• মনীষা মুখোপাধ্যায়
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

স্তন ক্যানসার নিয়ে জীবনের বার্তা ইডেন জুড়ে, গোলাপি রঙে মাতছে শহর

pink ball test
প্রতীকী চিত্র। পরিকল্পনা ও বিন্যাস: শৌভিক দেবনাথ।

Advertisement

‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’-র কাঞ্চন যখন রাতের কলকাতাকে প্রথম দেখে তখন তার চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছিল শহরের চওড়া চওড়া সাদা আলো। শুক্রবার সেই কলকাতারই রং বদলে হয়ে যাচ্ছে গোলাপি। গোলাপি বেলুন-ফেস্টুন-আলোয় ভেসে যাবে তিলোত্তমা। এমন ‘পিঙ্ক-বিউটি’-র লক্ষ্য যদি ইডেনে আয়োজিত ভারত-বাংলাদেশ টেস্ট হয়, তবে এই গোলপি রং নির্বাচনের নেপথ্য উপলক্ষ্য অবশ্যই স্তন ক্যানসার নিয়ে সচেতনতার মন্ত্র শেখানো। গোলাপি রঙের প্রাচুর্য ভরা ইডেন উদ্যানের সাজসজ্জার আয়োজনেই তা মালুম।

ব্রিটিশ ভাবনায় গোলাপি মূলত ‘মেয়েদের রং’ হয়েই ছিল। এই রঙের সঙ্গে ক্যানসারের সম্পর্ক স্থাপন হয়েছে ১৯৯২-এর পর। এই সালকেই ‘দ্য ইয়ার অব রিবনস’ বলে সম্বোধন করেছিল ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’। এই সাল থেকেই শার্লট হেলের আইডিয়াকে মূলধন করে এডস ও ক্যানসারের প্রতি সচেতনতা বাড়াতে নানা রঙের ফিতের বহুল প্রচলন শুরু হয়। স্তন ক্যানসারের জন্য নির্ধারিত হয় গোলাপি রঙের ফিতে। তাই স্তন ক্যানসার নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে গোলাপি রংকেই প্রতীক হিসেবে ধরে নিয়েছে আবিশ্ব।

আদতে দুটো ভিন্ন মেরুর। একটা যদি আলাস্কা হয়, অন্যটা তবে আন্টার্কটিকা। এক জন যদি প্রাণশক্তির কথা বলে, অন্য জন তবে সেই জীবনে দাঁড়ি টানতে ওস্তাদ। তারা ক্রিকেট ও ক্যানসার। আর এই দুই সম্পূর্ণ বিপরীত চরিত্রদের মধ্যে নিজের জীবনের বিনিময়ে মিলমিশ ঘটিয়ে দিয়ে গেলেন জেন লুইস। পরিচয়ে অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটার গ্লেন ম্যাকগ্রার সহধর্মিণী। মাত্র ৪২ বছরে পৌঁছে ২০০৮-এর ২২ জুন স্তন ক্যানসারের কাছে পরাজয় স্বীকার করেন জেন। আর তাঁর এই মৃত্যুই জুড়ে দিয়ে গেল ক্রিকেট ও কর্কটকে। সবুজ মাঠের সঙ্গে মিশিয়ে দিল ব্রেস্ট ক্যানসার সচেতনতার গোলাপি রংকে। শুক্রবার ইডেনে প্যারাট্রুপারে নেমে আসা গোলাপি বলের টেস্টেও জেনের মুখকেই যেন বার বার যেন উস্কে দিচ্ছে স্মৃতির কোঠায়।

আরও পড়ুন: প্রাতঃরাশে অবশ্যই রাখুন ডিম, কিন্তু এই পদগুলি না রাখাই ভাল

শুক্রবারের লক্ষ্যে সেজে উঠছে ইডেন।

সেই লক্ষ্যপূরণে শুক্রবার গ্লোবাল ক্যানসার অ্যাসোসিয়েশনের তরফে ২০ জন স্তন ক্যানসার জয় করা ব্যক্তি হাজির থাকবেন মাঠে। সিএবি সচিব অভিষেক ডালমিয়ার কথায়: ‘‘স্তন ক্যানসার নিয়ে সচেতন করার উদ্দেশেই গোটা ইডেন চত্বর ও তার চারপাশ সেজে উঠবে গোলাপি বেলুন ও গোলাপি আলোয়। হেভিওয়েট অতিথি থেকে সিএবি কর্তাদের জার্সি, পোশাক, গোলাপির ছোঁয়া থাকবে সর্বত্র। গ্লোবাল ক্যানসার অ্যাসোসিয়েশনের সাহায্য নিয়েই এই ভাবনার পথে এগিয়েছি আমরা।’’

