পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার জঙ্গলমহলে দু’টি পুষ্টি পুনর্বাসন কেন্দ্র তৈরির অনুমতি মিলেছিল জাতীয় গ্রামীণ স্বাস্থ্য মিশন (এনআরআইচএম) প্রকল্পে। অথচ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জঙ্গলমহলের ১১টি ব্লকের জন্য ১১টি পুষ্টি পুনর্বাসন কেন্দ্র তৈরির কথা ঘোষণা করে দেন। সেই মতো পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন দফতর অর্থ বরাদ্দ করে। স্বাস্থ্য দফতরও তড়িঘড়ি ভবন তৈরির কাজ শুরু করে। কিছু ক্ষেত্রে ভবন তৈরির কাজ অনেকটা এগিয়েও যায়। টনক নড়ে এরপর। বোঝা যায়, ভবন তৈরি হলেও প্রকল্প চালু করা সম্ভব নয়। কারণ, অনুমোদন নেই বলে প্রতি মাসে প্রকল্প চালানোর খরচ মিলবে না। এরপরই কাজের গতি যায় কমে।
এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, যে সব ক্ষেত্রে ভবন তৈরির কাজ শেষ হয়ে গিয়েছে বা ৫০ থেকে ৮৫ শতাংশ এগিয়ে গিয়েছে, সেগুলির কী হবে? নতুন তৈরি হওয়া এই ভবনগুলি কী ভেঙে ভেঙে পড়বে? আগে কেন মুখ্যমন্ত্রীকে সেভাবে বোঝানো যায়নি। তাহলে পরিকল্পনাহীন খাতে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হত না! স্বাস্থ্য দফতরের এক আধিকারিকের কথায়, “প্রকল্পটি যে খুব ভাল তা মুখ্যমন্ত্রীকে বোঝানো হয়েছিল। কিন্তু এর জন্য যে এনআরএইচএমের অনুমোদন প্রয়োজন তা বোঝানো হনি। ফলে জেলা সফরে এসে মুখ্যমন্ত্রী দু’টি পরিবর্তে জঙ্গলমহলের ১১ টি ব্লকে ১১টি প্রকল্পের কথা ঘোষণা করে দেন। কাজও শুরু হয়ে যায়। এখন এর ভবিষ্যত্ কী, তা আমাদেরও জানা নেই।’’
জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক গিরিশচন্দ্র বেরা বলেন, “দু’টির অনুমোদন ছিলই। আরও একটি-র অনুমোদন মিলবে বলে আমরা আশাবাদী। বাকি ক্ষেত্রেও যাতে অনুমোদন পাওয়া যায় সেই চেষ্টা করছি।” কিন্তু তা যে এত তাড়াতাড়ি আদৌ সম্ভব নয়, চেষ্টা করলেও তা পেতে কয়েক বছর লেগে যাবে, এই বিষয়টি সকলেরই জানা। ফলে এ বিষয়ে স্বাস্থ্য দফতর বা প্রশাসনের কর্তারা মুখে কুলুপ এঁটেছেন। তাহলে কী সরকারি অর্থে তৈরি হওয়া নতুন ভবনগুলি পড়ে পড়েই নষ্ট হবে? এক প্রশাসনিক কর্তার কথায়, “একটু সাহস করে তখন মুখ্যমন্ত্রীকে এনআরএইচএমের অনুমোদনের বিষয়টি বোঝানো গেলে এই সমস্যায় পড়তে হত না। তখন ভয়ে কেউ বিষয়টি বোঝাতে এগিয়ে যাননি। এখন এত টাকা খরচ করার পর কে বিষয়টি তুলতে যাবেন। তাহলে তো আরও বকুনি খেতে হবে। তাই বিষয়টি নিয়ে সকলেই চুপ করে রয়েছেন।”
২০১২ সালের প্রথমের দিকে পুষ্টি পুনর্বাসন কেন্দ্র তৈরির কথা ঘোষণা করেছিল রাজ্য সরকার। এনআরএইচএমের অনুমোদন ছিল দু’টি কেন্দ্র। একটি নয়াগ্রামের খড়িকামাথানি ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ও অন্যটি বিনপুর গ্রামীণ হাসপাতালে। দু’টি হাসপাতালেই অতিরিক্ত ভবন থাকায় ততটা বেশি খরচও করতে হয়নি। খড়িকামাথানিতে প্রায় ৮ লক্ষ ও বিনপুরে প্রায় ২ লক্ষ টাকাতেই হয়ে যায়। শালবনিতেও একটি ঘর থাকায় সেখানে প্রায় ৫ লক্ষ টাকা ব্যয় করেই প্রকল্পের জন্য ঘরটি তৈরি হয়ে যায়। কিন্তু বাকি ক্ষেত্রে নতুন ভবন তৈরি করতেই বিস্তর টাকার প্রয়োজন দেখা দেয়। গোয়ালতোড়ের কেওয়াকোল, ঝাড়গ্রামের মনটিপা, মোহনপুর, গোপীবল্লভপুর-২ ব্লকের তপসিয়া ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র, ও জামবনির চিল্কিগড় ব্লক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে পুষ্টি পুনর্বাসন কেন্দ্র তৈরি করতে ৩২ লক্ষ ৬২ হাজার টাকা করে বরাদ্দ করে পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন দফতর। যেগুলির মধ্যে বেশিরভাগেরও কাজও ৫০ শতাংশের বেশি এগিয়ে গিয়েছে। কোনও ক্ষেত্রে কাজ এগিয়ে গিয়েছে ৮৫ শতাংশও। তারপরই আরও অর্থের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। ওই অতিরিক্ত অর্থ পেলে কাজ শুরু করা যাবে। কিন্তু যে প্রকল্প আদৌ চালু করা যাবে কিনা তা নিয়েই যেখানে সংশয় দেখা দিয়েছে, সেখানে বাকি অর্থ চাইবে কে, কোন যুক্তিতেই বা চাওয়া হবে, সেই ধন্দে টাকা চাওয়া হয়নি। আর তিনটির মধ্যে সাঁকরাইলের ভাঙাগড়, গোপীল্লভপুর-১ ও বেলপাহাড়ি ব্লক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে এই প্রকল্পের জন্য ৩৭ লক্ষ ২৮ হাজার টাকা করে বরাদ্দ করা হয়েছিল। যেগুলির দরপত্র আহ্বানের কাজ শেষ হয়ে গিয়েছিল ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসেই। কিন্তু এতদিনেও ‘ওয়ার্ক-অর্ডার’ দেওয়া হয়নি। প্রশাসন সূত্রের খবর, যেখানে প্রকল্পের অনুমোদন নেই এবং সেই অবস্থাতেই একগুচ্ছ টাকা খরচ হয়ে গিয়েছে, সেখানে নতুন করে টাকা খরচ হলে তার জন্য ভবিষ্যতে জবাবদিহি করবে কে? এই পরিস্থিতিতে চূড়ান্ত দুশ্চিন্তায় স্বাস্থ্য দফতর। আবার মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষিত কর্মসূচি বলে বাতিলও করতে পারছেন না। সব মিলিয়ে এই প্রকল্পে ব্যয় হওয়া কোটি কোটি টাকা জলে গেল বলেই সকলের অনুমান।
পুষ্টি পুনর্বাসন কেন্দ্র কী? কেনই বা মাসে এটা চালাতে অনেক খরচ? স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, জঙ্গলমহলের বহু মানুষ অপুষ্টিতে ভোগেন। সেই সব মানুষকে এই কেন্দ্রে রেখে চিকিত্সা করানোর জন্যই এই প্রকল্প চালু করেছিল কেন্দ্রীয় সরকার। তার জন্য এই কেন্দ্রে একজন চিকিত্সক, একজন পুষ্টিবিদ, ২ জন নার্স, ৪ জন সহায়িকা ও এক জন রান্না করার কর্মীর প্রয়োজন। তাঁদের মাইনে দেওয়া, চিকিত্সাধীন ব্যক্তিদের ওষুধ ও খাবারের খরচ জোগান দেওয়া সবই করার কথা সরকারের। এনআরএইচএম যে দু’টি কেন্দ্রের অনুমোদন দিয়েছে, সে ক্ষেত্রে তারাই খরচ দেবে। কিন্তু বাকি কেন্দ্রগুলির বিপুল খরচের দায়িত্ব নেওয়া রাজ্য সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। অতএব মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষিত পুষ্টি কেন্দ্রগুলির ভবিষ্যত্ আপাতত বিশ বাঁও জলে।