিং’।
বিশ্বের উৎকৃষ্ট মানের চা চন্দ্রালোকেই তোলা হয়।
চিন থেকে চায়ের চারা এল কলকাতায়
ভারতে চা-পানের ধারায় কিছু আঞ্চলিক বৈচিত্র থাকলেও, কোথাও একটা ঐক্যের গ্রন্থি রয়েছে — তা হল আবেগ। বিশেষ করে বাঙালিদের মধ্যে। চা ছাড়া সকালটা পানসে। ‘এক কাপ চায়ে’ই প্রেম খুঁজে নেওয়া যায় অবলীলায়। বাঙালির বৈঠকি আড্ডায় চা মানেই দার্জিলিঙের খাঁটি সুবাস। যে চা নিয়ে এত মাদকতা, সেই চা কিন্তু এ দেশের সম্পদ নয়।
প্রায় চার হাজার বছর আগে চিনে পানীয় হিসেবে চা-এর প্রচলন। চাঁদের আলোয় চা-পাতা তোলার রেওয়াজও তাদেরই। যদিও এখন সারা বিশ্বেই তা সমাদৃত। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের কিছু চা-বাগানে এই প্রথাটি পালিত হয়ে আসছে নিয়ম ও নিষ্ঠা মেনে। তবে চা কিন্তু হঠাৎ করেই চিন থেকে এ দেশে চলে আসেনি। এর পিছনেও রেয়েছে লম্বা ইতিহাস।
প্রায় চার হাজার বছর আগে চিনে পানীয় হিসেবে চা-এর প্রচলন।
সপ্তদশ শতাব্দীর গোড়ায় চিন থেকে ওলন্দাজেরা ইউরোপে চা নিয়ে যেত। ওদিকে ব্রিটেনকে চা দিয়ে চিন নিত আফিম। কিন্ত এই মৈত্রী টিকল না। দুই দেশের মধ্যে বাধল ভীষণ যুদ্ধ — ‘ওপিয়ম ওয়ার’। পরে ইংরেজদের থেকে চা পেল ভারত। ১৮৩৯-এ ইংরেজদের ‘আসাম কোম্পানি’ ভারতে বাণিজ্যিক ভাবে চা-চাষ শুরু করল। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উদ্যোগে ১৮৪৮-এ স্কটিশ উদ্ভিদবিদ রবার্ট ফরচুন চিনের প্রত্যন্ত গ্রামগুলি ঘুরে, লুকিয়ে সংগ্রহ করে কলকাতায় পাঠালেন উচ্চমানের চা-গাছের বীজ আর প্রায় কুড়ি হাজার চারাগাছ। ১৮৫০ নাগাদ সেই লুকিয়ে আনা চা-চারা দিয়েই দার্জিলিঙে চা-বাগানের গোড়াপত্তন হল। তবে চা যেহেতু ব্রিটিশদের হাত ধরে এ দেশে আসে, তাই চা-পানের ধারায় এ দেশ ইউরোপের ভাবধারায় প্রভাবিত। ক্ষুদ্র চিনে-পেয়ালার আকার বড় করে ইউরোপ তাতে হাতল জুড়ে দেয়। দুধ-চিনি দিয়ে চা-পানের অভ্যাসও তাদের থেকেই পাওয়া। তাই চিন চায়ের জন্মভূমি হলেও, তাদের মতো করে চা-পানের ঐতিহ্য বা আধ্যাত্মিক দর্শন এ দেশে তেমন ভাবে এল না। কেবল একটি রীতিই এল পরবর্তী সময়ে। তা হল পূর্ণিমায় চাঁদের আলোয় চা-পাতা তোলা।
স্কটিশ উদ্ভিদবিদ রবার্ট ফরচুন চিন থেকে লুকিয়ে সংগ্রহ করে কলকাতায় পাঠান প্রায় কুড়ি হাজার চায়ের চারা।
মনে করা হয়, চিনের তাং এবং সং রাজবংশের রাজত্বকালে প্রথম এই প্রথার উদ্ভব হয়। তৎকালীন চিনা সম্রাটদের ধারণা ছিল, দিনের বেলায় সূর্যের আলোয় চা পাতার কোমলতা ও সুবাস, দুই-ই নষ্ট হয়ে যায়। চড়া রোদ চা-পাতা পুড়িয়ে দেয়। চায়ের ‘পবিত্রতা’ আর থাকে না। তাই সেই চা রাজ-অন্তঃপুরে যাওয়ার অযোগ্য। রাজারা যে চায়ে চুমুক দেবেন, তা তোলা হবে রাতের আঁধারে। এর জন্য দিনক্ষণও স্থির হয়। বসন্তের নির্দিষ্ট পূর্ণিমার রাতে জ্যোৎস্নার আলো যখন চরাচর ভাসিয়ে দেবে, তখনই অতি সন্তর্পণে দু’টি পাতা ও একটি কুঁড়ি তুলে নেওয়া হবে। আর তা তোলার দায়িত্বে থাকবেন কুমারী কন্যারা। এখন অবশ্য সে নিয়মকানুন তেমন ভাবে না থাকলেও, চাঁদের আলোয় চা-পাতা তোলার প্রথাটি রয়ে গিয়েছে। চিনের ইউনান প্রদেশে এই প্রথারই নাম ‘ইউয়ে গুয়াং বাই’ বা ‘মুনলাইট হোয়াইট টি’।
দার্জিলিং পাহাড়ের আভিজাত্য ‘মুনলাইট প্লাকিং’
পশ্চিমবঙ্গে, বিশেষ করে দার্জিলিঙের পাহাড়ি এলাকায় চন্দ্রালোকে চা-পাতা তোলার রেওয়াজ প্রথম শুরু হয় মকাইবাড়ি চা-বাগানে। ১৯৭০-এর দশকে ‘মুনলাইট প্লাকিং’-এর পথ দেখায় মকাইবাড়িই। স্বাদে-গন্ধে সে চা বিশ্বের বাজারে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ২০১৪ সালে মকাইবাড়ির চন্দ্রালোকে তোলা চা প্রতি কেজি ১,৮৫০ মার্কিন ডলারে (তৎকালীন ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১ লক্ষ ১১ হাজার টাকা) বিক্রি হয়ে বিশ্বরেকর্ড গড়ে। স্বাভাবিক ভাবেই দার্জিলিং চায়ের নামযশ আরও বাড়ে। এখন মাঝেরডাবরি, ওকাইতি, ক্যাসলটনের মতো কয়েকটি চা-বাগানে চন্দ্রালোকে চা-পাতা তোলার রেওয়াজ রয়েছে।
পূর্ণিমা রাতে চা-বাগানে জ্বলে ওঠে মশাল, মাদলের তালে দু’টি পাতা ও একটি কুঁড়ি তোলেন দক্ষ চা-শ্রমিকেরা।
চাঁদের আলোয় আরও মোহময়ী হয়ে ওঠে দু’টি পাতা ও একটি কুঁড়ি, এমনই মত মাঝেরডাবরি চা-বাগানের ম্যানেজার চিন্ময় ধরের। তিনি বলেন, ‘‘ফুল যেমন রাতের বেলায় সুরভিত হয়ে ওঠে, চা-পাতাও চাঁদের আলোয় হেসেখেলে ওঠে। সে সময়ে চা পাতা তুললে তার স্বাদ ও গন্ধ, দুই-ই অনেক বেশি হয়। মাঝেরডাবরিতে দোলপূর্ণিমা, কোজাগরী পূর্ণিমা এবং বুদ্ধপূর্ণিমায় ‘মুনলাইট প্লাকিং’ হয়। দেশে একমাত্র মুনলাইট সিটিসি চা আমরাই তৈরি করি। সন্ধ্যা থেকে শুরু হয় চা তোলা, চলে রাত অবধি। প্রায় দু’শো থেকে আড়াইশো শ্রমিককে কাজে লাগানো হয়। প্রচুর পর্যটক আসেন চা তোলা দেখতে। চাঁদের অভিকর্ষজ বলের ক্রিয়ায় মাটি থেকে পুষ্টিরস আরও বেশি পরিমাণে উঠে আসে চা-গাছে। চায়ের পাতা ও কুড়ি টইটম্বুর হয়ে ওঠে সেই পুষ্টিরসে। এই পাতা ও কুঁড়িই আমরা ‘প্লাক’ করে ‘অ্যারেস্ট’ করি। পরদিন সকালে সেগুলিরই প্রক্রিয়াকরণ করা হয়। তার পর যায় বিভিন্ন আউটলেটে।’’ মাঝেরডাবরিতে চাঁদের আলোয় তোলা চা-পাতার চাহিদা কলকাতায় তো বটেই, দেশের অন্যান্য রাজ্যেও রয়েছে। চিন্ময়বাবু জানান, আলিপুরদুয়ার, মালদহ, শিলিগুড়ি, দিল্লি, মুম্বইয়ে তাঁদের একাধিক আউটলেটে এই চা বিক্রি হয়। তা ছাড়া অনলাইনেও মাঝেরডাবরির ‘মুনলাইট টি’ পাওয়া যায়।
কলকাতায় সুবোধ ব্রাদার্সে মুনলাইট চায়ের নানা সংস্করণ রয়েছে। দোকানের এক কর্মী সঞ্জিত মণ্ডল বলেন, ‘‘কেজিপ্রতি ৮ থেকে ৯ হাজার টাকার চা যেমন রয়েছে, তেমনই ২৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার বা তার বেশি দামের চা-ও রয়েছে। এই চা সবচেয়ে উৎকৃষ্ট মানের। এর স্বাদ ও গন্ধ গবেষণাগারে পরীক্ষা করে যাচাই করা হয়েছে।’’
চাঁদের আলোয় তোলা চা স্বাদে ও গন্ধে অনেকটাই আলাদা।
চন্দ্রালোকে তোলা চা কেন স্বাদে-গন্ধে সেরা?
চাঁদের আলোয় তোলা চায়ের স্বাদ বা গন্ধ কেন আলাদা, তার নেপথ্যে রয়েছে ‘বায়োডায়ানামিক ফার্মিং’-এর জাদু। জৈব সার ও মহাজাগতিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে চাষ করার বিশেষ পদ্ধতি হল ‘বায়োডায়ানামিক ফার্মিং’। সাধারণ জৈব চাষের থেকে এটি আলাদা। ১৯২৪ সালে অস্ট্রিয়ার বিজ্ঞানী ও দার্শনিক রুডলফ স্টাইনার ‘বায়োডায়ানামিক ফার্মিং’ শেখান। এই পদ্ধতিতে চাষের প্রতিটি কাজ, যেমন বীজ বোনা, সার দেওয়া, ছাঁটাই করা এবং ফসল তোলা — চাঁদ, সূর্য এবং নক্ষত্রের অবস্থানের উপর ভিত্তি করে হয়। চাঁদের আলোয় চা-পাতা তোলার কাজটিও ‘বায়োডায়ানামিং ফার্মিং’-এরই একটি অংশ।
‘মুনলাইট প্লাকিং’-এর ভিত্তি হল চাঁদের মহাকর্ষজ টান বা ‘গ্র্যাভিটেশনাল পুল’। এমনটাই জানালেন কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ও প্রাক্তন এইচওডি সুদেষ্ণা শ্যাম চৌধুরী। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের প্রধান এবং রিসার্চ অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট টিমের গবেষক অরূপকুমার মিত্রের সঙ্গে ‘বায়োডায়ানামিং ফার্মিং’ নিয়ে গবেষণা করছেন দীর্ঘ সময় ধরেই। চন্দ্রালোকে চা-পাতা তোলার পদ্ধতি ও তার সুফল নিয়ে তাঁদের গবেষণাপত্র অনুমোদিত হয়েছে ‘কার্পাথিয়ান জার্নাল অফ ফুড সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’-তে। সুদেষ্ণার কথায়, ‘‘রাতে চা-গাছের প্রাইমারি মেটাবলিজ়ম বা প্রাথমিক বিপাকক্রিয়া সেকেন্ডারি মেটাবলিজ়মে বদলে যায়। চাঁদের আলোয় এই প্রক্রিয়া আরও বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে মাটি থেকে পুষ্টিরস বেশি মাত্রায় পৌঁছোয় চা-পাতাগুলিতে। অনেক বেশি অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট তৈরি হয়। এতে চা-পাতার পুষ্টিগুণ যেমন বাড়ে, তেমনই বাড়ে তার স্বাদ ও গন্ধও। চন্দ্রালোকে শোভিত চা-পাতার স্বাদ আরও বৃদ্ধি করতে সেখানে জৈব সারের প্রয়োগ কী ভাবে হবে, সে নিয়েও গবেষণা করছি আমরা।’’
চন্দ্রালোকে চা-পাতা তোলার প্রক্রিয়া বায়োডায়ানামিক ফার্মিংয়েরই একটি অংশ।
কী ভাবে হয় সে প্রক্রিয়া?
দিনের বেলা এবং রাতের বেলা চা-গাছের অভ্যন্তরীণ রসায়নে এক বিশাল পরিবর্তন ঘটে। সূর্যালোকে চা-গাছ সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় ব্যস্ত থাকে। একে বলে প্রাইমারি মেটাবলিজ়ম। এই সময়ে গাছ মূলত নিজের বৃদ্ধির জন্য শর্করা, অ্যামিনো অ্যাসিড ও প্রোটিন তৈরিতে শক্তি ব্যয় করে।
রাতে সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। গাছ তখন দিনের জমানো শক্তি ব্যবহার করে সেকেন্ডারি মেটাবলিজ়ম প্রক্রিয়া শুরু করে দেয়। এই সময়ে চা- পাতায় অনেক বেশি অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট তৈরি হয়, যেমন ফ্ল্যাভোনয়েড, ক্যাটেকিন, থিয়েনিন এবং কিছু সুগন্ধি যৌগও তৈরি হয়। চাঁদের আলোয় এই প্রক্রিয়া আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে। সুদেষ্ণা জানালেন, চাঁদ যত পৃথিবীর কাছাকাছি আসে, ততই তার মহাকর্ষজ বল বেশি কাজ করে পৃথিবীর উপর। চাঁদের মহাকর্ষীয় শক্তির কারণেই তো জোয়ার-ভাটা হয়। ঠিক তেমনই উদ্ভিদের ভিতরে থাকা কোষরসের উপরেও চাঁদের এই আকর্ষণশক্তি কাজ করে। পূর্ণিমার সময় চাঁদের ‘গ্র্যাভিটেশনাল পুল’ বা টান সবচেয়ে শক্তিশালী থাকে। এর ফলে মাটির নীচের জলীয় অংশ এবং পুষ্টি উপাদান গাছের শিকড় থেকে তীব্র বেগে কাণ্ড হয়ে একেবারে উপরের কচি পাতা ও কুঁড়িতে গিয়ে জমা হয়। তাই সে সময়ে যদি চা-পাতা তোলা হয়, তা হলে সেটিতে পুষ্টি উপাদান বেশি পরিমাণে পাওয়া যায়। আরও একটি কারণ হল, দিনের বেলা চড়া রোদে চা-পাতার প্রাকৃতিক উৎসেচকগুলি নষ্ট হয়ে যায়, চা-পাতা তার আর্দ্রতা হারায় ও বেশি পরিমাণে ট্যানিন তৈরি হয়। তাই স্বাদ কিছুটা তিক্ত হয়। রাতের ঠান্ডা বাতাসে সেই তিক্ততা দূর হয় এবং উৎসেচকগুলির কার্যকারিতা বাড়ে, ট্যানিনের মাত্রা কমে। তাই সেই চায়ের স্বাদ আরও বেশি মিষ্টি হয় এবং প্রাকৃতিক ভাবেই তার সুগন্ধ আরও বাড়ে।
পূর্ণিমার রাতে তোলা চায়ের স্বাদ মিষ্টি, তাতে ট্যানিনের পরিমাণ অনেক কম থাকে। পুষ্টিগুণেও সেরা।
চিন আর জাপানের চা-উৎসবের আধ্যাত্মিক শক্তির কথা বুঝেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর ‘জাপান-যাত্রী’-তে বারে বারেই উঠে এসেছে সে কথা। শোনা যায়, জাপানি চায়ের সংস্কৃতিতে মোহিত হয়ে শান্তিনিকেতনের উত্তরায়ণে ‘চা-চক্র’ শুরু করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর পেয়ালায় চন্দ্রালোকে শোভিত চা থাকত কি না জানা নেই, তবে যে চায়ে মহাজাগতিক শক্তি সম্মিলিত হয়েছে, সেই চা দুর্লভ তো বটেই এবং তা যে সর্বোৎকৃষ্টও, তাতে কোনও সন্দেহই নেই।