আখের রস থেকে ডিম সেদ্ধ, দুধ চা থেকে ম্যাগি— সব কিছুর রঙ এখানে লাল! বাতাসে ভাসতে থাকা লাল আবিরের গুঁড়ো আশপাশের মেকশিফট খাওয়ার স্টলগুলোয় এসে লুটোপুটি খাচ্ছে। গলার শির ফুলিয়ে স্লোগান দেওয়ার ফাঁকে সেই লাল ম্যাগি, লাল ডিম সোনামুখ করে খাচ্ছে ‘লালমুখো’ ছেলেমেয়েগুলো! জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের দেওয়াল জোড়া গ্রাফিতির নেলসন ম্যান্ডেলা গালে হাত দিয়ে হাসিমুখে দেখছেন লালের এই উৎসব।

ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বিজেপির ছাত্র সংগঠন এবিভিপিকে ৪-০ ব্যবধানে উড়িয়ে দেওয়ার পরে জেএনইউ-এর ছাত্রছাত্রীদের উল্লাস আজ বাঁধনভাঙা। প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট, জেনারেল সেক্রেটারি, জয়েন্ট সেক্রেটারি— চারটি পদেই এবিভিপি প্রার্থীদের প্রায় দ্বিগুণ ভোট পেয়ে জিতেছেন বাম জোটের (এআইএসএ-এসএফআই-এআইএসএফ-ডিএসএফ) প্রতিনিধিরা। গত কাল বাম ছাত্রছাত্রীদের উপরে হামলা চালানোর অভিযোগ উঠেছিল এবিভিপি-র বিরুদ্ধে। আজ তাদের কোনও প্রতিনিধির দেখা মেলেনি বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে। 

লাইব্রেরি বিল্ডিং এবং ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস বিভাগের (এখানেই ভোট গণনা হয়েছে) মাঝের বিস্তীর্ণ জমিতে সাদা কাপড়ের ছাউনি। সেই ছাউনি উপচে বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে ভিড়। তাসা, ঢাক,
ব্যাঞ্জো, গিটারের অবিচ্ছিন্ন জ্যামিংয়ে কান পাতা দায়। গত কাল বাম জোটের উপর হামলার বিষয়টি সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে এতটাই ছড়িয়ে গিয়েছে যে, আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০০ মিটার আগে থেকে পুলিশের কড়া প্রহরা। ‘‘কালকের পর ওরা আজ আর মুখ পোড়াতে চাইছে না!’’ উদ্দাম নাচের ফাঁকে এসে বলে গেলেন ইতিহাস বিভাগের গীতা চৌধুরী।

গণনা শুরুর পর থেকেই বোঝা যাচ্ছিল দেশের অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা কোন দিকে। প্রস্তুতিও শুরু হয়ে গিয়েছিল তখন থেকে। চূড়ান্ত ফল ঘোষণা হতেই উড়তে শুরু করল লাল আবির। সঙ্গে কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল। গান শেষে আকাশমুখী স্লোগান— ‘হোঁশ ঠিকানে মে আয়েগা / যব লাল ঝান্ডা লহেরায়ে গা।’ গত কাল গোটা রাত জেগেছিলেন। আজ ভোর থেকে স্লোগান দিয়ে যাচ্ছেন এন সাই বালাজি, ছাত্র সংসদের নতুন প্রেসিডেন্ট। দফারফা হয়ে যাওয়া গলায় বললেন, ‘‘এই জয় নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে প্রতীকী জয়। ওরা ভয় পেয়েছে, তাই আমাদের বিরুদ্ধে গুন্ডা লেলিয়ে দিতে হয়। ওরা ভয় পেয়েছে, তাই আমাদের হাত থেকে বই কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়।’’ সিপিআই (এমএল) নেত্রী কবিতা কৃষ্ণণের মতে, ‘‘সঙ্ঘের সম্মিলিত চক্রের বিরুদ্ধে জেএনইউ-এর পড়ুয়াদের জয় এটা।’’ চে গেভারার ছবি আঁকা টি-শার্ট পরে মলিকিউলার মেডিসিন বিভাগের সুধীর কুমার উদ্দাম নেচে চলেছেন। তারই ফাঁকে বললেন ‘‘আমাদের পরের লক্ষ্য উপাচার্যকে হঠানো।’’ ২০১৪ সালে কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই জেএনইউতে প্রভাব বাড়ানোর জন্য বিজেপি তথা সঙ্ঘ পরিবার মরিয়া। বর্তমান উপাচার্য জগদীশ কুমার সঙ্ঘ-ঘনিষ্ঠ বলে অভিযোগ শিক্ষাবিদদের বড় অংশের। এই উপাচার্যের আমলেই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সামরিক ট্যাঙ্ক বসানোর কথা উঠেছে। পড়ুয়াদের অভিযোগ, জাতীয়তাবাদের জিগির তুলতেই এই কৌশল। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরাও গণভোট করে জগদীশকে সরানোর পক্ষে রায় দিয়েছেন। এ দিনের পরে পড়ুয়া-শিক্ষকদের সেই লড়াইটাই অন্য মাত্রা পাবে বলে মনে করছেন অনেকে।