• উজ্জ্বল চক্রবর্তী
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

রাজনীতি আসলে হাজার সম্ভাবনার মিশেল, বোঝাচ্ছে তেলঙ্গানা

KCR
তেলঙ্গানা রাষ্ট্র সমিতি সুপ্রিমো কে চন্দ্রশেখর রাও। —ফাইল চিত্র

কথায় বলে, রাজনীতি শব্দটার জন্মই হয়েছে হাজারো সম্ভাবনাকে নিয়ে। অকাল ভোটের হায়দরাবাদে একের পর এক মানুষের সঙ্গে কথা বলে সেই বহু চর্চিত কথাটাই বার বার মনে পড়ে যাচ্ছে।

তেলঙ্গানা রাষ্ট্র সমিতি (টিআরএস)-র প্রধান কে চন্দ্রশেখর রাও এ রাজ্য কেন গোটা দেশেই কেসিআর নামে পরিচিত। রাজ্যের জন্মলগ্ন থেকেই তিনি মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু চার বছরের মাথায় বিধানসভা ভেঙে দিয়ে কেসিআর অকাল ভোট ডেকে আনলেন রাজ্যে। নইলে আগামী লোকসভার সঙ্গেই তেলঙ্গানায় নির্বাচন ছিল। এই ভোট এগিয়ে নিয়ে আসা নিয়ে নানা জল্পনা রয়েছে। অনেকে বলছেন, নিজের জনপ্রিয়তা পড়তির দিকে। আর সেটা বুঝতে পেরে কেসিআর সময় থাকতে থাকতেই ফের নিজেকে জনতার কষ্টিপাথরে যাচাই করে নিতে চাইছেন। আবার অন্য একটা অংশের মতে, লোকসভা ভোটের নিজস্ব অ্যাজেন্ডা থাকে। সেই সব সর্বভারতীয় অ্যাজেন্ডার সঙ্গে রাজ্যের ভোটটাকে গুলিয়ে ফেলতে চাইছিলেন না কেসিআর, তাই অকাল ভোট।

হায়দরাবাদে নামার পর থেকে যে রাস্তাতেই যাই না কেন, চোখ চলে যাচ্ছে কেসিআর-এর দিকে। বিশাল বিশাল হোর্ডিংয়ের প্রায় অর্ধেক জায়গা নিয়ে হাসছেন তিনি। নীচে সাদা অ্যাম্বাসাডরের ছবি। পাশে লেখা ‘ভোট ফর কার’। ওটাই গোলাপি (টিআরএসের পতাকার রং) দলের প্রতীক। আর কোনও দলের হোর্ডিং তো দূরে থাক একটা পোস্টার বা ব্যানারও নজরে আসছে না। পুরনো হায়দরাবাদে বেশ কয়েকটি জায়গায় ‘অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন’, স্থানীয়দের কাছে যে দল এমআইএম নামে পরিচিত, তাদের প্রতীক ঘুড়ি টাঙানো রয়েছে। কিন্তু, বিজেপি, কংগ্রেস বা তেলুগু দেশম পার্টি (টিডিপি)-কে দলীয় কার্যালয়ের বাইরে তেমন ভাবে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

হুসেন সাগরে প্রাতঃভ্রমণে আসা ব্যবসায়ী জীবন রেড্ডিকে জিজ্ঞেস করা গেল, ভোটের হাওয়া কেমন বুঝছেন? তিনি যা বললেন, তাতে একটা জিনিস স্পষ্ট। এ বারের নির্বাচনটা আসলে টিআরএস বনাম কংগ্রেস হচ্ছে। জীবনের কথায়: ‘‘বাকি কোনও দলেরই এ রাজ্যে তেমন প্রভাব নেই। সে বিজেপি হোক বা টিডিপি।একটা ছোট্ট অংশে এমআইএম আছে। বাকিরা নিজেদের ভিতটাইতো তৈরি করতে পারেনি।’’