শুক্রবার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ‘গ্লোবাল ক্যানসার অ্যাসোসিয়েশন’-এর তরফে ক্যানসার বিশেষজ্ঞ বিকাশ আগরওয়ালের তত্ত্বাবধানে থাকা ২০ জন ব্রেস্ট ক্যানসার জয়ী ব্যক্তিকে সংবর্ধনা দেবে সিএবি। উপস্থিত থাকবেন সিএবি প্রেসিডেন্ট সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। শুধু তা-ই নয়, টেস্টের দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনে মধ্যাহ্নভোজের সময় এই ক্যানসারজয়ীরা ক্রিকেটও খেলবেন ইডেনের পিচে। ‘গ্লোবাল ক্যানসার অ্যাসোসিয়েশন’-এর তরফে বিভা আগরওয়ালের কথায়, ‘‘সারা বিশ্বেই স্তন ক্যানসার তার ডালপালা মেলছে। আমাদের দেশে প্রতি ৩ মিনিট ২০ সেকেন্ডে এক জন করে মহিলা এই রোগে আক্রান্ত হন। সিবিই (ক্লিনিকাল ব্রেস্ট এগজামিনেশন) টেস্টের মাধ্যমেই মূলত এই ক্যানসার পরীক্ষা করা হয়। প্রতি মাসেই মেয়েদের এই পরীক্ষা করানো প্রয়োজন। প্রতি দিন নিজেদের খেয়াল রাখা উচিত স্তনে কোথাও কোনও লাম্প বা মাংসপেশী জন্ম নিয়েছে কি না। তেমন হলে তা ক্যানসারে রূপ নেওয়ার আগেই চিকিৎসকের কাছে যাওয়া প্রয়োজন। এই সব সচেতনতার মঞ্চ হিসেবেই আমরা বেছে নিয়েছি ইডেন গার্ডেনকে।’’

আরও পড়ুন: পুরুষদের জন্য বিশ্বে প্রথম কন্ট্রাসেপটিভ ইনজেকশন আনতে চলেছে ভারত

সিডনি টেস্টে স্তন ক্যানসার নিয়ে সচেতনতা।

তবে ব্যাট-বলের সঙ্গে গোলাপি রংকে জুতে দিয়ে সচেতনতা বাড়ানোর এই ভাবনা নতুন নয়। গোলাপি রং কী করে মিশে গেল ক্রিকেট ইতিহাসে, তা বলতে বসলে একটু পিছন ফিরে তাকাতে হবে। পিছিয়ে যেতে হবে দশ-বারো বছর। এর আগে জীবনের ঝুলবারান্দায় দু’দণ্ড জিরিয়ে নেওয়ার সময় ক্রিকেট ও ক্যানসারকে এক সারিতে বসিয়ে ভাবার কথা কস্মিনকালেও ভাবেননি কেউ। সেই ভাবনার সৌজন্যে পুরো কৃতিত্বই ম্যাকগ্রা ফাউন্ডেশনের।

২০০৫-এ জেনের মৃত্যুর আগেই স্তন ক্যানসার নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে এক ফাউন্ডেশন তৈরি করেন ম্যাকগ্রা। সব রকমের চেষ্টা ও চিকিৎসাকে হারিয়ে ২০০৮-এ মৃত্যু হল জেনের। ২০০৯-এ স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত স্ত্রী-র স্মৃতিরক্ষার সঙ্গে এই অসুখ নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে ম্যাকগ্রা ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে অস্ট্রেলিয়া-দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যে অনুষ্ঠিত সিডনি টেস্টের তৃতীয় দিনে গোলাপি বল দিয়ে টেস্ট খেলা হল। ক্রিকেট ইতিহাসে যা ‘জেন ম্যাকগ্রা ডে’ নামে খ্যাত। ২০১৫-য় অ্যাডিলেডে অস্ট্রেলিয়া বনাম নিউজিল্যান্ডের তৃতীয় টেস্টটিই প্রথম গোলাপি বলের দিন-রাতের টেস্ট হিসেবে খ্যাত ক্রিকেট ইতিহাসে। এর পর থেকে স্তন ক্যানসার নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে বার কয়েক গোলাপি বল হাতে তুলে নিয়েছেন ক্রিকেটাররা। দক্ষিণ আফ্রিকায় ওয়ান ডে ম্যাচও অনুষ্ঠিত হয় গোলাপি বলে।

শুক্রবার দিন-রাতের টেস্ট ম্যাচে স্তন ক্যানসারকে সঙ্গে নিয়েই জীবনের জয়গান গাইবেন ভারত-বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। শুক্রবার গোলাপি বিপ্লবের মঞ্চে শুধু প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে দেওয়াই নয়, স্তন ক্যানসারকে পরাজিত করার মন্ত্রও উচ্চারিত হবে সবুজ গালচের ইডেনে।

সবাই যা পড়ছেন

Advertisement

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন