লোকসভার পর রাজ্যসভা। বিরোধীদের তোলা একের পর এক প্রশ্নের জবাব দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। শুধু জবাব দিলেন না, বিরোধীরা যে ইস্যুতে আক্রমণ করেছিলেন, সেই তিরেই তাঁদের বিঁধলেন প্রধানমন্ত্রী। ছাড়লেন না আক্রমণের বিন্দুমাত্র সুযোগও। রাষ্ট্রপতির বক্তৃতার জবাবি ভাষণে বুধবার রাজ্যসভায় ছুঁয়ে গেলেন ঝাড়খণ্ডে গণপিটুনি থেকে বিহারে এনসেফ্যালাইটিসে শিশুমৃত্যুর ঘটনাও। বললেন, ‘‘গণপিটুনির ঘটনা আমাকে ব্যথিত করেছে।’’

মঙ্গলবার লোকসভায় জরুরি অবস্থা নিয়ে কংগ্রেসকে আক্রমণ করে মোদী বলেছিলেন, ২৫ জুন দেশের আত্মাকে পিষে মারা হয়েছিল। পরের দিন বুধবার ছিল রাজ্যসভায় প্রধানমন্ত্রীর জবাবি ভাষণ। ঝাড়খণ্ডে জোর করে জয় শ্রীরাম বলানো এবং গণপিটুনিতে যুবকের মৃত্যুর ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘অভিযুক্তদের কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত। কিন্তু এ জন্য গোটা রাজ্যকেই কাঠগড়ায় তোলা উচিত নয়।’’ এর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সংযোজন, ‘‘ঝাড়খণ্ডের গণপিটুনির ঘটনা আমাকে ব্যথিত করেছে। আমি দুঃখ পেয়েছি। কিন্তু রাজ্যসভার কিছু সদস্য ঝাড়খণ্ডকে গণপিটুনির হাব বলে মন্তব্য করেছেন। এটা কি ঠিক? ওঁরা কেন একটা রাজ্যকে অপমান করছেন? ঝাড়খণ্ডকে এ ভাবে অপমান করার অধিকার আমাদের কারও নেই। দেশের প্রতিটি নাগরিককে রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। রাজনীতির চশমা সরিয়ে দেখলেই আমরা উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখতে পাব।’’

বিহারে কার্যত মহামারির আকার নিয়েছে এনসেফ্যালাইটিস। দেড় শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বিহারে ক্ষমতায় বিজেপি এবং জেডিইউ-এর জোট তথা এনডিএ-র সরকার। মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার। এনসেফ্যালাইটিস নিয়ে রাজ্যসভায় বিহার সরকার এবং কেন্দ্রকে তীব্র আক্রমণ করে বিরোধীরা। রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। এ দিন জবাবি ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘এনসেফ্যালাইটিসে মৃত্যু দুর্ভাগ্যজনক ও লজ্জাজনক। এই ঘটনা আজ বিহারে ঘটছে, কাল অন্য রাজ্যেও ঘটতে পারে।’’ টিকাকরণ-সহ প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার খুঁটিনাটি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতার উপরও জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। 

লোকসভার মতো রাজ্যসভাতেও কংগ্রেসকে বার বার নিশানা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। ইভিএম-এ কারচুপির অভিযোগ নিয়ে সংসদেও সরব বিরোধীরা। তা নিয়ে এ দিন প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘এই হাউসে অনেকেই ইভিএম ইস্যু নিয়ে কথা বলেছেন। আমি তাঁদের বলতে চাই, একটা সময় ছিল যখন আমরা মাত্র দু’জন সাংসদ ছিলাম। গোটা সংসদ আমাদের উপহাস করত। কিন্তু আমরা কঠিন পরিশ্রম করেছি এবং মানুষের আস্থা অর্জন করেছি। কিন্তু আমরা কখনও পোলিং বুথ নিয়ে অভিযোগ তুলিনি। গত শতাব্দীর পাঁচের দশকে ভোট করতে দীর্ঘ সময় লাগত। কিছু এলাকায় বুথ দখল, রিগিং— এ সব ছিল পরিচিত দৃশ্য। কিন্তু এখন ভোটের হার বাড়ছে। এটা সুস্থ লক্ষণ।’’

আরও পড়ুন: দুর্গোৎসবে গেরুয়া নজর, রং বদলাতে চলেছে কলকাতার বেশ কিছু বিগ বাজেট পুজো

এ বার এই অস্ত্রই ঘুরিয়ে বিরোধীদের দিকে তাক করেন প্রধানমন্ত্রী। দেশবাসীর ভাবাবেগের প্রশ্ন তুলে বিরোধীদের উদ্দেশে বলেন, ‘‘ভোটের ফল নিয়ে প্রশ্ন তোলার অর্থ দেশবাসীকে অপমান করা।’’ মোদী আরও বলেন, ‘‘ইভিএম নিয়ে যাঁরা প্রশ্ন তুলছেন, আসলে প্রযুক্তি নিয়েই তাঁদের সমস্যা আছে। তাঁরা ডিজিটাল লেনদেন, আধার, জিএসটি, ভিম অ্যাপ মেনে নিতে পারেন না। আর এই মনোভাবের জন্যই কিছু দল সাধারণের আস্থা অর্জন করতে পারে না।’’  বিভিন্ন রাজ্যে যেখানে কংগ্রেস বা অন্য দলের সরকার রয়েছে, তাঁরাও যে ইভিএম-এ দেওয়া ভোটেই জিতে এসেছেন এবং তাঁদের প্রতিনিধি হয়েই রাজ্যসভায় এসেছেন, সে কথাও এ দিন স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন মোদী। 

মোদীর বক্তব্যে দীর্ঘ সময় ছিল ইভিএম নিয়ে বিরোধীদের তোলা অভিযোগের জবাব। সেই প্রসঙ্গেই কংগ্রেসকে নিশানা করে মোদীর কটাক্ষ, ‘‘ওঁরা পরাজয় মেনে নিতে পারেন না। এটা গণতন্ত্রের পক্ষে সুস্থ লক্ষণ নয়।’’ শুধু হার নয়, কংগ্রেস জিতও উপভোগ করতে পারে না বলে তোপ দাগেন মোদী। তিনি বলেন, ‘‘কিছু দিন আগেই তিন রাজ্যে ভোটে জিতে ক্ষমতায় এসেছে কংগ্রেস। কিন্তু সেখান থেকে কী কী খবর আসছে দেখুন?’’

আরও পডু়ন: ছেলেকে গাড়িতে আটকে দিঘায় সমুদ্র স্নানে বাবা-মা, মৃত্যুর হাত থেকে ফিরিয়ে আনল পুলিশ

নৌবাহিনীর জাহাজে রাজীব গাঁধীর ছুটি কাটানোর ছবি নিয়ে কম বিতর্ক হয়নি। মোদীর বক্তব্যে এ দিন সেই প্রসঙ্গও উঠে এসেছে। সুযোগ পেলেই ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ বা জাঁকজমক করে শাসক দলের ‘আন্তর্জাতিক যোগ দিবস’ পালন করা নিয়ে কটাক্ষ করতে ছাড়েন না বিরোধীরা। যোগ দিবসের দিনও সেনার ডগ স্কোয়াডের ছবি দিয়ে কটাক্ষ করতে চেয়েছিলেন রাহুল গাঁধী। জবাবে এ দিন প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘এই দুয়ের সঙ্গে এ বার নিউ ইন্ডিয়া স্লোগান নিয়েও বাঁকা কথা শোনাচ্ছেন বিরোধীরা। ওঁরা কি ওল্ড ইন্ডিয়ায় ফিরে যেতে চান? প্রাচীন ভারতবর্ষ যেখানে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত সাংবাদিক বৈঠকে ছিঁড়ে ফেলা হত? প্রাচীন ভারত, যেখানে নৌবাহিনীর জাহাজ ব্যক্তিগত প্রমোদে ব্যবহার করা হত, প্রাচীন ভারত, যেখানে ভূরি ভূরি দুর্নীতির নজির রয়েছে?’’ 

 এর পাশাপাশি অসমের জাতীয় নাগরিকপঞ্জির পক্ষেও ব্যাট ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য,  ‘‘আপনারা সব কিছুতেই কৃতিত্ব দাবি করেন। অসমে এনআরসির প্রয়োজনীয়তা মেনে নিয়েছিলেন রাজীব গাঁধী। সুপ্রিম কোর্টও এনআরসি-র পক্ষে রায় দিয়েছে। তা হলে আপনারা কৃতিত্ব নেবেন না কেন?’’ পাশাপাশি এ দিন দেশে জলসঙ্কটের সমস্যা এবং জল সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। সব মিলিয়ে বিরোধীরা যে সব প্রশ্ন তুলে সরকারকে চেপে ধরতে চেয়েছিলেন, কার্যত সেই সব প্রশ্নেই বিরোধীদের ঘায়েল করার চেষ্টা করেছেন মোদী।