পুরনো হায়দরাবাদের চারমিনার এলাকা। —ফাইল চিত্র

আইটি কর্মী সঞ্জীব রাও এই যুদ্ধে অবশ্য অনেকটাই এগিয়ে রাখছেন কেসিআর-কে। বানজারা হিলসের বাসিন্দা সঞ্জীবের মতে, রাজ্যে গত চার বছরে যে উন্নয়ন হয়েছে সেটা লোকে দেখতে পাচ্ছে। শহরের উপান্তে হাইটেক সিটি যে ভাবে গড়ে উঠছে, তার পুরো কৃতিত্ব তিনি কেসিআর-কেই দিতে চান। তাঁর মতে, মূল হায়দরাবাদ শহরেও সে উন্নয়নের আঁচ পড়েছে। সঞ্জীব বললেন, ‘‘গোটা রাজ্যের উন্নয়ন কেমন হয়েছে, সেটা হায়দরাবাদে বসে বোঝাটা একটু মুশকিল। কিন্তু, যতটা নজরে আসে তাতে কিন্তু কেসিআরকে মানুষ আরও বেশি পছন্দ করছেন বলেই মনে হচ্ছে।’’ তাঁর মতে, একটা সময়ে আইটি হাব মানেই মানুষ চন্দ্রবাবু নায়ডুর কথা বলত। হাইটেক সিটি যে ভাবে আরও প্রসারিত হচ্ছে, তাতে কিছু দিনের মধ্যেই গোটা বিশ্ব কেসিআর-কেই চিনবে। তিনি আরও জানান, সরকারি কর্মচারিদের বেতন অনেকটাই বেড়েছে কেসিআর আমলে।

বিমানবন্দর থেকে আউটার রিং রোড ধরে হাইটেক সিটির দিকে গেলে বোঝা যায়, সঞ্জীব খুব একটা ভুল বলছেন না। কিন্তু, মহম্মদ ইলিয়াস সে সব উড়িয়ে দিতে চান। পেশায় সরকারি কর্মী। তাঁর মত অন্য। তিনি বলছেন, ‘‘যে উন্নয়ন হয়েছে, তাতে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের কী উপকারে আসছে একটু বলতে পারেন? হাইটেক সিটি বিস্তৃত হচ্ছে, সেটা তো ভাল কথা। কিন্ত, সেখানে কি শুধুই তেলঙ্গানার ছেলেমেয়েরা চাকরি পাবে? পাবে না। গোটা দেশ, এমনকি বিদেশ থেকেও লোকজন আসবে। তাতে আমার লাভ কী!’’ ইলিয়াসের স্পষ্ট যুক্তি, এখনও সাধারণ মানুষ সরকারি চাকরি খোঁজে। আর সেখানে সম্পূর্ণ ব্যর্থ কেসিআর। পুলিশে সামান্য কয়েকটা চাকরি ছাড়া আর কোনও চাকরিই দিতে পারেননি তিনি। তাই মানুষ এখন বিকল্প খুঁজছে।

হায়দরাবাদের হাই টেক সিটি। —ফাইল চিত্র

আরও পড়ুন: রেলকর্মীদের প্রচুর বেতন, ভাতা বাড়ানোর সুপারিশ সপ্তম বেতন কমিশনে

টিআরএস এর আগের নির্বাচনে, অর্থাৎ রাজ্যের প্রথম ভোটে একক ভাবে ৬৩টি আসন পেয়েছিল। এমআইএম তাদের সমর্থন করে। পরে বেশ কয়েক জন টিডিপি, কংগ্রেস এবং নির্দল বিধায়কও টিআরএসে চলে যান। সব মিলিয়ে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী কেসিআরের সঙ্গে ৯০ জন বিধায়ক ছিলেন। এ বার কেসিআর-কে রুখতে কংগ্রেস মহাজোট করেছে। সেই জোটে টিডিপি ছাড়াও আছে সিপিআই এবং টিজিএস।

২০১৪ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলির প্রাপ্ত আসন। গ্রাফিক: শৌভিক দেবনাথ

তা হলে রাজ্যে সরকার গড়ছে কে? বিজয় ভরদ্বাজ পেশায় ফল ব্যবসায়ী। প্রশ্নটা করে বোঝা গেল কে আসবে, কে যাবে, তা নিয়ে খুব একটা মাথাব্যথা নেই। আবারও প্রশ্ন গেল, কে আসছে এ বার? কী মনে হচ্ছে? সেকন্দরাবাদের ছোট্ট দোকানে বসে ক্রেতার হাতে আপেল তুলে দিতে দিতে তাঁর জবাব, ‘‘এর আগে কংগ্রেস দেখেছি। টিডিপি দেখেছি। কী করেছে বলুন তো আমার জন্য! কেসিআর-ও করেননি। তাই আশা-ভরসা-ভাবনা কিছুই নেই আর। যে আসবে, আসবে। আমার কী তাতে!’’

পুরনো হায়দরাবাদের চারমিনার, মক্কা মসজিদ এবং গোলকুন্ডা চত্বর যদিও রাজনীতির চর্চায় অনেক বেশি এগিয়ে। কিন্ত, তাঁদের ভাবনায় শুধুই এমআইএম। দলের প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়াইসি এবং তাঁর ভাই আকবরউদ্দিন ওয়াইসিকে নিয়েই তারা সরব। কে জিতবে? পুরনো হায়দরাবাদের সব জায়গাতে একটাই জবাব, এমআইএম। আর টিআরএস? জবাব আসে, অবশ্যই কেসিআর ভাল মুখ্যমন্ত্রী। এমআইএম কেসিআরকে সমর্থন করে বলেই জবাবটা এমন। চারমিনার চত্বরে মক্কা মসজিদের ঠিক বাইরে জুতো বিক্রি করেন মহম্মদ আরশাদ।তাঁর কথায়: ‘‘বিপদে আপদে তো বটেই, গোটা দেশের সামনে আমাদের হয়ে সওয়াল করেন ওয়াইসি সাব। তাই পুরনো হায়দরাবাদ ওঁর সঙ্গে ছাড়া আর কার সঙ্গে যাবে!’’

আরও পড়ুন: মর্যাদার লড়াই মহাকোশল জুড়ে, ‘পদ্মবনে’ বসে দুশ্চিন্তায় ছিন্দওয়াড়ার অধীশ্বর

গোটা হায়দরাবাদ শহর যে ভাবে তেলঙ্গানা ভোটকে দেখছে, পলওয়াই রাঘবেন্দ্র রেড্ডি ঠিক তেমন করে দেখতে চাইছেন না। রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাঘবেন্দ্র ১১৯ আসনের মধ্যে ১০০ আসনের কথাই তুলে ধরছেন। তাঁর মতে, ওই ১০০-র মধ্যেই নানা রকমের সমীকরণ লুকিয়ে রয়েছে।কী রকম? পুরনো হায়দরাবাদের সাতটি আসন একেবারেনির্বিঘ্নে এমআইএমের ঘরে যাবে। বাকি থাকল ১১২। এর মধ্যে টিডিপি, বিজেপি, সিপিআই, বিজেপি সবার জন্য রাঘবেন্দ্র ১২টি আসন ছেড়ে দিচ্ছেন।তাঁর কথায়, ‘‘এর পর যে ১০০ আসন রইল, সেখানে যে দল ৫০-এর উপরে আসন পাবে তারাই সরকার গড়বে।’’ তাঁর ব্যাখ্যা, টিআরএস-কে সরকার গড়তে গেলেসে ক্ষেত্রে অন্তত ৫৩টি আসন পেতেই হবে। কারণ, তেলঙ্গনার ম্যাজিক ফিগার ৬০। এমআইএম-এর ৭টি আসনে তাদের সঙ্গেই জুড়বে।আর কংগ্রেস যদি ৫০-এর বেশি পায়, তা হলে তাদের জোটসঙ্গী টিডিপি, সিপিআই, টিজিএস (তেলঙ্গনা জন সমিতি) মিলেজুলে সরকার গড়তে পারে।আর যদি কোনও ভাবে টিআরএস ৫০-এর নীচে আসন পায়?রাঘবেন্দ্রর মতে,সে ক্ষেত্রে বিজেপি টিআরএস-কে সাপোর্ট করতে পারে। কারণ, কেসিআর-এর সঙ্গে বিজেপির সম্পর্ক যে তলায় তলায় ভাল, তা সকলেই জানেন।

বিজেপির এ রাজ্যে তেমন ভাবে কোনও প্রভাব নেই বলেই জানালেন দীর্ঘ দু’দশক হায়দরাবাদে থাকা বেসরকারি সংস্থার কর্মী মৈনাক চক্রবর্তী। তাঁর মতে, ২০১৪-তে গোটা দেশে যখন মোদী হাওয়া, তখনই এ রাজ্যে বিধানসভা ভোটে পাঁচটা আসন পেয়েছিল বিজেপি। এ বার তো মোদী হাওয়াই নেই। আর রাম মন্দির ইস্যু এখানে কোনও আলোচনার বিষয় নয়। মানুষ তেমন ভাবে নিচ্ছেও না। রাজ্য ভাগের পর তেলঙ্গানায় চন্দ্রবাবুর টিডিপি-ও কোনও ছাপ রাখতে পারেনি বলেই মত মৈনাকের।

হায়দরাবাদ শহরে কয়েক বছর আগেই চালু হয়েছে মেট্রো। —ফাইল চিত্র

তবে কেসিআর-এর দল যদি কোনও ভাবে কম আসন পায়, তা হলেই অন্য এক ‘খেলা’ হবে রাজ্যে। রাঘবেন্দ্র এই ভোটের বাজারে সেই ‘খেলা’র ছকটা ব্যাখ্যা করলেন। তাঁর কথায়, ‘‘গোটা রাজ্য যখন কেসিআর আসবে কি না ভাবছে, আমি তখন অন্য একটা কথা ভাবছি, কেসিআর-এর পরে কে?’’ তাঁর মতে, রাজ্য মন্ত্রিসভা হোক বা টিআরএসের রাজনীতি—সর্বত্রই কেসিআর নিজের ছেলে কেটি রামারাও (কেটিআর) এবং ভাগ্নে হরিশ রাওকে গুরুত্ব দিয়ে রেখেছেন। কিন্তু, কেটিআর হাবেভাবে নিজেকে কেসিআর-এর পরবর্তী হিসেবেই নানা জায়গায় তুলে ধরেন। অনেক জায়গায় এ সব ক্ষেত্রে কেসিআর-এর সমর্থনও দেখা যায়। কিন্তু, হরিশ ভীষণ অন্তর্মুখী। দলের একটা অংশে তাঁর যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।রাঘব বলছেন, ‘‘যদি টিআরএস কোনও রকমে টেনেটুনে সরকার গঠনের সংখ্যা পায়, তবে কেসিআর-ই মুখ্যমন্ত্রী হবেন, তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই। কিন্তু, যদি সংখ্যাটা কোনও ভাবে ৮০ ছাড়িয়ে যায়, তবে কেসিআর সরাসরি কেটিআর-কেই মুখ্যমন্ত্রী পদে ঘোষণা করবেন।’’

কিন্তু,টিআরএস কোনও রকমে ৫০ বা তার কম আসন যদি পায়?‘‘তা হলে হরিশ দল ছেড়ে নিজের অনুগামীদের নিয়ে নয়া দল করবেন।এবং সে ক্ষেত্রে কংগ্রেসের সমর্থন নিয়ে তিনিই হবেন জোটের মুখ্যমন্ত্রী।’’— রাঘব বললেন। তবে, টিআরএস বিপুল আসন পেলে সেই রাজনৈতিক ভুলটা হরিশ কোনও ভাবেই করবেন না। ওই রকম পরিস্থিতি তৈরি হলেও, তাঁকে মুখ্যমন্ত্রী করার প্রতিশ্রুতি না পাওয়া পর্যন্তও তিনি ওই কাজ করবেন বলে মনে হয় না বলেই জানালেন রাঘব।

সাধে কী আর বলে, রাজনীতি হাজার সম্ভাবনার এক মিশেল!

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন