চব্বিশ বছর পর আজ এক মঞ্চে পাশাপাশি বসলেন সমাজবাদী পার্টি এবং বহুজন সমাজ পার্টির সর্বোচ্চ নেতা। বেলা বারোটায় লখনউয়ের পাঁচতারা হোটেলে সিলমোহর লাগানো হল উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনী জোটে। এসপি নেতা অখিলেশ সিংহ যাদব ওরফে টিপু বললেন, ‘‘আজকের পর থেকে মায়াবতীজির অপমান, আমার অপমান।” আর পাশে বসে বিএসপি নেত্রীর দাবি, ‘‘ভারতীয় রাজনীতিতে এটি এক ঐতিহাসিক ঘটনা।’’ 

লোকসভা ভোটের আগে এখনও পর্যন্ত এটাই বিজেপি-বিরোধী জোটের সেরা ছবি— ‘বুয়া-ভাতিজা’র এই প্রথম সাংবাদিক বৈঠক নিয়ে  বলছেন রাজনীতির লোকজন। ‘বুয়া (পিসি)’ মায়াবতীর কথায় যা কিনা, ‘‘গুরু আর চেলার (নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহের) ঘুম ছুটিয়ে দেওয়ার এক সাংবাদিক সম্মেলন।’’

উত্তরপ্রদেশের রাজনীতিতেও এটি একটা ঐতিহাসিক ঘটনা। দু’দশকেরও বেশি সময় ধরে এসপি এবং বিএসপির সম্পর্ক ছিল আদায়-কাঁচকলায়। দু’দলের সম্পর্কের সুর কেটেছিল এই লখনউয়েই, ১৯৯৫ সালের গেস্ট হাউস কাণ্ডের পরে। তার আগে ১৯৯৩-এ মুলায়ম সিংহ যাদবের এসপি এবং কাঁসিরামের বিএসপি জোট বেঁধেই বিজেপিকে হারিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল রাজ্যে। দু’বছর পরে বিএসপি মুলায়ম সরকারের উপর থেকে সমর্থন তুলে নেবে বলে ঘোষণা করে। ১৯৯৫-এর ২ জুন রাতে লখনউয়ের গেস্ট হাউসে দলের বিধায়কদের নিয়ে বৈঠক করছিলেন মায়াবতী। এসপির ক্ষিপ্ত নেতা-কর্মীরা হামলা চালায় সেখানে। সে রাতে প্রাণ হাতে নিয়ে পালাতে হয় তাঁকে। এর পরে বিজেপির সঙ্গে মিলে সরকার গড়েন মায়াবতী। আর জোড়া লাগেনি দু’দলের সম্পর্ক। ২৩ বছর পর জোড়া লাগাল অভিন্ন শত্রু বিজেপি। সম্প্রতি সংসদ চত্বরে যৌথ সাংবাদিক সম্মেলন করেছেন দু’দলের সাংসদেরা। এ বার দুই শীর্ষ নেতাও। 

মায়াবতী বললেন, ‘‘দেশের বিষয়টিকে লখনউ গেস্ট হাউস কাণ্ডের থেকে উপরে স্থান দিয়ে একসঙ্গে চলার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। উত্তরপ্রদেশের গরিব, শ্রমিক, কৃষক, ছোট ব্যবসায়ী, তফসিলি, দলিত, মুসলমান সকলেই বিজেপির সঙ্কীর্ণ জাতপাতের নীতি এবং ধর্মের নামে অত্যাচারে পীড়িত। রাজনীতিতে নতুন দিশা দেব আমরা।’’ 

আরও পড়ুন: আরও নরম, মোদীত্ব ভুলে কবুল ব্যর্থতাই

ভাগাভাগির অঙ্ক আসন ৮০
বিএসপি                    এসপি
৩৮                ৩৮
•            অমেঠী এবং রায়বরেলী কংগ্রেসের জন্য 
•         বাকি ২ শরিক দলের জন্য

কাল পর্যন্ত শোনা যাচ্ছিল এসপি, বিএসপি ও অন্য ছোট দলের মধ্যে আসন ভাগের সূত্রটি হবে ৩৭-৩৭-৪। রায়বরেলী ও অমেঠী ছাড়া হবে সনিয়া ও রাহুল গাঁধীকে। আজ মায়াবতীর ঘোষণা, এসপি-বিএসপি ৩৮টি করে আসনে লড়বে। দু’টি কংগ্রেসকে দিয়ে বাকি দু’টি দেওয়া হবে ছোট দলকে (আরএলডি)। অখিলেশ যোগ করেন, ‘‘আমি আগেই বলেছিলাম, জোটের প্রয়োজনে আমি দু’কদম পিছোতেও রাজি আছি। মায়াবতীজির কাছে কৃতজ্ঞ যে তিনি সমানে-সমানে লড়াই করতে রাজি হয়েছেন।’’ সাংবাদিক বৈঠকের পরেই দু’দলের জোটের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে টুইট করেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাহুল গাঁধী দুবাইয়ে জানান, জোটের দুই দলের নেতা-নেত্রীর প্রতি তাঁর গভীর আস্থা আছে। তাঁদের জোট করার অধিকার আছে। তবে কংগ্রেস উত্তরপ্রদেশে পূর্ণ শক্তি দিয়েই লড়বে।       

নিজ দলের নেতা-কর্মীদের প্রতি মুলায়ম-পুত্রের নির্দেশ, ‘‘মনে রাখবেন, মায়াবতীজির সম্মান এখন থেকে আমার সম্মান। কেউ তাঁকে অপমান করলে সেটা আমাকেই অপমান করা। আমাদের মধ্যে  বিজেপি এ বার অবিশ্বাস ও বিভেদ তৈরির চেষ্টা করবে। সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষও

বাধাতে পারে। এর মোকাবিলা করতে হবে।’’ মায়াবতী-অখিলেশ আজ যে বিষয়টিতে বিশেষ জোর দিলেন, তা হল এই জোটকে শুধু রাজনৈতিক নয়, সামাজিক বিপ্লব হিসেবেও তুলে ধরা। 

মায়াবতীর ব্যাখ্যা, ‘‘নিছক ভোটে

জিততে দু’টি দলের জোট নয়, এটা সামাজিক পরিবর্তন ও আর্থিক আন্দোলন। দলিত, মুসলমান, কৃষক, শ্রমিক, তফসিলি, অনগ্রসর শ্রণি, অন্যান্য সংখ্যালঘু— সকলের এক হওয়ার লড়াই।’’ সমাজের সব অংশকে এক হতে বলার পিছনে বিশেষ একটি কারণও রয়েছে— জেল থেকে মুক্তি পাওয়া ভীম সেনার দলিত নেতা চন্দ্রশেখর আজাদ ওরফে রাবণের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি। বিএসপির ভোট ব্যাঙ্কে রাবণ ভাঙন ধরাতে পারেন, এমন আশঙ্কা রয়েছে দলিত নেত্রীর। মায়াবতী–অখিলেশ মনে করেন,

গত পাঁচ বছরে বিজেপির বিরুদ্ধে প্রচুর ক্ষোভ জমেছে সমাজের পিছিয়ে থাকা অংশে। একে কাজে লাগাতে পারলে আরও ভাল পাওয়া যাবে।